০৫:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
নন্দিনী হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি, ফলিমারী গ্রামের আতঙ্ক দূরের আহ্বান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে চুরির সন্দেহে পিটিয়ে যুবক হত্যা, আটক ৩ হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, দেশে মোট মৃত্যু ৬৭০ ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় জ্বালানি সংকট, পর্যটন মৌসুমে বড় ধাক্কা ভারত ১৪০ কোটি মানুষের দেশ হওয়ার পরও কেন ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি? জৈবপ্রযুক্তির নতুন বিশ্বযুদ্ধে ভারতের সামনে যে ঐতিহাসিক সুযোগ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত , অনিশ্চয়তায় সমঝোতা ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে কুড়িগ্রামের চরে গৃহহীন ৩০ পরিবার, ঝুঁকিতে আরও শতাধিক আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২৩ জুন ঘিরে সুনির্দিষ্ট হুমকি নেই, বললেন ডিএমপি কমিশনার শ্রমিক শ্রেণির ক্ষোভ, ভাঙা আস্থা এবং ব্রিটিশ রাজনীতির নতুন সন্ধিক্ষণ

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২০৮)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫
  • 427

নজরুল: পরিশিষ্ট

কবির সামনে বসিয়া তাঁর কবিতার কিছুটা আবৃত্তি করিলাম। শুনিয়া তিনি বড়ই খুশি হইলেন। আমি একখণ্ড কাগজ সামনে ধরিয়া বলিলাম, ‘কবিভাই! আমাকে একটি কবিতা লিখে দেন তো।’

আমার ইচ্ছা ছিল এইভাবে কবিকে পূর্ব স্ব-ভাবে ফিরাইয়া আনা। কবি আমার কাগজের উপর লিখিলেন, “আমি দশ হাজার বৎসর বাঁচিব। আমার ছেলেরা পাঁচ হাজার বৎসর বাঁচিবে। জসীম তুমি দশ হাজার বৎসর বাঁচিবে।” ইত্যাদি- সেই কাগজখানা মুড়িয়া আমি পকেটে লইতেছি, এমন সময় তখনকার দিনের কবির একজন স্ব-নির্বাচিত অভিভাবক শাস্তি-নিকেতনি ঢঙে হাত নাড়িয়া আমাকে বলিলেন, “আপনি এই কাগজটুকু লইবেন না। ওটা আমাকে দিন।”

খাল্লাআম্মা এবং ভাবি তখন কবির পার্শ্বে বসা। আমি বলিলাম, “আপনি আমাকে এই লেখা লইবার বারণ করবার কে?”

খালাআম্মা আর ভাবিও আমাকে সমর্থন করিলেন। সেই লেখাটি এখনও আমার কাছে আছে। ইহা হয়তো কবির শেষ লেখা।

তখনকার দিনে এই স্ব-নির্বাচিত অভিভাবকটির অকারণ উৎপাতে কবির বহু বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী কবির সঙ্গে দেখা করিতে যাইয়া বিব্রত হইয়াছেন।

ইহার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ লইয়া আমি ঢাকা চলিয়া আসি। সেটা বোধ হয় ১৯৩৭ সন। আমার ছোট ভাই নূরউদ্‌দীন কলিকাতা কারমাইকেল হোস্টেলে থাকিয়া এম, এ, পড়িত। আমি কলিকাতা গেলেই তাহার অতিথি হইতাম। সেবার কারমাইকেল হোস্টেলে গেলে ছাত্রেরা আমাকে একটি অভ্যর্থনা দেওয়ার আয়োজন করে। সেই সভায় আমাকে প্রচুর ভাবে মাল্যভূষিত করা হয়।

অভিনন্দনের উত্তর দিতে উঠিয়া আমি ছাত্রদিগকে বলিলাম, “যে সময় আমাদের মহান কবি নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হইয়া শহরের পুতি-গন্ধময় একটি অন্ধকার বাড়িতে নানা অর্থ-কষ্টের সঙ্গে সংগ্রাম করিতেছেন, সেই সময়ে আমার মতো এক কবিকে এরূপ মাল্য-ভূষণ দেয়ার কোনো অর্থ হয় না।

যে কবিকে নিরাময় করিয়া তুলিতে পারিলে বিশ্বসাহিত্য-জগতে বাঙালি মুসলমানের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ আসন অধিকৃত হইতে পারিত, আজ সেই কবি রোগের শর-শয্যায় শয়ন করিয়া মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। বাঙালি মুসলমান কি আজ সত্যই মৃত। এই মৃত সমাজের হাতের মালা আমার কণ্ঠে স্থান পাইতে পারে না।”

এই বলিয়া আমি আমার গলার মালাগুলি ছিঁড়িয়া ফেলিলাম। সেই সভায় ছাত্রদের মধ্যে এমনই উদ্দীপনা জাগিয়াছিল যে তখনই তাহারা নজরুল সাহায্য ভাণ্ডার নামে একটি কমিটি গঠন করিয়া ফেলিল। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী মৌলবী তমিজউদ্দীন সাহেব হইলেন এই কমিটির সভাপতি আর বেকার হোস্টেলের তদানীন্তন সুপারিনটেনডেন্ট বন্ধুবর সায়েদুর রহমান হইলেন তার সম্পাদক। ১৯৪৪ সনে আমি যখন নতুন চাকুরি পাইয়া কলিকাতা চলিয়া আসিলাম, তখন আমি এই সমিতির কোঅপটেড মেম্বর হইলাম।

 

চলবে…..

