ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর একটি। সাধারণত রোগটি ধরা পড়ে অনেক দেরিতে, যখন চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তবে নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ প্রকাশের কয়েক বছর আগেই ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
বহুজাতিক গবেষক দলের সাম্প্রতিক গবেষণায় রক্তের প্লাজমায় থাকা ১৪টি বিশেষ প্রোটিনের একটি স্বাক্ষর বা ‘১৪-প্রোটিন সিগনেচার’ শনাক্ত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার শক্তিশালী পূর্বাভাস দিতে পারে। গবেষকরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ক্যানসার প্রতিরোধ ও আগাম চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
রক্তের প্লাজমায় লুকিয়ে থাকা সংকেত
রক্তের প্লাজমা হলো রক্তের তরল অংশ, যেখানে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যু থেকে আসা হাজারো প্রোটিন থাকে। এসব প্রোটিনের সামগ্রিক চিত্র একজন মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।

গবেষকরা প্রায় ৪৮ হাজার মানুষের প্লাজমা প্রোটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল তৈরি করেন। এতে বয়স, লিঙ্গ, ধূমপানের অভ্যাস এবং ক্যানসার সংক্রান্ত তথ্যও যুক্ত করা হয়। বিশ্লেষণের মাধ্যমে ১৪টি প্রোটিনকে ফুসফুসের ক্যানসারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পাঁচ বছর আগেই ঝুঁকি শনাক্তের সম্ভাবনা
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রায় ১২ হাজার মানুষের তথ্য ব্যবহার করে মডেলটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এদের মধ্যে ৭৫ জন পরবর্তীতে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। মডেলটি ৭৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
গবেষকদের মতে, রোগ নির্ণয়ের গড়ে পাঁচ বছরেরও বেশি আগে এই ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার অনেক আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ধূমপান ও দূষণের সঙ্গে সম্পর্ক
গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান এবং বায়ুদূষণের কারণে শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বাড়লে এই ১৪-প্রোটিন সিগনেচার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
)
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ধূমপানের কারণে কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটে এবং পরে পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে প্রদাহ তৈরি হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও এই প্রোটিন সিগনেচার বেশি দেখা গেছে।
বিদ্যমান ওষুধে নতুন সম্ভাবনা
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত একটি বিদ্যমান ওষুধের সঙ্গে এই সিগনেচারের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে।
একটি পুরোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, যেসব অংশগ্রহণকারীর শরীরে ১৪-প্রোটিন সিগনেচার ছিল এবং যারা ওই ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ কম ছিল।
![]()
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফলাফলকে নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। ওষুধটির কিছু গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে এবং এর ব্যয়ও অত্যন্ত বেশি।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ১৪-প্রোটিন সিগনেচারকে বিভিন্ন জাতিগত ও ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি এমন একটি সহজলভ্য ও নির্ভরযোগ্য রক্ত পরীক্ষা তৈরি করতে হবে, যা দ্রুত এই প্রোটিনগুলো শনাক্ত করতে পারবে।
সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে, ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকা লাখো মানুষ আগেভাগেই শনাক্ত হতে পারেন। ফলে রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার নতুন সুযোগ তৈরি হবে, যা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















