০৪:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬
সংরক্ষিত বন নয়, কৃষিজমিই ভরসা—বন্য বিড়াল রক্ষায় নতুন গবেষণার বার্তা যুদ্ধের প্রভাবে আবার শক্তিশালী ডলার, নিরাপদ বিনিয়োগে ফিরে আসছে হলিউড অভিনেত্রী মেরি বেথ হার্ট আর নেই, আলঝেইমারসে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যু চীনের টেলিকম খাতে বিনিয়োগ কমছে, চাপে জেডটিই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ৪০% বৃদ্ধি, আরও বাড়ার আশঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ৪ ডলার ছাড়াল, চাপে ভোক্তা অর্থনীতি ইউরোপের ‘গানস বনাম বাটার’ সংকট তীব্রতর, ইরান যুদ্ধ নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি সংকটে আবারও ‘কমিউনিটি প্যান্ট্রি’ আন্দোলন বাংলার ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফরের ৩৪৬ বংশধর বাদ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত ফের ঊর্ধ্বমুখী সোনার বাজার: ভরিতে বাড়ল ৩,২৬৬ টাকা, ২২ ক্যারেট এখন ২,৪৪,৭১১ টাকা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৬৩)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪
  • 63

সরিতুল্লা হাজী

মেছের মোল্লার বাড়ির পাশেই ছিল সরিতুল্লা হাজীর বাড়ি। দুইধার তিনি মক্কা শরিফ যাইয়া হজ করিয়া আসিয়াছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার শখ হইল সোনাভানের পুঁথি পড়িবেন। তাঁর অনা কোনো কাজ ছিল না। সারাদিন পুথিখানা সামনে লইয়া পড়িতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু পড়িবেন কেমন করিয়া? অক্ষর-পরিচয় তো হয় নাই। বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই ডাক দিয়াছেন, “ও কে যায় ও. জসী নাকি? এখানে আইস ভাই।” কাছে গেলে সোনাভানের পুঁথিখানা আওগাইয়া ধরেন। “বল ত ভাই। এখানটিতে কি লেখা আছে?” কয়েক মাস পাঠশালায় যাইয়া আমি নতুন পড়ুয়া। এমন বয়স্ক ছাত্র পাইয়া বেশ গৌরবের সঙ্গে তাঁহাকে পড়া বলিয়া দিতাম। একখানা পুরাতন কাঁথার উপরে বসিয়া তিনি পড়াশুনা করিতেন। মক্কা শরিফ হইতে কিনিয়া আনা আলখেল্লাটি তাঁহার ঘরের বেড়ায় টাঙানো থাকিত।

আমি ছাড়া পাড়ার যত স্কুলে-পাঠশালায়-পড়া ছেলে, তাঁর বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই তিনি তাহাদিগকে ধরিয়াছেন পাঠ বলিয়া দিতে। তাহাদের কাছে আবার নতুন পড়া লইয়া দিনের পর দিন চলিত তাঁহার পুঁথি পড়ার সাধনা। যেদিন আমাদের কাজ থাকিত তাঁহার বাড়ির কাছ দিয়া চুপে চুপে যাইতাম। তখন শুনিতাম বৃদ্ধ তাঁহার ভাঙা গলায় সুর করিয়া সোনাভানের পুঁথি পড়িতেছেন। বৃদ্ধের একটি নাতনি ছিল। আমার চাইতে দু’এক বৎসর বড়। সে-ই রান্নাবান্না করিয়া তাঁহাকে খাওয়াইত। একমাত্র পুঁথি পড়া অভ্যাস করা ছাড়া তাঁহার আর কোনো কাজ ছিল না। গ্রামের কারও বাড়ি নিমন্ত্রণের দিনে মক্কা শরিফের খিলকাটি পরিয়া পাথরের একটি তসবিহ গলায় দিয়া তিনি সেখানে যাইতেন। সমবেত লোকেরা তাঁহার সঙ্গে হাত মিলাইয়া বিশেষ গৌরব বোধ করিত।

দুই-তিন বৎসরের অক্লান্ত চেষ্টায় সরিতুল্লা হাজী পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। ইহাতে তাঁহার কি লাভ হইয়াছিল জানি না। সোনাভানের পুঁথি শেষ করিয়া তিনি আরও কোনো পুঁথি পড়িয়াছিলেন কি না তাহারও খোঁজ রাখি নাই। কিন্তু আমার মুরব্বিরা প্রায়ই আমাকে বলিতেন, দেখ, আশি বৎসরের বৃদ্ধ সরিতুল্লা হাজী নিজের চেষ্টায় কেমন পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। আর এত সুযোগ-সুবিধা থাকিতে তোমরা তেমন পড়াশুনা করিতেছ না।

প্রথম পাঠ

আগেই বলিয়াছি আমি এবং আমার চাচাতো ভাই নেহাজদ্দীন শোভারামপুর অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় যাইয়া ভর্তি হইলাম। পাঠশালাটি ছিল ছোট গাঙের ওপারে। বাঁশের সাঁকো পার হইয়া সেখানে যাইতে হইত। গ্রীষ্মের ছুটির পর এই ছোটগাত্ ফুলিয়া ফাঁপিয়া বড় হইয়া উঠিল। তখন সেখানে যাইয়া প্রতিদিন লেখাপড়া করা আমাদের বয়সের ছোটদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। আমার পিতা একদিন আমাদিগকে সঙ্গে করিয়া তাঁহার নিজের স্কুলে আনিয়া ভর্তি করিয়া দিলেন। এই স্কুলের কথা আগেও কিছুটা বলিয়াছি।

