০৩:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
স্বেচ্ছাসেবায় করপোরেট জাগরণ, ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০০ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে চায় সিঙ্গাপুর চীনের শত শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দাবি ট্রাম্পের, বৈঠকে উঠে এলো ইরান-তাইওয়ান ইস্যুও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়, ওয়াশিংটনে সই হলো সমঝোতা স্মারক হাতীবান্ধা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা এআই যুগে সাইবার যুদ্ধের নতুন আতঙ্ক, হ্যাকারদের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্বে টালমাটাল লেবার, ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম চীনের সামনে এখন সাম্রাজ্যের সেই পুরোনো ফাঁদ দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় উসকানি’, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ক্ষুব্ধ বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির নতুন প্রতিযোগিতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার মধ্যস্থতাকারী কে? বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন শিথিলতা: বাণিজ্য অর্থায়নে বাড়ল ঋণসীমা

দত্তক শিল্পী হেনরিক উলদলেন: পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা আর নিজের খোঁজে কাঁচা প্রতিকৃতি

নরওয়ে-প্রবাসী কোরিয়ান দত্তক শিল্পী হেনরিক উলুদে তাঁর সাম্প্রতিক প্রদর্শনী ‘লস্ট/ফাউন্ড’-এ তুলে এনেছেন নিজের জীবনের গভীর সংকট—পরিচয়, পরিত্যাগ, বেদনা, সংযোগ এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতার যাত্রা। সিউলের হোয়াইট স্টোন গ্যালারিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি প্রথমবার নিজের অতীতের অস্বীকার ও গোপন দুঃখের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।


জন্ম, দত্তক ও পরিচয় সংকট

১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিউলে জন্ম নেওয়া হেনরিক কয়েক মাসের মধ্যেই নরওয়ের এক দম্পতির কাছে দত্তক যান। অসলো সংলগ্ন আসকার শহরে স্নেহময় পরিবারে বড় হলেও নিজের কোরিয়ান পরিচয় থেকে তিনি দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন।

তিনি বলেন,
“আমি জীবনের বেশিরভাগ সময় দত্তক নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছি। বাবা-মা যখন কোরিয়া নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন, আমি থামিয়ে দিয়েছি। আমি শুধু ‘স্বাভাবিক’ নরওয়েজিয়ান হতে চেয়েছিলাম।”

কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছেন—নিজেকে অস্বীকার করার ফলে জন্মেছে শেকড়হীনতা, কোথাও না মেশার অনুভূতি এবং নিজের চেহারাগত ভিন্নতা নিয়ে অস্বস্তি।


‘লস্ট/ফাউন্ড’: কাঁচা আবেগের মুখোমুখি হওয়া

২০২৪ সালে হোয়াইট স্টোন গ্যালারির আমন্ত্রণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। ৩০টি তৈলচিত্র নিয়ে ৩০ আগস্ট থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সিউলে অনুষ্ঠিত তাঁর একক প্রদর্শনী ‘লস্ট/ফাউন্ড’ আসলে নিজের গভীর যন্ত্রণার খোলা জবানবন্দি।

উলদলেন বলেন,
“এটা ছিল বিশ্বাসভঙ্গ, পরিত্যাগ ও পরিচয়ের কাঁচা অনুভূতির প্রকাশ। নিজেকে বুঝতে, মুক্ত করতে আমাকে শিশুর মতো আদিমভাবে আঁকতে হয়েছে।”

চিত্রগুলো মুখের বিকৃত প্রতিকৃতি—একটি পুনরাবৃত্ত মোটিফ—তাঁর মনের দিশেহারা অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আগুনে ক্যানভাস পোড়ানো, রাসায়নিক মুছে দেওয়া—এমন পদ্ধতিতে তিনি তৈরি করেন এই বিকৃতি, যা তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ক দীর্ঘ শিল্পযাত্রার অংশ।

গ্যালারির পরিচালক পার্ক জি-ইয়ং বলেন,
“তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসই প্রথম আমাদের নজর কাড়ে। অনেক দর্শক শুরুতে ছবিগুলোকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলেছেন, কিন্তু তাঁর গল্প জানার পর ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।”


