যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ড’ উদ্যোগকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। বৈশ্বিক সংঘাত সমাধানের নামে এই নতুন কাঠামো জাতিসংঘের ভূমিকা দুর্বল করতে পারে—এমন আশঙ্কায় অধিকাংশ দেশ প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে চাইছে না। ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে নীরব সতর্কতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আমন্ত্রণ পেলেও নীরবতা
গত শনিবার ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে প্রায় ষাটটি দেশের কাছে ট্রাম্প প্রশাসনের পাঠানো আমন্ত্রণপত্র পৌঁছাতে শুরু করে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত একমাত্র হাঙ্গেরি স্পষ্টভাবে এই প্রস্তাব গ্রহণের কথা জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘সম্মানজনক আমন্ত্রণ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে অন্যান্য দেশ প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই উদ্যোগ জাতিসংঘের চলমান কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
:max_bytes(150000):strip_icc()/GettyImages-126363856-59c67c1aaad52b0011324376.jpg)
শান্তি বোর্ডের কাঠামো ও শর্ত
আমন্ত্রণপত্র ও খসড়া সনদ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত শান্তি বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সেই পদ থাকবে আজীবন। প্রাথমিকভাবে গাজা সংকট নিয়ে কাজ শুরু করবে এই বোর্ড, পরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংঘাতেও ভূমিকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছে তিন বছর। তবে যে দেশ একশ কোটি ডলার অর্থায়ন করবে, তারা স্থায়ী সদস্যপদ পাবে।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই স্থায়ী সদস্যপদ শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতি গভীর অঙ্গীকার দেখানো অংশীদার দেশগুলোর জন্য রাখা হয়েছে।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও দ্বিধা
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময় জানান, তার দেশ নিজেদের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। তবে তিনি গাজা নাকি পুরো শান্তি বোর্ড উদ্যোগের কথা বলেছেন, তা স্পষ্ট করেননি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানান, গাজা ইস্যুতে শান্তি বোর্ডের ধারণার সঙ্গে তিনি নীতিগতভাবে একমত, যদিও বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এরই মধ্যে গত নভেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজা সংকট মোকাবিলায় সীমিত মেয়াদের একটি শান্তি কাঠামোর অনুমোদন দেয়, যার মেয়াদ রয়েছে দুই হাজার সাতাশ সাল পর্যন্ত। তবে সেখানে রাশিয়া ও চীন ভোটদানে বিরত থাকে, কারণ প্রস্তাবে গাজার ভবিষ্যতে জাতিসংঘের ভূমিকা স্পষ্ট ছিল না।

ইউরোপীয় উদ্বেগ ও ‘অন্ধকার সময়ের’ আশঙ্কা
আমন্ত্রণ পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত সনদ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একাধিক কূটনীতিকের মতে, এটি কার্যকর হলে জাতিসংঘের মৌলিক সনদ উপেক্ষিত হবে। এক ইউরোপীয় কূটনীতিক মন্তব্য করেন, এটি যেন একটি বিকল্প জাতিসংঘ, যেখানে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়মের গুরুত্ব নেই। আরও কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জাতিসংঘই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার নৈতিক ও আইনগত ক্ষমতা রয়েছে সব দেশকে একত্র করার। এই কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হলে বিশ্ব আবার অন্ধকার সময়ের দিকে ফিরে যেতে পারে।

জাতিসংঘের অবস্থান
জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র জানান, সদস্য দেশগুলো চাইলে বিভিন্ন জোটে যুক্ত হতে পারে, তবে জাতিসংঘ তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাবে। সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিকল্প কাঠামো নয়, বরং জাতিসংঘই আন্তর্জাতিক শান্তি ও শাসনের বৈধ মঞ্চ।
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শান্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, গাজা দিয়ে শুরু করে ভবিষ্যতে উদ্ভূত অন্যান্য সংঘাতেও শান্তি বোর্ড সক্রিয় হবে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রতি আগ্রহী ট্রাম্প এই উদ্যোগকে একেবারেই ব্যতিক্রমী বলে দাবি করেছেন। তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিদেশি ভূখণ্ডের শাসন তদারকিতে এমন বোর্ড গঠনের ধারণা ঔপনিবেশিক কাঠামোর স্মৃতি জাগায়।

গাজা শাসন ও বিতর্ক
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় গাজায় একটি কারিগরি প্রশাসনের কথা বলা হয়েছে, যার ওপর নজরদারি করবে একটি আন্তর্জাতিক বোর্ড। ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই নীতিগতভাবে এই পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে। তবে আলাদা করে গঠিত গাজা নির্বাহী বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ইসরায়েল আপত্তি তুলেছে। তাদের দাবি, এই বোর্ডের গঠন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে করা হয়নি।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড উদ্যোগ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি সত্যিই শান্তির পথ খুলবে, নাকি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলবে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বিশ্ব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















