০১:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত ৪১, হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রক্ত পরীক্ষাতেই মিলতে পারে ফুসফুসের ক্যানসারের আগাম সতর্কতা, নতুন গবেষণায় আশার আলো মমতা-সোনিয়া বৈঠকে ভবিষ্যৎ জোটের ইঙ্গিত, দিল্লিতে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে জোর আলোচনা নেহরুর রেকর্ড ছাড়িয়ে ইতিহাস গড়তে চলেছেন মোদি, দাবি অমিত শাহের দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের নাম থেকে বাদ যাচ্ছে ‘ধাম’, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর মেয়েকে তলব, সিএমআরএল অর্থপাচার মামলায় ইডির জিজ্ঞাসাবাদ মমতার বাড়িতে সিআইডি তল্লাশি, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক মার্কিন ঋণবাজারে বিদেশি সরকারের আগ্রহ কমছে, বাড়ছে নতুন উদ্বেগ কিউবার সংকটে মতাদর্শের লড়াই, বাস্তবতার পথে হাঁটার আহ্বান কলম্বিয়ার নির্বাচনে মধ্যপন্থার পতন, মুখোমুখি কঠোর ডান ও বাম রাজনীতি

শিক্ষা নয়, আতঙ্ক: হিটলার-তুলনার রাজনীতি কেন বারবার ব্যর্থ হয়

ইতিহাসকে রাজনীতিতে টেনে আনা নতুন কিছু নয়। সংকটের সময় মানুষ অতীতের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর দিকে তাকিয়ে বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন ইতিহাস সতর্কবার্তার বদলে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা বাস্তব সমস্যার সমাধানকে আরও কঠিন করে তোলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাৎসি, ফ্যাসিস্ট বা হিটলারের উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করা। উদ্দেশ্য একটাই: ভোটারদের ভয় দেখানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কৌশল কি আদৌ কাজ করে?

রাজনীতিতে নৈতিক সতর্কবার্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মতাদর্শ বা আন্দোলন যদি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তাহলে তা নিয়ে সতর্ক করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু প্রতিটি বিতর্ক, প্রতিটি নীতি বা প্রতিটি বিতর্কিত নেতাকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করতে করতে এই ভাষা এতটাই ব্যবহৃত হয়েছে যে এর প্রভাব অনেকাংশে হারিয়ে গেছে। আজকের ভোটাররা এমন তুলনা শুনে আর বিস্মিত হন না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা তা রাজনৈতিক অতিরঞ্জন হিসেবে দেখেন।

এর পেছনে একটি বাস্তব কারণ রয়েছে। মানুষ সাধারণত কোনো নেতাকে সমর্থন করে শুধুমাত্র তার চরিত্রের কারণে নয়, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উদ্বেগের কারণে। যখন তারা মনে করে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তারা বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই অবস্থায় তাদের বলা যে কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দল ইতিহাসের কোনো ভয়াবহ অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি, প্রায়ই তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না।

ইতিহাসও একই কথা বলে। জার্মানির ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের পতনের কাহিনি সাধারণত এমনভাবে বলা হয় যেন জনগণ বিপদের লক্ষণ বুঝতে পারেনি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বহু মানুষ জানত নাৎসি আন্দোলন কী প্রতিনিধিত্ব করে। তারা রাজনৈতিক সহিংসতা দেখেছিল, উগ্র বক্তব্য শুনেছিল, আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে অবগত ছিল। তবু শেষ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক ভোটার সেই শক্তির দিকেই ঝুঁকেছিল। কারণ তাদের কাছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক অনিশ্চয়তা ছিল আরও তাৎক্ষণিক বাস্তবতা।

German historian Volker Ullrich on Hitler comparisons in the time of Trump  - The Globe and Mail

এই সত্যটি আজও প্রাসঙ্গিক। যখন মানুষ চাকরি, জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা বা সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়—কে সমাধান দিতে পারবে? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাৎসি বা ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যা দেওয়া সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং কখনও কখনও এটি বিপরীত ফলও তৈরি করে। ভোটাররা অনুভব করতে পারে যে তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের নৈতিকভাবে তিরস্কার করা হচ্ছে।

এ কারণেই বহু দেশে দেখা যাচ্ছে, কঠোর ভাষায় সমালোচিত বা চরমপন্থী বলে চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে না। ইতিহাসের ভয় দেখিয়ে তাদের সমর্থন থামানো যাচ্ছে না। কারণ ভোটারদের সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে আরও গভীর অসন্তোষ, যা কেবল নৈতিক সতর্কবার্তা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

অবশ্যই ইতিহাসের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব এবং উগ্র রাজনীতির ঝুঁকি সম্পর্কে অতীত আমাদের মূল্যবান শিক্ষা দেয়। কিন্তু ইতিহাসকে শিক্ষার উৎস হিসেবে ব্যবহার করা আর রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি সচেতনতা তৈরি করে, দ্বিতীয়টি প্রায়ই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য ইতিহাসের উদাহরণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর রাজনীতি। মানুষকে এমন বিশ্বাস দিতে হবে যে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব, বাস্তবসম্মত নীতি এবং জীবনের উন্নতির দৃশ্যমান সম্ভাবনা—এসবই ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। কেবল অতীতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সেই আস্থা তৈরি করা যায় না।

