১০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
জাপানের লড়াকু ড্র, নেদারল্যান্ডসকে রুখে বিশ্বকাপে আত্মবিশ্বাসী সামুরাই ব্লু রামিসা হত্যা মামলায় প্রাণভিক্ষা চাইলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শূন্য পাতার ভয় কাটিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় গাইডেড জার্নালের উত্থান জাপানে সার সংকটের আশঙ্কা, বাড়ছে কৃষি ব্যয় স্ট্রিমিংয়ে রাজত্ব, কনসার্টে শূন্যতা? দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংগীত বাজারে ইন্দোনেশিয়ার নতুন ধাঁধা ইউরোপের নতুন বার্তা: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এগোতে চায় মিত্ররা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি: ভবিষ্যতের শক্তি নির্ধারণ করবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তিতে ক্ষুব্ধ ইসরাইল, চাপে নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে অগ্রগতি হলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রস্তুত ইউরোপের চার দেশ তিন চাকার যানবাহন মহাসড়কে নয়, আসছে কঠোর নীতিমালা

সিআইএ’র চোখে ধুলো দিয়ে চে গেভারার ডায়েরি যেভাবে কিউবা পৌঁছেছিল

  • Sarakhon Report
  • ০২:৪৬:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫
  • 98

মার্কসবাদী বিপ্লবী এর্নেস্তো চে গেভারা

তারেকুজ্জামান শিমুল

ঘটনাটি ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের। কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ (সিআইএ) কে তারা রীতিমত বোকা বানিয়েছেন।

তিনি এটি বলেছিলেন, কারণ গুলিতে মৃত্যু হওয়ার পর মার্কসবাদী বিপ্লবী এর্নেস্তো চে গেভারার যে ডায়েরি সিআইএ চরম গোপনীয়তার সঙ্গে নিজেদের কব্জায় রেখেছিল, সেটির একটি কপি বা অনুলিপি ততক্ষণে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন মি. কাস্ত্রো।

“বিপ্লবেরও বন্ধু আছে এবং এটি (চে’র ডায়েরি) হাতে পেতে আমাদের একটি পয়সাও খরচ করতে হয়নি,” বলেছিলেন মি. কাস্ত্রো।

কিন্তু সিআইএ’র মতো একটি শীর্ষস্থানীয় গুপ্তচর সংস্থার চোখে ধুলো দিয়ে কীভাবে ডায়েরিটা কিউবায় পৌঁছেছিল, সেটি অবশ্য তখন খোলাসা করেননি চে গেভারার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ এই বন্ধু।

ওই বছরই সেই ডায়েরি বই আকারে প্রকাশ পায়, যার নাম দেওয়া হয় ‘দ্য বলিভিয়ান ডায়েরি’।

“এই ডায়েরিটা যেভাবে আমাদের হাতে এসেছে, সেটি এখন প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না,” বইটির প্রথম সংস্করণে উল্লেখ করেছিলেন মি. কাস্ত্রো।

পরবর্তীতে অবশ্য ডায়েরি উদ্ধারের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

সিআইএ’র কাছ থেকে কীভাবে উদ্ধার হয়েছিল চে গেভারার লেখা সর্বশেষ ডায়েরিটি? সেটিই তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

                                       লাল মলাটের এই ডায়েরিটি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত চে গেভারার সঙ্গে ছিল

ডায়েরিতে কী ছিল?

বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন চে গেভারা। গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলে লড়াই শুরু করেন বলিভিয়ার তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে।

মূলত ওই সময়েই নতুন একটি ডায়েরি লেখা শুরু করেন মি. গেভারা। লাল মলাটের জার্মান ডায়েরিটি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ইউরোপ ভ্রমণের সময়।

“আজ নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে,” জীবনের শেষ ডায়েরির প্রথম লাইনে লিখেছিলেন মি. গেভারা।

১৯৬৬ সালের সাতই নভেম্বর থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের সাতই অক্টোবর পর্যন্ত ডায়েরি লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি।

সেখানে তিনি বলিভিয়া ও কিউবার নাগরিকদের নিয়ে গঠিত নিজের গেরিলা বাহিনী ও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন সহযোদ্ধা এবং বলিভিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কেও।

এর বাইরে, বইয়ের একটি তালিকাও চোখে পড়ে ডায়েরিতে, যুদ্ধের মধ্যেই যেগুলো মি. গেভারা পড়ছিলেন বলে ধারণা পাওয়া যায়।

বলিভিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে গেরিলাদের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধের একটি বিবরণ ডায়েরিতে পাওয়া যায়, যেটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২৩শে মার্চ।

বলতে গেলে বলিভিয়া অভিযানকালে ওই যুদ্ধটিই ছিল মি. গেভারার নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিজয়।

এরপর ক্রমেই গেরিলা যোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফিকে হতে থাকে চে গেভারার আরও অনেকগুলো “ভিয়েতনাম গড়ে তোলা” তথা বিপ্লবের স্বপ্ন।

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র সহায়তায় ১৯৬৭ সালের আটই অক্টোবর বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী চে গেভারাকে বন্দী করে এবং পরদিন তাকে হত্যা করা হয়।

                      চে গেভারার মৃত্যুর পর তার ডায়েরির প্রতিটি পাতার ছবি তুলে নিয়েছিল সিআইএ

ডায়েরি যেভাবে সিআইএ’র হাতে গিয়েছিল

বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে চে গেভারা যখন বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনা চরমে। লাতিন আমেরিকায় কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন তখন রীতিমত উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে চে গেভারার তৎপরতা নিয়ে।

মাত্র বছর সাতেক আগে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে মি. গেভারা ও তার বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় বামপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনকারীদের হাতে দেশটির বিতর্কিত সেনা শাসক ফুলখেনসিও বাতিস্তার পতন ঘটে, ইতিহাসে যেটি ‘কিউবার বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

বলিভিয়াতেও একই ঘটনা ঘটুক, সেটি চায়নি তৎকালীন মার্কিন সরকার। আর সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্র তখন বলিভিয়ার যাবতীয় ঘটনার উপর কড়া নজর রাখছিল।

অন্যদিকে, কিউবায় প্রেসিডেন্ট বাতিস্তার যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, সেটি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন বলিভিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রেনে ব্যারিয়েন্টোস। ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চান।

কমিউনিস্ট গেরিলাদের মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র তখন বলিভিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য দিতে থাকে।

এমনকি ১৯৬৭ সালের আটই অক্টোবর মি. গেভারাকে ধরার ক্ষেত্রেও সিআইএ’র এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যাদের একজন ফেলিক্স রড্রিগেজ।

হত্যা করার আগে মি. রড্রিগেজ চে গেভারার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রগুলো সংগ্রহ করেন।

ফিদেল কাস্ত্রোর (ডানে) সঙ্গে চে গেভারা (বামে)

“আমি তখন ভায়াগ্রান্ডিতে। বলিভিয়ার বিমান বাহিনীর জন্য কিছু যন্ত্রপাতি পাঠানো হচ্ছিল। তখন আমরা জানতে পারি যে চে গেভারাকে ধরা হয়েছে। তাকে দেখার জন্যও আমার মধ্যে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরের দিন একটা হেলিকপ্টারে করে আমি একটা স্কুলে যাই, যেখানে তাকে বন্দী রাখা হয়েছিল। আমরা সবাই একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম তাকে বেঁধে এক কোনায় মেঝের উপর ফেলে রাখা হয়েছে,” বিবিসির মাইক ল্যানচিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন মি. রড্রিগেজ।

