০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি

ইশকুল (পর্ব-৩৭)

  • Sarakhon Report
  • ০৮:০০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪
  • 128

আর্কাদি গাইদার

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

যাদের ইচ্ছে হয় লড়াই করুক, কিন্তু আমার কী দায় পড়েছে। আমি তো জার্মানদের কাছে কিছু ধারি না, জার্মানও আমার কাছে ধারে না কিছু। আলেক্সেই আর আমি এ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। লম্বা লম্বা রাত যেন কাটতেই চায় না। ছারপোকার দৌরাখিতে ঘুমোনোর তো উপায় নেই। একমাত্তর সান্ত্বনা হল, গান গাওয়া কিংবা কথা বলা। মাঝে মাঝে মনে হত, প্রাণভরে কাঁদি আর নয় তো কারো গলা টিপে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিই। কিন্তু কিছুই করতুম না, খালি স্থির হয়ে বসে গান ধরে দিতুম। পোড়া চোখের জলও শুকিয়ে গিয়েছিল। ভাবতুম, কারো উপর গায়ের ঝাল ঝাড়ি, কিন্তু সাধ্যি কী যে তা করি! কাজেই শেষ পর্যন্ত বলতুম, ইয়ার-দোন্ত ভাইসব, সাথী ভাইসব, এসো একটা গান গাই!’

সৈনিকটির মুখখানা লাল হয়ে ঘামে ভিজে উঠেছিল, আয়োডোফর্মের গন্ধ ঘন হয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমশ। জানলাটা খুলে দিলুম। তরতাজা সন্ধে, উঠোনে জমা-করা খড় আর বেশি-পাকা চেরির সুবাস বয়ে হাওয়া এসে ভরিয়ে দিল ঘর।

জানলার ধারে উঠে বসে শার্সি’র গায়ে এক আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে সৈনিকটির কথা আমি শুনছিলুম একমনে। কথাগুলো আমার বুকটার মধ্যে যেন শুকনো খরখরে ধূলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল, আর সেই ধুলো ক্রমশ জমতে-জমতে পুরু হয়ে যুদ্ধ, যুদ্ধের পবিত্র তাৎপর্য’ আর তার বীরদের সম্বন্ধে আমার এতদিনের সাধের ধারণাকে দিচ্ছিল একেবারে চাপা দিয়ে। অথচ সেদিন পর্যন্ত ওই সব ধারণা আমার কাছে কেমন স্পষ্ট, কতখানি বোধগম্যই না ছিল। সৈনিকটির দিকে তাকিয়ে আমার কেমন ঘৃণা বোধ হল। উনি কোমর থেকে বেল্টটা খুলে ফেললেন, তারপর শার্টের ভেজা কলারের বোতাম খুলে বাঁধন আলগা করে দিলেন। বোঝা গেল, অল্প একটু নেশা হয়েছে ওঁর।

ফের উনি শুরু করলেন, ‘মৃত্যু কেউ চায় না, এটা ঠিক। কিন্তু মৃত্যুর জন্যেই যে যুদ্ধটা খারাপ লাগে তা নয়, খারাপ লাগে এর মধ্যে একটা অন্যায়ের বোধ মিশে আছে বলে। মৃত্যুর মধ্যে কিন্তু এই বোধটা নেই। প্রত্যেককেই মরতে হবে, আগে আর পরে এই যা তফাত। এ নিয়ে কিছু করার নেই, এ তো নিয়ম। কিন্তু লড়াই করতে হবে, এ নিয়ম কে চালু করল? আমি, আপনি, এ-ও-সে আমরা কেউ নয়, তবু কেউ নিশ্চয় নিয়মটা রজ করেছে। আচ্ছা, বইতে যেমন লেখে ঈশ্বর যদি সত্যিই তেমন সর্বশক্তিমান, চির-দয়াল, আর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তবে তিনি সেই বেয়াদব লোকটাকে তো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলতে পারতেন: ‘আমার এই কথাটার জবাব দে দিকি এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে যুদ্ধে ঠেলে দিলি তুই কী জন্যে?

এতে ওদেরই বা লাভ কী, আর তোরই বা লাভ কোথায়? আচ্ছা, আসল ব্যাপারটা কী এখন খোলসা করে বল্ দেখি, যাতে সবাই জানতে পারে ওরা যুদ্ধ করছে কী জন্যে?’ ‘কিন্তু’, এই পর্যন্ত বলে সৈনিক হঠাৎ টলে উঠলেন, গ্লাসটাও তাঁর হাত থেকে প্রায় পড়ে যাবার মতো হল। পরে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু ঈশ্বর এই সব ঐহিক ব্যাপারে মাথা গলাতে চান না, এই তো? ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করি। আমরা ধৈর্যশীল জাত। কিন্তু এটা ঠিক, যখন আমাদের ধৈর্য টলে যাবে তখন নিজেরাই আমরা গিয়ে জজ আর আসামীদের খুঁজে বের করব।’

