১১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি লাজুক জুঁই

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, রেমিট্যান্সের ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসী আয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের পেছনে রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু রেমিট্যান্সে নয়, দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক খাতেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কতটা মধ্যপ্রাচরনির্ভর?

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস।

শুধু রেমিট্যান্স নয়, বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও বিপুল অংশ এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান পায়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশে কর্মসংস্থান পাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৮০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যে যায়।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

কেন যুদ্ধ রেমিট্যান্সের জন্য ঝুঁকি?

বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শ্রমবাজারের দুর্বলতা রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে গেলে অভিবাসনপ্রবণ দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো কয়েকটি স্তরে কাজ করতে পারে।

প্রথমত, বিমান চলাচল ব্যাহত হলে নতুন শ্রমিক পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে, যা কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নির্মাণ, অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমতে পারে। আর মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বড় অংশই নির্মাণ, সেবা ও শ্রমনির্ভর খাতে কাজ করেন।

তৃতীয়ত, যুদ্ধের কারণে তেলবহির্ভূত অর্থনৈতিক কার্যক্রম দুর্বল হলে নিয়োগ কমে যেতে পারে এবং নতুন কর্মী নেওয়ার হার হ্রাস পেতে পারে।

চতুর্থত, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কী বলছে?

বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একাধিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, চলতি হিসাবের ওপর চাপ এবং দুর্বল রেমিট্যান্স প্রবাহ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আরও একধাপ এগিয়ে সতর্ক করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পর্যটন, বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্সের ওপরও।

সিঙ্গাপুরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উভয়ই চাপে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমও মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: প্রবাসী আয়ে এখনো প্রভাব নেই, তবে ঝুঁকির শঙ্কা

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ মিলিয়ে এখন যে বাস্তবতা সামনে আসছে, তা কয়েক মাস আগের তুলনায় ভিন্ন। শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত হয়তো সীমিত পরিসরে থাকবে এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে। কিন্তু গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ, পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার বিস্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প। ২০১০-এর দশকের শুরুতে যেখানে বার্ষিক প্রবাসী আয় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল, সেখানে বর্তমানে তা ৩০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠন, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ সৃষ্টি এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে এই রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি ছিল প্রবাসী আয়।

কিন্তু এই সাফল্যের একটি বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের বিশাল অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়।

এরই মধ্যে সেই ঝুঁকির প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনের প্রথম ছয় দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৮৩ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম। এক সপ্তাহের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না, কিন্তু যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পতন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই স্বাভাবিক।

সম্ভবত এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্বাভাবিক আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতার সুরও যুক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে বলেছে, বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও সংঘাত দীর্ঘ হলে শ্রম অভিবাসন ব্যাহত হতে পারে, কর্মসংস্থান কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়তে পারে।

অবশ্যই পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক নয়। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে এবং বিদেশে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক এখনো নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয় হলো ভবিষ্যৎ। কারণ আজকের রেমিট্যান্স মূলত গত কয়েক বছরের শ্রম অভিবাসনের ফল, আর আগামী দিনের রেমিট্যান্স নির্ভর করবে নতুন শ্রমিক নিয়োগ, কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির গতিপথের ওপর।

সুতরাং বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী বর্তমান, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সম্ভাব্য চাপের ভবিষ্যৎ। গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাংলাদেশি প্রবাসীরা বারবার সংকট মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে একটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং জুনের শুরুতে রেমিট্যান্সে ২১ শতাংশ পতনের তথ্য মিলিয়ে বলা যায়, এখনই আতঙ্কের সময় নয়; তবে প্রস্তুতির সময় অবশ্যই শুরু হয়ে গেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, রেমিট্যান্সের ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

০৫:৫১:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি প্রবাসী আয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নের পেছনে রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু রেমিট্যান্সে নয়, দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক খাতেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কতটা মধ্যপ্রাচরনির্ভর?

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশ আসে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইন বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস।

শুধু রেমিট্যান্স নয়, বিদেশগামী বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও বিপুল অংশ এই অঞ্চলে কর্মসংস্থান পায়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশে কর্মসংস্থান পাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৮০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্যে যায়।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

কেন যুদ্ধ রেমিট্যান্সের জন্য ঝুঁকি?

বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শ্রমবাজারের দুর্বলতা রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে গেলে অভিবাসনপ্রবণ দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো কয়েকটি স্তরে কাজ করতে পারে।

প্রথমত, বিমান চলাচল ব্যাহত হলে নতুন শ্রমিক পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যগামী কিছু ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে, যা কর্মসংস্থান প্রক্রিয়াকে ধীর করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে নির্মাণ, অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমতে পারে। আর মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বড় অংশই নির্মাণ, সেবা ও শ্রমনির্ভর খাতে কাজ করেন।

তৃতীয়ত, যুদ্ধের কারণে তেলবহির্ভূত অর্থনৈতিক কার্যক্রম দুর্বল হলে নিয়োগ কমে যেতে পারে এবং নতুন কর্মী নেওয়ার হার হ্রাস পেতে পারে।

চতুর্থত, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জরুরি সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কী বলছে?

বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জন্য একাধিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, চলতি হিসাবের ওপর চাপ এবং দুর্বল রেমিট্যান্স প্রবাহ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) আরও একধাপ এগিয়ে সতর্ক করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পর্যটন, বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্সের ওপরও।

সিঙ্গাপুরের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উভয়ই চাপে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমও মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: প্রবাসী আয়ে এখনো প্রভাব নেই, তবে ঝুঁকির শঙ্কা

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ মিলিয়ে এখন যে বাস্তবতা সামনে আসছে, তা কয়েক মাস আগের তুলনায় ভিন্ন। শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত হয়তো সীমিত পরিসরে থাকবে এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে। কিন্তু গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ, পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার বিস্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সাফল্যের গল্প। ২০১০-এর দশকের শুরুতে যেখানে বার্ষিক প্রবাসী আয় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল, সেখানে বর্তমানে তা ৩০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠন, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ সৃষ্টি এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে এই রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি ছিল প্রবাসী আয়।

কিন্তু এই সাফল্যের একটি বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের বিশাল অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়; এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়।

এরই মধ্যে সেই ঝুঁকির প্রাথমিক ইঙ্গিত দেখা যেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুনের প্রথম ছয় দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৮৩ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ কম। এক সপ্তাহের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না, কিন্তু যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পতন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই স্বাভাবিক।

সম্ভবত এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্বাভাবিক আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতার সুরও যুক্ত করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে বলেছে, বর্তমানে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও সংঘাত দীর্ঘ হলে শ্রম অভিবাসন ব্যাহত হতে পারে, কর্মসংস্থান কমতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়তে পারে।

অবশ্যই পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক নয়। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে এবং বিদেশে কর্মরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক এখনো নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয় হলো ভবিষ্যৎ। কারণ আজকের রেমিট্যান্স মূলত গত কয়েক বছরের শ্রম অভিবাসনের ফল, আর আগামী দিনের রেমিট্যান্স নির্ভর করবে নতুন শ্রমিক নিয়োগ, কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতির গতিপথের ওপর।

সুতরাং বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী বর্তমান, অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সম্ভাব্য চাপের ভবিষ্যৎ। গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বাংলাদেশি প্রবাসীরা বারবার সংকট মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে একটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এবং জুনের শুরুতে রেমিট্যান্সে ২১ শতাংশ পতনের তথ্য মিলিয়ে বলা যায়, এখনই আতঙ্কের সময় নয়; তবে প্রস্তুতির সময় অবশ্যই শুরু হয়ে গেছে।