ওই ঘরের মধ্যে সিআইএ’র এজেন্ট মি. রড্রিগেজ একটি ঝোলা খুঁজে পান, যার মধ্যেই ছিল বলিভিয়া অভিযানের সময় লেখা চে গেভারার ব্যক্তিগত ডায়েরি।

ফেলিক্স রড্রিগেজ বিবিসিকে জানান, সিআইএ চেয়েছিল মি. গেভারাকে বাঁচিয়ে রেখে তার কাছ থেকে আরও তথ্য বের করতে এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে।

অন্যদিকে, বলিভিয়ার সরকার চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব চে গেভারাকে হত্যা করতে। বলিভিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মি. ব্যারিয়েন্টোসের নির্দেশে নয়ই অক্টোবর চে গেভারাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ফলে জীবিত চে গেভারার কাছ থেকে তথ্য বের করার মিশনে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তখন মনোযোগ দেয় তার ডায়েরির দিকে। কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া না হয়, সেজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টার সময় ব্যয় করে ডায়েরির প্রতিটি পাতার ছবিও তুলে রাখে সিআইএ।

যদিও ডায়েরির মূল কপি পরবর্তীতে বলিভিয়ার সেনা বাহিনীর কাছে চলে যায়।

কিউবার বিপ্লবের সময় রণাঙ্গনে চে গেভারা

অপারেশন ‘তিয়া ভিক্টোরিয়া’

চে গেভারার মৃত্যুর পর থেকেই সিআইএ’র কব্জা থেকে তার ডায়েরি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো। সেই লক্ষ্যে একটি গোপন অভিযান শুরু হয়, যার নাম ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’।

এই অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ছিলেন বলিভিয়া ও চিলির নাগরিক, যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল চে গেভারার ডায়েরি উদ্ধার করে হাভানায় মি. কাস্ত্রোর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু সিআইএ’র চোখ ফাঁকি দিয়ে ডায়েরি উদ্ধার করা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়, যদি না তাদের ভেতর থেকে কেউ সহযোগিতা করে।

এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে বলিভিয়ার তৎকালীন সরকার একটি আদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা চে গেভারার ডায়েরিসহ অন্যান্য মালামালের দায়িত্ব দেশটির সামরিক বাহিনীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

যে সময় এই ঘটনা ঘটে তখন বলিভিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আন্তোনিও আরগুয়েডাস। মি. আরগুয়েডাস একসময় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, বলিভিয়ায় তিনিই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা।

কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল রেনে ব্যারিয়েন্টোসের মন্ত্রিসভায় তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকায় দেখা যায়।

অবশ্য এই পদে আসার জন্য তাকে সিআইএ’র অনুমোদন পেতে হয়েছিল। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একজন ব্যক্তির পক্ষে সেই অনুমোদন পাওয়াটা যে কতটা কঠিন, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

এর জন্য মি. আরগুয়েডাসকে রীতিমত অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল, যার পরিণতিতে পরে তিনি ‘বামপন্থাবিরোধী’ তকমা পান।

বস্তুত চে গেভারার গেরিলা বাহিনীর সদস্য সন্দেহে ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যা কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের মধ্যে মি. আরগুয়েডাস অগ্রভাগেই ছিলেন।

সিআইএ’র সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনিই পরে চে গেভারার ডায়েরি উদ্ধারে বামপন্থীদের প্রধান সহায়তাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।


কিউবার বিপ্লবের পর অন্যদের সঙ্গে চে গেভারা (উপরের সারিতে বামদিক থেকে তৃতীয়)

বলিভিয়া থেকে হাভানা

ডায়েরির যে ছবিগুলো সিআইএ তুলেছিল, সেটির একটি কপি (মাইক্রোফিল্ম) ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’র সদস্যদের হাতে তুলে দেন মি. আরগুয়েডাস।

কপি পাওয়ার পর ১৯৬৮ সালের গোড়ার দিকে সেটি চিলিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন গোপন অভিযানের অন্যতম সদস্য ভিক্টর জ্যানিয়ার।

