দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্র বা ট্রেজারি বন্ডের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল বিদেশি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় মার্কিন ঋণবাজারকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও এখন তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ঋণবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
ইতিহাসের বিশেষ সম্পর্ক
সত্তরের দশকের তেল সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মধ্যে এমন এক আর্থিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার ফলে তেল আয় থেকে বিপুল অর্থ মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ হতে শুরু করে। পরে এশিয়ার বিভিন্ন দেশও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং নিজেদের মুদ্রার মান রক্ষায় বিপুল পরিমাণ মার্কিন ঋণপত্র কিনতে থাকে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র কম সুদে বিপুল অর্থ ধার করার সুযোগ পায়।
কেন কমছে বিদেশি সরকারের বিনিয়োগ

বর্তমানে ট্রেজারি বাজারে বিদেশি সরকারের অংশীদারিত্ব নেমে এসেছে প্রায় ১৩ শতাংশে, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
প্রথমত, অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আর শুধু ডলারের ওপর নির্ভর করছে না। তারা ইউরো, ইয়েন, পাউন্ড, সুইস ফ্রাঁ ও কানাডিয়ান ডলারের মতো অন্যান্য মুদ্রায়ও রিজার্ভ বৈচিত্র্যময় করছে। ফলে মার্কিন ঋণপত্রে তাদের বিনিয়োগের হার কমছে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঝুঁকিও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আশঙ্কা করছে যে ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় তাদের বিদেশি সম্পদ জব্দ বা সীমাবদ্ধ করা হতে পারে। এই উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর দিকেও ঝুঁকছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাড়ছে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা
বিদেশি সরকারের জায়গা ধীরে ধীরে নিচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে বিদেশি বাণিজ্যিক বিনিয়োগকারীদের হাতে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের মার্কিন ট্রেজারি রয়েছে। তবে তাদের বিনিয়োগের উদ্দেশ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নয়; বরং লাভের সম্ভাবনা।
এ কারণেই এই ধরনের বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি অস্থির। বাজার পরিস্থিতি বদলালে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি বড় পেনশন তহবিল ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা ঋণ এবং মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ তাদের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি সরকারি ক্রেতাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আরও বেশি সুদ দিতে হতে পারে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত নিরাপত্তার কারণে ট্রেজারি কিনলেও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা মূলত মুনাফার হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেয়।
এতে মার্কিন সরকারের ঋণ গ্রহণের খরচ বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে করদাতাদের ওপর। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঋণবাজারে এই পরিবর্তন তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