শিল্পী জীবন, মাধ্যম ও নতুন অনুসন্ধান

তেলরঙ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম। ১৯ বছর বয়সে প্রথমবার তেলচিত্র ধরে তিনি বুঝে যান—এটাই তাঁর পথ। তবে মাধ্যমের বাইরে গিয়ে তিনি এখন ভিডিওগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফিতে কাজ শুরু করেছেন।


২৫ বছর পর কোরিয়ায় ফেরা

১৬ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার কোরিয়া এলেও নিজের জন্মভূমির প্রতি তখন তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। এবার পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন।

তিনি জানান,
“গ্যালারি আমাকে একক প্রদর্শনী করার প্রস্তাব দেওয়ার পর আমি নরওয়েতে গিয়ে বাবা-মাকে বললাম। তাঁরা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। প্রথমবার বাবাকে কাঁদতে দেখলাম। তাঁরা সবসময় চেয়েছেন আমি নিজের শিকড় খুঁজে দেখি।”

কোরিয়ায় এসে তিনি বিস্মিত হন মানুষের উষ্ণতায়।
“গ্যালারিতে আমার কাছে কেউ ‘ভাই’, কেউ ‘ছেলে’ বলে ডাকছিল। অনেকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে, কেউ কেউ কেঁদেছেনও। চোখ খুলে গেল—কোরিয়া আর তার মানুষদের সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছা করছে।”

স্ত্রীর সঙ্গে তিনি হাঁটছেন সিউলের গলি, বাজার, সাবওয়ে—আর অনুভব করছেন এক ধরনের স্বস্তি। তাঁরা আগামী বছর ফিরতে চান।


দত্তক জীবনের বাস্তবতা ও নতুন উপলব্ধি

প্রদর্শনীর আগে-পরে বহু কোরিয়ান দত্তক সন্তান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

উলদলেন বলেন,
“কারও গল্প অসাধারণ, কারও ভয়াবহ। আমি ভালো পরিবেশে বড় হয়েছি, কিন্তু সবাই সেই সৌভাগ্য পায়নি।”

কোরিয়ান সরকারের অতীত দত্তক প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও অনিয়ম সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি স্তব্ধও হয়েছেন। তবু তাঁর উপলব্ধি পরিষ্কার—
“যে দরজাগুলোকে সবচেয়ে এড়িয়ে চলেছি, সেগুলোই খুলে দেখার প্রয়োজন ছিল।”


#ট্যাগ

#হেনরিক_উলদলেন #দত্তকপরিচয় #কোরিয়ান_শিল্পী #লস্টফাউন্ড_প্রদর্শনী #সারাক্ষণ_রিপোর্ট

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বেচ্ছাসেবায় করপোরেট জাগরণ, ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০০ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে চায় সিঙ্গাপুর

দত্তক শিল্পী হেনরিক উলদলেন: পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা আর নিজের খোঁজে কাঁচা প্রতিকৃতি

১২:৪০:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

নরওয়ে-প্রবাসী কোরিয়ান দত্তক শিল্পী হেনরিক উলুদে তাঁর সাম্প্রতিক প্রদর্শনী ‘লস্ট/ফাউন্ড’-এ তুলে এনেছেন নিজের জীবনের গভীর সংকট—পরিচয়, পরিত্যাগ, বেদনা, সংযোগ এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতার যাত্রা। সিউলের হোয়াইট স্টোন গ্যালারিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি প্রথমবার নিজের অতীতের অস্বীকার ও গোপন দুঃখের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।


জন্ম, দত্তক ও পরিচয় সংকট

১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিউলে জন্ম নেওয়া হেনরিক কয়েক মাসের মধ্যেই নরওয়ের এক দম্পতির কাছে দত্তক যান। অসলো সংলগ্ন আসকার শহরে স্নেহময় পরিবারে বড় হলেও নিজের কোরিয়ান পরিচয় থেকে তিনি দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন।

তিনি বলেন,
“আমি জীবনের বেশিরভাগ সময় দত্তক নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছি। বাবা-মা যখন কোরিয়া নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন, আমি থামিয়ে দিয়েছি। আমি শুধু ‘স্বাভাবিক’ নরওয়েজিয়ান হতে চেয়েছিলাম।”

কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝেছেন—নিজেকে অস্বীকার করার ফলে জন্মেছে শেকড়হীনতা, কোথাও না মেশার অনুভূতি এবং নিজের চেহারাগত ভিন্নতা নিয়ে অস্বস্তি।