ডায়েরির কপি হাতে পেলেও সিআইএ ও বলিভিয়ার গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেটি হাভানায় পাঠাতে বেশ বেগ পেতে হয় মি. জ্যানিয়ারকে।

নিরাপদে কীভাবে স্ন্যাপশটগুলো বলিভিয়া থেকে কিউবায় পাঠানো হবে, সেই পরিকল্পনা করতেই কয়েক মাস চলে যায়।

পরিকল্পনামাফিক সব ঠিকঠাক করার পর ১৯৬৮ সালের এপ্রিলের দিকে ডায়েরির স্ন্যাপশটগুলো প্রথমে চিলিতে পাঠানো হয়।

মি. জ্যানিয়ার পরে নিজেই জানিয়েছিলেন, ভিনাইল রেকর্ডের ছয়টি খামে লুকিয়ে ডায়েরির মাইক্রোফিল্ম বা টেপগুলো তখন চিলির রাজধানীতে নেওয়া হয়েছিল। এরপর সেটি মি. কাস্ত্রোর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

হার্নান উরিবে নামের একজন সাংবাদিকও ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যিনি ১৯৮৭ সালে একই নামে একটি বইও প্রকাশ করেন।

সেখানে তিনি লিখেছেন যে, এ দফায় ভিনাইল রেকর্ডের খামে লুকিয়ে টেপগুলো প্রথমে মেক্সিকো, তারপর কিউবায় নিয়ে যান চিলির বামধারার পত্রিকা পুন্তো ফিনালের তৎকালীন পরিচালক মারিও ডিয়াজ ব্যারিয়েন্টোস।

এরপর ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে টেপগুলো পৌঁছে যায় চে গেভারার বন্ধু ও সহযোদ্ধা ফিদেল কাস্ত্রোর কাছে।

কিউবার প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেন চে গেভারা

আরগুয়েডাস কেন সাহায্য করলেন?

কিন্তু বলিভিয়ার যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘসময় চে গেভারার সমর্থকদের উপর কঠোর নির্যাতন চালিয়েছেন, তিনি কেন সিআইএ’র বিরুদ্ধে গিয়ে ডায়েরির একটি কপি বামপন্থীদের হাতে তুলে দিলেন?

“তাকে ব্যাখ্যা করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ একদিকে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি নিজের বামপন্থী প্রবণতাকে অস্বীকার করেছেন না, আবার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারী প্রেসিডেন্টকেও সমর্থন দিচ্ছেন,” বিবিসিকে বলেন বলিভিয়ার সাবেক কূটনীতিক ও গবেষক লুইস গনজালেজ কুইন্টানিলা।

আন্তোনিও আরগুয়েডাসের চরিত্রের বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট তুলে ধরে মি. কুইন্টানিলা আরও বলেন, “চে গেভারার গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন সন্দেহে নিজ দেশের মানুষের উপর যিনি অত্যাচার চালাচ্ছেন বা হত্যা করছেন, সেই একই ব্যক্তি আবার নিজের পরিচিত অন্য বামপন্থী “সাবেক কমরেডদের” কাছে খবর পাঠিয়ে অভিযানের আগেই পালানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন।”

বলিভিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ক্ষমতার লোভে সামরিক সরকারের মন্ত্রিসভায় অংশ নিলেও মি. আরগুয়েডাসের হৃদয়ে হয়তো বামপন্থার প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা রয়েই গিয়েছিল।

সেজন্যই তিনি মি. গেভারার ডায়েরি উদ্ধারে বামপন্থীদের সহযোগিতা করেছেন।

তবে কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে বামপন্থার প্রতি দুর্বলতা থেকে নয়, বরং সিআইএ’র প্রতি প্রতিশোধ নিতেই মি. আরগুয়েডাস এই কাজ করেছেন।