জনপ্রিয় সংবাদ

নন্দিনী হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি, ফলিমারী গ্রামের আতঙ্ক দূরের আহ্বান

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-২০৮)

১১:০০:৪৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫

নজরুল: পরিশিষ্ট

কবির সামনে বসিয়া তাঁর কবিতার কিছুটা আবৃত্তি করিলাম। শুনিয়া তিনি বড়ই খুশি হইলেন। আমি একখণ্ড কাগজ সামনে ধরিয়া বলিলাম, ‘কবিভাই! আমাকে একটি কবিতা লিখে দেন তো।’

আমার ইচ্ছা ছিল এইভাবে কবিকে পূর্ব স্ব-ভাবে ফিরাইয়া আনা। কবি আমার কাগজের উপর লিখিলেন, “আমি দশ হাজার বৎসর বাঁচিব। আমার ছেলেরা পাঁচ হাজার বৎসর বাঁচিবে। জসীম তুমি দশ হাজার বৎসর বাঁচিবে।” ইত্যাদি- সেই কাগজখানা মুড়িয়া আমি পকেটে লইতেছি, এমন সময় তখনকার দিনের কবির একজন স্ব-নির্বাচিত অভিভাবক শাস্তি-নিকেতনি ঢঙে হাত নাড়িয়া আমাকে বলিলেন, “আপনি এই কাগজটুকু লইবেন না। ওটা আমাকে দিন।”

খাল্লাআম্মা এবং ভাবি তখন কবির পার্শ্বে বসা। আমি বলিলাম, “আপনি আমাকে এই লেখা লইবার বারণ করবার কে?”

খালাআম্মা আর ভাবিও আমাকে সমর্থন করিলেন। সেই লেখাটি এখনও আমার কাছে আছে। ইহা হয়তো কবির শেষ লেখা।

তখনকার দিনে এই স্ব-নির্বাচিত অভিভাবকটির অকারণ উৎপাতে কবির বহু বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ী কবির সঙ্গে দেখা করিতে যাইয়া বিব্রত হইয়াছেন।

ইহার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ লইয়া আমি ঢাকা চলিয়া আসি। সেটা বোধ হয় ১৯৩৭ সন। আমার ছোট ভাই নূরউদ্‌দীন কলিকাতা কারমাইকেল হোস্টেলে থাকিয়া এম, এ, পড়িত। আমি কলিকাতা গেলেই তাহার অতিথি হইতাম। সেবার কারমাইকেল হোস্টেলে গেলে ছাত্রেরা আমাকে একটি অভ্যর্থনা দেওয়ার আয়োজন করে। সেই সভায় আমাকে প্রচুর ভাবে মাল্যভূষিত করা হয়।

অভিনন্দনের উত্তর দিতে উঠিয়া আমি ছাত্রদিগকে বলিলাম, “যে সময় আমাদের মহান কবি নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হইয়া শহরের পুতি-গন্ধময় একটি অন্ধকার বাড়িতে নানা অর্থ-কষ্টের সঙ্গে সংগ্রাম করিতেছেন, সেই সময়ে আমার মতো এক কবিকে এরূপ মাল্য-ভূষণ দেয়ার কোনো অর্থ হয় না।

যে কবিকে নিরাময় করিয়া তুলিতে পারিলে বিশ্বসাহিত্য-জগতে বাঙালি মুসলমানের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ আসন অধিকৃত হইতে পারিত, আজ সেই কবি রোগের শর-শয্যায় শয়ন করিয়া মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। বাঙালি মুসলমান কি আজ সত্যই মৃত। এই মৃত সমাজের হাতের মালা আমার কণ্ঠে স্থান পাইতে পারে না।”

এই বলিয়া আমি আমার গলার মালাগুলি ছিঁড়িয়া ফেলিলাম। সেই সভায় ছাত্রদের মধ্যে এমনই উদ্দীপনা জাগিয়াছিল যে তখনই তাহারা নজরুল সাহায্য ভাণ্ডার নামে একটি কমিটি গঠন করিয়া ফেলিল। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী মৌলবী তমিজউদ্দীন সাহেব হইলেন এই কমিটির সভাপতি আর বেকার হোস্টেলের তদানীন্তন সুপারিনটেনডেন্ট বন্ধুবর সায়েদুর রহমান হইলেন তার সম্পাদক। ১৯৪৪ সনে আমি যখন নতুন চাকুরি পাইয়া কলিকাতা চলিয়া আসিলাম, তখন আমি এই সমিতির কোঅপটেড মেম্বর হইলাম।

 

চলবে…..