চলবে…

সংরক্ষিত বন নয়, কৃষিজমিই ভরসা—বন্য বিড়াল রক্ষায় নতুন গবেষণার বার্তা

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-৬৩)

১১:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪

সরিতুল্লা হাজী

মেছের মোল্লার বাড়ির পাশেই ছিল সরিতুল্লা হাজীর বাড়ি। দুইধার তিনি মক্কা শরিফ যাইয়া হজ করিয়া আসিয়াছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাঁহার শখ হইল সোনাভানের পুঁথি পড়িবেন। তাঁর অনা কোনো কাজ ছিল না। সারাদিন পুথিখানা সামনে লইয়া পড়িতে চেষ্টা করিতেন। কিন্তু পড়িবেন কেমন করিয়া? অক্ষর-পরিচয় তো হয় নাই। বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই ডাক দিয়াছেন, “ও কে যায় ও. জসী নাকি? এখানে আইস ভাই।” কাছে গেলে সোনাভানের পুঁথিখানা আওগাইয়া ধরেন। “বল ত ভাই। এখানটিতে কি লেখা আছে?” কয়েক মাস পাঠশালায় যাইয়া আমি নতুন পড়ুয়া। এমন বয়স্ক ছাত্র পাইয়া বেশ গৌরবের সঙ্গে তাঁহাকে পড়া বলিয়া দিতাম। একখানা পুরাতন কাঁথার উপরে বসিয়া তিনি পড়াশুনা করিতেন। মক্কা শরিফ হইতে কিনিয়া আনা আলখেল্লাটি তাঁহার ঘরের বেড়ায় টাঙানো থাকিত।

আমি ছাড়া পাড়ার যত স্কুলে-পাঠশালায়-পড়া ছেলে, তাঁর বাড়ির কাছ দিয়া গেলেই তিনি তাহাদিগকে ধরিয়াছেন পাঠ বলিয়া দিতে। তাহাদের কাছে আবার নতুন পড়া লইয়া দিনের পর দিন চলিত তাঁহার পুঁথি পড়ার সাধনা। যেদিন আমাদের কাজ থাকিত তাঁহার বাড়ির কাছ দিয়া চুপে চুপে যাইতাম। তখন শুনিতাম বৃদ্ধ তাঁহার ভাঙা গলায় সুর করিয়া সোনাভানের পুঁথি পড়িতেছেন। বৃদ্ধের একটি নাতনি ছিল। আমার চাইতে দু’এক বৎসর বড়। সে-ই রান্নাবান্না করিয়া তাঁহাকে খাওয়াইত। একমাত্র পুঁথি পড়া অভ্যাস করা ছাড়া তাঁহার আর কোনো কাজ ছিল না। গ্রামের কারও বাড়ি নিমন্ত্রণের দিনে মক্কা শরিফের খিলকাটি পরিয়া পাথরের একটি তসবিহ গলায় দিয়া তিনি সেখানে যাইতেন। সমবেত লোকেরা তাঁহার সঙ্গে হাত মিলাইয়া বিশেষ গৌরব বোধ করিত।

দুই-তিন বৎসরের অক্লান্ত চেষ্টায় সরিতুল্লা হাজী পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। ইহাতে তাঁহার কি লাভ হইয়াছিল জানি না। সোনাভানের পুঁথি শেষ করিয়া তিনি আরও কোনো পুঁথি পড়িয়াছিলেন কি না তাহারও খোঁজ রাখি নাই। কিন্তু আমার মুরব্বিরা প্রায়ই আমাকে বলিতেন, দেখ, আশি বৎসরের বৃদ্ধ সরিতুল্লা হাজী নিজের চেষ্টায় কেমন পুঁথি পড়া শিখিয়া ফেলিলেন। আর এত সুযোগ-সুবিধা থাকিতে তোমরা তেমন পড়াশুনা করিতেছ না।

প্রথম পাঠ

আগেই বলিয়াছি আমি এবং আমার চাচাতো ভাই নেহাজদ্দীন শোভারামপুর অম্বিকা মাস্টারের পাঠশালায় যাইয়া ভর্তি হইলাম। পাঠশালাটি ছিল ছোট গাঙের ওপারে। বাঁশের সাঁকো পার হইয়া সেখানে যাইতে হইত। গ্রীষ্মের ছুটির পর এই ছোটগাত্ ফুলিয়া ফাঁপিয়া বড় হইয়া উঠিল। তখন সেখানে যাইয়া প্রতিদিন লেখাপড়া করা আমাদের বয়সের ছোটদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। আমার পিতা একদিন আমাদিগকে সঙ্গে করিয়া তাঁহার নিজের স্কুলে আনিয়া ভর্তি করিয়া দিলেন। এই স্কুলের কথা আগেও কিছুটা বলিয়াছি।

চলবে…