কারণ ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে মি. আরগুয়েডাস বলেছিলেন যে, জিজ্ঞাসাবাদের নামে সিআইএ’র সদস্যরা যে আচরণ করেছে, একদিন তিনি সেটার “প্রতিশোধ” নেবেন।

বিবিসি নিউজ বাংলা

জনপ্রিয় সংবাদ

জাপানের লড়াকু ড্র, নেদারল্যান্ডসকে রুখে বিশ্বকাপে আত্মবিশ্বাসী সামুরাই ব্লু

সিআইএ’র চোখে ধুলো দিয়ে চে গেভারার ডায়েরি যেভাবে কিউবা পৌঁছেছিল

০২:৪৬:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫

তারেকুজ্জামান শিমুল

ঘটনাটি ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি সময়ের। কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ (সিআইএ) কে তারা রীতিমত বোকা বানিয়েছেন।

তিনি এটি বলেছিলেন, কারণ গুলিতে মৃত্যু হওয়ার পর মার্কসবাদী বিপ্লবী এর্নেস্তো চে গেভারার যে ডায়েরি সিআইএ চরম গোপনীয়তার সঙ্গে নিজেদের কব্জায় রেখেছিল, সেটির একটি কপি বা অনুলিপি ততক্ষণে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন মি. কাস্ত্রো।

“বিপ্লবেরও বন্ধু আছে এবং এটি (চে’র ডায়েরি) হাতে পেতে আমাদের একটি পয়সাও খরচ করতে হয়নি,” বলেছিলেন মি. কাস্ত্রো।

কিন্তু সিআইএ’র মতো একটি শীর্ষস্থানীয় গুপ্তচর সংস্থার চোখে ধুলো দিয়ে কীভাবে ডায়েরিটা কিউবায় পৌঁছেছিল, সেটি অবশ্য তখন খোলাসা করেননি চে গেভারার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ এই বন্ধু।

ওই বছরই সেই ডায়েরি বই আকারে প্রকাশ পায়, যার নাম দেওয়া হয় ‘দ্য বলিভিয়ান ডায়েরি’।

“এই ডায়েরিটা যেভাবে আমাদের হাতে এসেছে, সেটি এখন প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না,” বইটির প্রথম সংস্করণে উল্লেখ করেছিলেন মি. কাস্ত্রো।

পরবর্তীতে অবশ্য ডায়েরি উদ্ধারের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে।

সিআইএ’র কাছ থেকে কীভাবে উদ্ধার হয়েছিল চে গেভারার লেখা সর্বশেষ ডায়েরিটি? সেটিই তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

                                       লাল মলাটের এই ডায়েরিটি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত চে গেভারার সঙ্গে ছিল

ডায়েরিতে কী ছিল?

বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন চে গেভারা। গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলে লড়াই শুরু করেন বলিভিয়ার তৎকালীন সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে।

মূলত ওই সময়েই নতুন একটি ডায়েরি লেখা শুরু করেন মি. গেভারা। লাল মলাটের জার্মান ডায়েরিটি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ইউরোপ ভ্রমণের সময়।

“আজ নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে,” জীবনের শেষ ডায়েরির প্রথম লাইনে লিখেছিলেন মি. গেভারা।

১৯৬৬ সালের সাতই নভেম্বর থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৬৭ সালের সাতই অক্টোবর পর্যন্ত ডায়েরি লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি।

সেখানে তিনি বলিভিয়া ও কিউবার নাগরিকদের নিয়ে গঠিত নিজের গেরিলা বাহিনী ও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন সহযোদ্ধা এবং বলিভিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কেও।

এর বাইরে, বইয়ের একটি তালিকাও চোখে পড়ে ডায়েরিতে, যুদ্ধের মধ্যেই যেগুলো মি. গেভারা পড়ছিলেন বলে ধারণা পাওয়া যায়।

বলিভিয়ার সরকারি বাহিনীর সঙ্গে গেরিলাদের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধের একটি বিবরণ ডায়েরিতে পাওয়া যায়, যেটি সংঘটিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালের ২৩শে মার্চ।