‘লস্ট/ফাউন্ড’: কাঁচা আবেগের মুখোমুখি হওয়া

২০২৪ সালে হোয়াইট স্টোন গ্যালারির আমন্ত্রণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। ৩০টি তৈলচিত্র নিয়ে ৩০ আগস্ট থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সিউলে অনুষ্ঠিত তাঁর একক প্রদর্শনী ‘লস্ট/ফাউন্ড’ আসলে নিজের গভীর যন্ত্রণার খোলা জবানবন্দি।

উলদলেন বলেন,
“এটা ছিল বিশ্বাসভঙ্গ, পরিত্যাগ ও পরিচয়ের কাঁচা অনুভূতির প্রকাশ। নিজেকে বুঝতে, মুক্ত করতে আমাকে শিশুর মতো আদিমভাবে আঁকতে হয়েছে।”

চিত্রগুলো মুখের বিকৃত প্রতিকৃতি—একটি পুনরাবৃত্ত মোটিফ—তাঁর মনের দিশেহারা অবস্থার প্রতিচ্ছবি। আগুনে ক্যানভাস পোড়ানো, রাসায়নিক মুছে দেওয়া—এমন পদ্ধতিতে তিনি তৈরি করেন এই বিকৃতি, যা তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ক দীর্ঘ শিল্পযাত্রার অংশ।

গ্যালারির পরিচালক পার্ক জি-ইয়ং বলেন,
“তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসই প্রথম আমাদের নজর কাড়ে। অনেক দর্শক শুরুতে ছবিগুলোকে ‘ভয়ঙ্কর’ বলেছেন, কিন্তু তাঁর গল্প জানার পর ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।”


শিল্পী জীবন, মাধ্যম ও নতুন অনুসন্ধান

তেলরঙ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম। ১৯ বছর বয়সে প্রথমবার তেলচিত্র ধরে তিনি বুঝে যান—এটাই তাঁর পথ। তবে মাধ্যমের বাইরে গিয়ে তিনি এখন ভিডিওগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফিতে কাজ শুরু করেছেন।


২৫ বছর পর কোরিয়ায় ফেরা

১৬ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার কোরিয়া এলেও নিজের জন্মভূমির প্রতি তখন তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। এবার পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন।

তিনি জানান,
“গ্যালারি আমাকে একক প্রদর্শনী করার প্রস্তাব দেওয়ার পর আমি নরওয়েতে গিয়ে বাবা-মাকে বললাম। তাঁরা আনন্দে কেঁদে ফেললেন। প্রথমবার বাবাকে কাঁদতে দেখলাম। তাঁরা সবসময় চেয়েছেন আমি নিজের শিকড় খুঁজে দেখি।”

কোরিয়ায় এসে তিনি বিস্মিত হন মানুষের উষ্ণতায়।
“গ্যালারিতে আমার কাছে কেউ ‘ভাই’, কেউ ‘ছেলে’ বলে ডাকছিল। অনেকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয়েছে, কেউ কেউ কেঁদেছেনও। চোখ খুলে গেল—কোরিয়া আর তার মানুষদের সম্পর্কে আরও জানতে ইচ্ছা করছে।”

স্ত্রীর সঙ্গে তিনি হাঁটছেন সিউলের গলি, বাজার, সাবওয়ে—আর অনুভব করছেন এক ধরনের স্বস্তি। তাঁরা আগামী বছর ফিরতে চান।


দত্তক জীবনের বাস্তবতা ও নতুন উপলব্ধি

প্রদর্শনীর আগে-পরে বহু কোরিয়ান দত্তক সন্তান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

উলদলেন বলেন,
“কারও গল্প অসাধারণ, কারও ভয়াবহ। আমি ভালো পরিবেশে বড় হয়েছি, কিন্তু সবাই সেই সৌভাগ্য পায়নি।”

কোরিয়ান সরকারের অতীত দত্তক প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও অনিয়ম সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি স্তব্ধও হয়েছেন। তবু তাঁর উপলব্ধি পরিষ্কার—
“যে দরজাগুলোকে সবচেয়ে এড়িয়ে চলেছি, সেগুলোই খুলে দেখার প্রয়োজন ছিল।”


#ট্যাগ

#হেনরিক_উলদলেন #দত্তকপরিচয় #কোরিয়ান_শিল্পী #লস্টফাউন্ড_প্রদর্শনী #সারাক্ষণ_রিপোর্ট