রাজনীতিতে ভয় একটি শক্তিশালী আবেগ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আশা তার চেয়েও শক্তিশালী। যারা গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে চান, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই: ভোটারদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত ৪১, হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে

শিক্ষা নয়, আতঙ্ক: হিটলার-তুলনার রাজনীতি কেন বারবার ব্যর্থ হয়

১১:০০:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

ইতিহাসকে রাজনীতিতে টেনে আনা নতুন কিছু নয়। সংকটের সময় মানুষ অতীতের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর দিকে তাকিয়ে বর্তমানকে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন ইতিহাস সতর্কবার্তার বদলে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা বাস্তব সমস্যার সমাধানকে আরও কঠিন করে তোলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ব্রিটেনে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাৎসি, ফ্যাসিস্ট বা হিটলারের উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করা। উদ্দেশ্য একটাই: ভোটারদের ভয় দেখানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কৌশল কি আদৌ কাজ করে?

রাজনীতিতে নৈতিক সতর্কবার্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মতাদর্শ বা আন্দোলন যদি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তাহলে তা নিয়ে সতর্ক করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। কিন্তু প্রতিটি বিতর্ক, প্রতিটি নীতি বা প্রতিটি বিতর্কিত নেতাকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করতে করতে এই ভাষা এতটাই ব্যবহৃত হয়েছে যে এর প্রভাব অনেকাংশে হারিয়ে গেছে। আজকের ভোটাররা এমন তুলনা শুনে আর বিস্মিত হন না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা তা রাজনৈতিক অতিরঞ্জন হিসেবে দেখেন।

এর পেছনে একটি বাস্তব কারণ রয়েছে। মানুষ সাধারণত কোনো নেতাকে সমর্থন করে শুধুমাত্র তার চরিত্রের কারণে নয়, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উদ্বেগের কারণে। যখন তারা মনে করে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তারা বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই অবস্থায় তাদের বলা যে কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দল ইতিহাসের কোনো ভয়াবহ অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি, প্রায়ই তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না।

ইতিহাসও একই কথা বলে। জার্মানির ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রের পতনের কাহিনি সাধারণত এমনভাবে বলা হয় যেন জনগণ বিপদের লক্ষণ বুঝতে পারেনি। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বহু মানুষ জানত নাৎসি আন্দোলন কী প্রতিনিধিত্ব করে। তারা রাজনৈতিক সহিংসতা দেখেছিল, উগ্র বক্তব্য শুনেছিল, আন্দোলনের চরিত্র সম্পর্কে অবগত ছিল। তবু শেষ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক ভোটার সেই শক্তির দিকেই ঝুঁকেছিল। কারণ তাদের কাছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক অনিশ্চয়তা ছিল আরও তাৎক্ষণিক বাস্তবতা।

German historian Volker Ullrich on Hitler comparisons in the time of Trump  - The Globe and Mail

এই সত্যটি আজও প্রাসঙ্গিক। যখন মানুষ চাকরি, জীবনযাত্রার ব্যয়, নিরাপত্তা বা সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে, তখন তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়—কে সমাধান দিতে পারবে? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নাৎসি বা ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যা দেওয়া সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং কখনও কখনও এটি বিপরীত ফলও তৈরি করে। ভোটাররা অনুভব করতে পারে যে তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের নৈতিকভাবে তিরস্কার করা হচ্ছে।

এ কারণেই বহু দেশে দেখা যাচ্ছে, কঠোর ভাষায় সমালোচিত বা চরমপন্থী বলে চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে না। ইতিহাসের ভয় দেখিয়ে তাদের সমর্থন থামানো যাচ্ছে না। কারণ ভোটারদের সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছে আরও গভীর অসন্তোষ, যা কেবল নৈতিক সতর্কবার্তা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

অবশ্যই ইতিহাসের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণতন্ত্রের ভঙ্গুরতা, প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব এবং উগ্র রাজনীতির ঝুঁকি সম্পর্কে অতীত আমাদের মূল্যবান শিক্ষা দেয়। কিন্তু ইতিহাসকে শিক্ষার উৎস হিসেবে ব্যবহার করা আর রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি সচেতনতা তৈরি করে, দ্বিতীয়টি প্রায়ই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য ইতিহাসের উদাহরণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর রাজনীতি। মানুষকে এমন বিশ্বাস দিতে হবে যে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্ব, বাস্তবসম্মত নীতি এবং জীবনের উন্নতির দৃশ্যমান সম্ভাবনা—এসবই ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। কেবল অতীতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সেই আস্থা তৈরি করা যায় না।

রাজনীতিতে ভয় একটি শক্তিশালী আবেগ, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আশা তার চেয়েও শক্তিশালী। যারা গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে চান, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই: ভোটারদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।