বলতে গেলে বলিভিয়া অভিযানকালে ওই যুদ্ধটিই ছিল মি. গেভারার নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনীর সবচেয়ে বড় বিজয়।

এরপর ক্রমেই গেরিলা যোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফিকে হতে থাকে চে গেভারার আরও অনেকগুলো “ভিয়েতনাম গড়ে তোলা” তথা বিপ্লবের স্বপ্ন।

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র সহায়তায় ১৯৬৭ সালের আটই অক্টোবর বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী চে গেভারাকে বন্দী করে এবং পরদিন তাকে হত্যা করা হয়।

                      চে গেভারার মৃত্যুর পর তার ডায়েরির প্রতিটি পাতার ছবি তুলে নিয়েছিল সিআইএ

ডায়েরি যেভাবে সিআইএ’র হাতে গিয়েছিল

বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে চে গেভারা যখন বলিভিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের উত্তেজনা চরমে। লাতিন আমেরিকায় কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন তখন রীতিমত উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে চে গেভারার তৎপরতা নিয়ে।

মাত্র বছর সাতেক আগে ১৯৫৯ সালের জানুয়ারিতে মি. গেভারা ও তার বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় বামপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনকারীদের হাতে দেশটির বিতর্কিত সেনা শাসক ফুলখেনসিও বাতিস্তার পতন ঘটে, ইতিহাসে যেটি ‘কিউবার বিপ্লব’ নামে পরিচিত।

বলিভিয়াতেও একই ঘটনা ঘটুক, সেটি চায়নি তৎকালীন মার্কিন সরকার। আর সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্র তখন বলিভিয়ার যাবতীয় ঘটনার উপর কড়া নজর রাখছিল।

অন্যদিকে, কিউবায় প্রেসিডেন্ট বাতিস্তার যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, সেটি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন বলিভিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রেনে ব্যারিয়েন্টোস। ফলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চান।

কমিউনিস্ট গেরিলাদের মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র তখন বলিভিয়ার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য দিতে থাকে।

এমনকি ১৯৬৭ সালের আটই অক্টোবর মি. গেভারাকে ধরার ক্ষেত্রেও সিআইএ’র এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যাদের একজন ফেলিক্স রড্রিগেজ।

হত্যা করার আগে মি. রড্রিগেজ চে গেভারার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রগুলো সংগ্রহ করেন।

ফিদেল কাস্ত্রোর (ডানে) সঙ্গে চে গেভারা (বামে)

“আমি তখন ভায়াগ্রান্ডিতে। বলিভিয়ার বিমান বাহিনীর জন্য কিছু যন্ত্রপাতি পাঠানো হচ্ছিল। তখন আমরা জানতে পারি যে চে গেভারাকে ধরা হয়েছে। তাকে দেখার জন্যও আমার মধ্যে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরের দিন একটা হেলিকপ্টারে করে আমি একটা স্কুলে যাই, যেখানে তাকে বন্দী রাখা হয়েছিল। আমরা সবাই একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম তাকে বেঁধে এক কোনায় মেঝের উপর ফেলে রাখা হয়েছে,” বিবিসির মাইক ল্যানচিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন মি. রড্রিগেজ।

ওই ঘরের মধ্যে সিআইএ’র এজেন্ট মি. রড্রিগেজ একটি ঝোলা খুঁজে পান, যার মধ্যেই ছিল বলিভিয়া অভিযানের সময় লেখা চে গেভারার ব্যক্তিগত ডায়েরি।

ফেলিক্স রড্রিগেজ বিবিসিকে জানান, সিআইএ চেয়েছিল মি. গেভারাকে বাঁচিয়ে রেখে তার কাছ থেকে আরও তথ্য বের করতে এবং তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে।