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

ইশকুল (পর্ব-৩৭)

০৮:০০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০২৪

আর্কাদি গাইদার

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

যাদের ইচ্ছে হয় লড়াই করুক, কিন্তু আমার কী দায় পড়েছে। আমি তো জার্মানদের কাছে কিছু ধারি না, জার্মানও আমার কাছে ধারে না কিছু। আলেক্সেই আর আমি এ নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। লম্বা লম্বা রাত যেন কাটতেই চায় না। ছারপোকার দৌরাখিতে ঘুমোনোর তো উপায় নেই। একমাত্তর সান্ত্বনা হল, গান গাওয়া কিংবা কথা বলা। মাঝে মাঝে মনে হত, প্রাণভরে কাঁদি আর নয় তো কারো গলা টিপে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিই। কিন্তু কিছুই করতুম না, খালি স্থির হয়ে বসে গান ধরে দিতুম। পোড়া চোখের জলও শুকিয়ে গিয়েছিল। ভাবতুম, কারো উপর গায়ের ঝাল ঝাড়ি, কিন্তু সাধ্যি কী যে তা করি! কাজেই শেষ পর্যন্ত বলতুম, ইয়ার-দোন্ত ভাইসব, সাথী ভাইসব, এসো একটা গান গাই!’

সৈনিকটির মুখখানা লাল হয়ে ঘামে ভিজে উঠেছিল, আয়োডোফর্মের গন্ধ ঘন হয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমশ। জানলাটা খুলে দিলুম। তরতাজা সন্ধে, উঠোনে জমা-করা খড় আর বেশি-পাকা চেরির সুবাস বয়ে হাওয়া এসে ভরিয়ে দিল ঘর।

জানলার ধারে উঠে বসে শার্সি’র গায়ে এক আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে সৈনিকটির কথা আমি শুনছিলুম একমনে। কথাগুলো আমার বুকটার মধ্যে যেন শুকনো খরখরে ধূলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল, আর সেই ধুলো ক্রমশ জমতে-জমতে পুরু হয়ে যুদ্ধ, যুদ্ধের পবিত্র তাৎপর্য’ আর তার বীরদের সম্বন্ধে আমার এতদিনের সাধের ধারণাকে দিচ্ছিল একেবারে চাপা দিয়ে। অথচ সেদিন পর্যন্ত ওই সব ধারণা আমার কাছে কেমন স্পষ্ট, কতখানি বোধগম্যই না ছিল। সৈনিকটির দিকে তাকিয়ে আমার কেমন ঘৃণা বোধ হল। উনি কোমর থেকে বেল্টটা খুলে ফেললেন, তারপর শার্টের ভেজা কলারের বোতাম খুলে বাঁধন আলগা করে দিলেন। বোঝা গেল, অল্প একটু নেশা হয়েছে ওঁর।

ফের উনি শুরু করলেন, ‘মৃত্যু কেউ চায় না, এটা ঠিক। কিন্তু মৃত্যুর জন্যেই যে যুদ্ধটা খারাপ লাগে তা নয়, খারাপ লাগে এর মধ্যে একটা অন্যায়ের বোধ মিশে আছে বলে। মৃত্যুর মধ্যে কিন্তু এই বোধটা নেই। প্রত্যেককেই মরতে হবে, আগে আর পরে এই যা তফাত। এ নিয়ে কিছু করার নেই, এ তো নিয়ম। কিন্তু লড়াই করতে হবে, এ নিয়ম কে চালু করল? আমি, আপনি, এ-ও-সে আমরা কেউ নয়, তবু কেউ নিশ্চয় নিয়মটা রজ করেছে। আচ্ছা, বইতে যেমন লেখে ঈশ্বর যদি সত্যিই তেমন সর্বশক্তিমান, চির-দয়াল, আর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তবে তিনি সেই বেয়াদব লোকটাকে তো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলতে পারতেন: ‘আমার এই কথাটার জবাব দে দিকি এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে যুদ্ধে ঠেলে দিলি তুই কী জন্যে?

এতে ওদেরই বা লাভ কী, আর তোরই বা লাভ কোথায়? আচ্ছা, আসল ব্যাপারটা কী এখন খোলসা করে বল্ দেখি, যাতে সবাই জানতে পারে ওরা যুদ্ধ করছে কী জন্যে?’ ‘কিন্তু’, এই পর্যন্ত বলে সৈনিক হঠাৎ টলে উঠলেন, গ্লাসটাও তাঁর হাত থেকে প্রায় পড়ে যাবার মতো হল। পরে সামলে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু ঈশ্বর এই সব ঐহিক ব্যাপারে মাথা গলাতে চান না, এই তো? ঠিক আছে, আমরা অপেক্ষা করি। আমরা ধৈর্যশীল জাত। কিন্তু এটা ঠিক, যখন আমাদের ধৈর্য টলে যাবে তখন নিজেরাই আমরা গিয়ে জজ আর আসামীদের খুঁজে বের করব।’