আশ্রয় নেওয়ার দ্বিধা
ফ্লোরিডার অ্যাপোকায় বসবাসকারী মেক্সিকান কৃষিশ্রমিক মারিয়া জানেন, বড় কোনো ঘূর্ণিঝড় এলে তার কাঠের ঘরটি নিরাপদ নয়। অতীতে তিনি বোনের মজবুত বাড়ি কিংবা স্থানীয় হাইস্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছেন। কিন্তু এখন চারপাশে গ্রেপ্তার ও বিতাড়নের ঘটনাবলি বেড়ে যাওয়ায় তিনি আর নিশ্চিত নন—এসব আশ্রয় কি সত্যিই নিরাপদ? তার ভয়, যেকোনো মুহূর্তে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ হাজির হতে পারে।
মারিয়ার ভাষায়, “তারা চাইলে যেকোনো জায়গায় ঢুকে পড়ে। কোনো সীমা নেই।”
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অভিবাসী সংকট
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাসকারীদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবসময় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। এবারও আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অভিবাসীদের মতে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
একসময় স্কুল, হাসপাতাল বা জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থাকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিত অভিবাসীরা। এখন সেসব স্থানও সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় পুলিশ ও ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতার কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ফলে অভিবাসীদের সামনে প্রশ্ন—“ঝড়ের ঝুঁকি নেব, নাকি আশ্রয়ে গিয়ে আটক হওয়ার ভয়ে পরিবারকে বিপদে ফেলব?”
নতুন নীতি ও বাড়তি আতঙ্ক
২০২৫ সালের শুরু থেকে শত শত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ২৮৭(g) চুক্তি সই করেছে, যা তাদেরকে সীমিত অভিবাসন তল্লাশির ক্ষমতা দিয়েছে। এসব চুক্তির বেশিরভাগই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে কার্যকর হয়েছে।
ফ্লোরিডায় নতুন আটক কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগ কাজ করছে। ফেমা (FEMA)-এর তহবিল ব্যবহার হচ্ছে আরও আটক কেন্দ্র তৈরিতে। এমনকি ফেমার কিছু কর্মীকে-ও অভিবাসন দপ্তরে কাজ করার জন্য সাময়িকভাবে পাঠানো হয়েছে। ন্যাশনাল গার্ড — যাদের দুর্যোগের সময় সাধারণত খাদ্য ও পানি বিতরণ করতে দেখা যায় — এখন আটক কেন্দ্রেও সহায়তা করছে।
টেক্সাসের সাম্প্রতিক বন্যায় দেখা গেছে, পুলিশের চৌকস নিয়ন্ত্রণ আর ফেমা কেন্দ্রগুলোয় প্রবেশে তল্লাশি অনেক বৈধ পরিবারকেও আতঙ্কিত করেছে। অনেকেই এমনকি ডুবন্ত নথিপত্র পুনর্নবীকরণে দূতাবাসে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে আইন আরও কঠোর
ফ্লোরিডায় ফেব্রুয়ারিতে এক আইন পাস হয়, যেখানে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া রাজ্যে প্রবেশকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। যদিও আদালত আপাতত সেটি স্থগিত রেখেছে। একইসঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশের জন্য পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হলে অনেকেই আর সেখানে যেতে সাহস পান না।
ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় যে নীতি ছিল—স্কুল, হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে “সুরক্ষিত এলাকা” ধরা হবে—ট্রাম্প প্রশাসন তা বাতিল করেছে। এখন এসব স্থানে অভিবাসন অভিযান চালানো সম্ভব।
এমনকি দুর্যোগোত্তর ত্রাণ প্রক্রিয়াতেও ভয় কাজ করছে। যেসব পরিবার ফেমা থেকে সহায়তার যোগ্য, তারাও আবেদন করতে দ্বিধা করেন—কারণ আশঙ্কা থাকে তথ্য ফাঁস হয়ে আটক হওয়ার।
সরকারের নীরবতা ও অনিশ্চয়তা
ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেনি, দুর্যোগের সময় অভিবাসন অভিযান স্থগিত থাকবে কি না। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (DHS) জানিয়েছে, “সীমান্তে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি, তাই নির্দেশ জারি করা হয়নি।”
ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের জরুরি ব্যবস্থাপনা দপ্তরও কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। ফলে অভিবাসীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
স্থানীয় উদ্যোগ ও সহায়তার চেষ্টা
তবুও কিছু স্থানীয় প্রশাসন অভিবাসীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ফ্লোরিডার আলাচুয়া কাউন্টি জরুরি বার্তা স্প্যানিশ, হাইতিয়ান ক্রেওল-সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ ও প্রচার করছে। তারা বলছে, আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশে পরিচয়পত্র চাইবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলে তাদের হাতে কিছু করার থাকবে না।
অ্যাপোকার হোপ কমিউনিটি সেন্টার স্থানীয়ভাবে বিকল্প আশ্রয় ও ত্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। তারা দরজায় দরজায় গিয়ে খাবার ও পানি পৌঁছে দেয়, একাধিক ভাষায় সতর্কবার্তা প্রচার করে। এর পরিচালক ফেলিপে সোসা লাজাবালেতের ভাষায়, “এটা অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ড, তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবস্থা। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংকট, ফলে মানুষ ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবার সুযোগই পায় না।”
ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত অবস্থায় বসবাসকারী অভিবাসীরা দ্বিমুখী সংকটে পড়ছেন। একদিকে ঝড়ের প্রাণঘাতী হুমকি, অন্যদিকে আটক ও বিতাড়নের ভয়। স্থানীয় সংগঠনগুলো সচেষ্ট হলেও সরকারি নীতির কঠোরতায় এই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে ঝুঁকির মুখে অবৈধ অভিবাসীরা
-
সারাক্ষণ রিপোর্ট - ১১:৪৬:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
- 31
জনপ্রিয় সংবাদ




