অন্যদিকে, বলিভিয়ার সরকার চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব চে গেভারাকে হত্যা করতে। বলিভিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মি. ব্যারিয়েন্টোসের নির্দেশে নয়ই অক্টোবর চে গেভারাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ফলে জীবিত চে গেভারার কাছ থেকে তথ্য বের করার মিশনে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা তখন মনোযোগ দেয় তার ডায়েরির দিকে। কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া না হয়, সেজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টার সময় ব্যয় করে ডায়েরির প্রতিটি পাতার ছবিও তুলে রাখে সিআইএ।

যদিও ডায়েরির মূল কপি পরবর্তীতে বলিভিয়ার সেনা বাহিনীর কাছে চলে যায়।

কিউবার বিপ্লবের সময় রণাঙ্গনে চে গেভারা

অপারেশন ‘তিয়া ভিক্টোরিয়া’

চে গেভারার মৃত্যুর পর থেকেই সিআইএ’র কব্জা থেকে তার ডায়েরি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন কিউবার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো। সেই লক্ষ্যে একটি গোপন অভিযান শুরু হয়, যার নাম ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’।

এই অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই ছিলেন বলিভিয়া ও চিলির নাগরিক, যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল চে গেভারার ডায়েরি উদ্ধার করে হাভানায় মি. কাস্ত্রোর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু সিআইএ’র চোখ ফাঁকি দিয়ে ডায়েরি উদ্ধার করা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়, যদি না তাদের ভেতর থেকে কেউ সহযোগিতা করে।

এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে বলিভিয়ার তৎকালীন সরকার একটি আদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করা চে গেভারার ডায়েরিসহ অন্যান্য মালামালের দায়িত্ব দেশটির সামরিক বাহিনীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।

যে সময় এই ঘটনা ঘটে তখন বলিভিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আন্তোনিও আরগুয়েডাস। মি. আরগুয়েডাস একসময় বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, বলিভিয়ায় তিনিই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা।

কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল রেনে ব্যারিয়েন্টোসের মন্ত্রিসভায় তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকায় দেখা যায়।

অবশ্য এই পদে আসার জন্য তাকে সিআইএ’র অনুমোদন পেতে হয়েছিল। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একজন ব্যক্তির পক্ষে সেই অনুমোদন পাওয়াটা যে কতটা কঠিন, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

এর জন্য মি. আরগুয়েডাসকে রীতিমত অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল, যার পরিণতিতে পরে তিনি ‘বামপন্থাবিরোধী’ তকমা পান।

বস্তুত চে গেভারার গেরিলা বাহিনীর সদস্য সন্দেহে ব্যাপক নির্যাতন ও হত্যা কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের মধ্যে মি. আরগুয়েডাস অগ্রভাগেই ছিলেন।

সিআইএ’র সঙ্গে তার বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তিনিই পরে চে গেভারার ডায়েরি উদ্ধারে বামপন্থীদের প্রধান সহায়তাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।


কিউবার বিপ্লবের পর অন্যদের সঙ্গে চে গেভারা (উপরের সারিতে বামদিক থেকে তৃতীয়)

বলিভিয়া থেকে হাভানা

ডায়েরির যে ছবিগুলো সিআইএ তুলেছিল, সেটির একটি কপি (মাইক্রোফিল্ম) ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’র সদস্যদের হাতে তুলে দেন মি. আরগুয়েডাস।

কপি পাওয়ার পর ১৯৬৮ সালের গোড়ার দিকে সেটি চিলিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন গোপন অভিযানের অন্যতম সদস্য ভিক্টর জ্যানিয়ার।

ডায়েরির কপি হাতে পেলেও সিআইএ ও বলিভিয়ার গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেটি হাভানায় পাঠাতে বেশ বেগ পেতে হয় মি. জ্যানিয়ারকে।

নিরাপদে কীভাবে স্ন্যাপশটগুলো বলিভিয়া থেকে কিউবায় পাঠানো হবে, সেই পরিকল্পনা করতেই কয়েক মাস চলে যায়।

পরিকল্পনামাফিক সব ঠিকঠাক করার পর ১৯৬৮ সালের এপ্রিলের দিকে ডায়েরির স্ন্যাপশটগুলো প্রথমে চিলিতে পাঠানো হয়।

মি. জ্যানিয়ার পরে নিজেই জানিয়েছিলেন, ভিনাইল রেকর্ডের ছয়টি খামে লুকিয়ে ডায়েরির মাইক্রোফিল্ম বা টেপগুলো তখন চিলির রাজধানীতে নেওয়া হয়েছিল। এরপর সেটি মি. কাস্ত্রোর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

হার্নান উরিবে নামের একজন সাংবাদিকও ‘অপারেশন তিয়া ভিক্টোরিয়া’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যিনি ১৯৮৭ সালে একই নামে একটি বইও প্রকাশ করেন।

সেখানে তিনি লিখেছেন যে, এ দফায় ভিনাইল রেকর্ডের খামে লুকিয়ে টেপগুলো প্রথমে মেক্সিকো, তারপর কিউবায় নিয়ে যান চিলির বামধারার পত্রিকা পুন্তো ফিনালের তৎকালীন পরিচালক মারিও ডিয়াজ ব্যারিয়েন্টোস।

এরপর ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে টেপগুলো পৌঁছে যায় চে গেভারার বন্ধু ও সহযোদ্ধা ফিদেল কাস্ত্রোর কাছে।

কিউবার প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৬৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দেন চে গেভারা

আরগুয়েডাস কেন সাহায্য করলেন?

কিন্তু বলিভিয়ার যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘসময় চে গেভারার সমর্থকদের উপর কঠোর নির্যাতন চালিয়েছেন, তিনি কেন সিআইএ’র বিরুদ্ধে গিয়ে ডায়েরির একটি কপি বামপন্থীদের হাতে তুলে দিলেন?

“তাকে ব্যাখ্যা করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কারণ একদিকে দেখা যাচ্ছে যে, তিনি নিজের বামপন্থী প্রবণতাকে অস্বীকার করেছেন না, আবার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলকারী প্রেসিডেন্টকেও সমর্থন দিচ্ছেন,” বিবিসিকে বলেন বলিভিয়ার সাবেক কূটনীতিক ও গবেষক লুইস গনজালেজ কুইন্টানিলা।

আন্তোনিও আরগুয়েডাসের চরিত্রের বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট তুলে ধরে মি. কুইন্টানিলা আরও বলেন, “চে গেভারার গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন সন্দেহে নিজ দেশের মানুষের উপর যিনি অত্যাচার চালাচ্ছেন বা হত্যা করছেন, সেই একই ব্যক্তি আবার নিজের পরিচিত অন্য বামপন্থী “সাবেক কমরেডদের” কাছে খবর পাঠিয়ে অভিযানের আগেই পালানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন।”

বলিভিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ক্ষমতার লোভে সামরিক সরকারের মন্ত্রিসভায় অংশ নিলেও মি. আরগুয়েডাসের হৃদয়ে হয়তো বামপন্থার প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা রয়েই গিয়েছিল।

সেজন্যই তিনি মি. গেভারার ডায়েরি উদ্ধারে বামপন্থীদের সহযোগিতা করেছেন।

তবে কেউ কেউ এটাও মনে করেন যে বামপন্থার প্রতি দুর্বলতা থেকে নয়, বরং সিআইএ’র প্রতি প্রতিশোধ নিতেই মি. আরগুয়েডাস এই কাজ করেছেন।

কারণ ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে মি. আরগুয়েডাস বলেছিলেন যে, জিজ্ঞাসাবাদের নামে সিআইএ’র সদস্যরা যে আচরণ করেছে, একদিন তিনি সেটার “প্রতিশোধ” নেবেন।

বিবিসি নিউজ বাংলা