ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর বা ‘পুশ-ইন’ ইস্যুতে আবারও ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ও ভারত। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ, অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ভারত দাবি করেছে, তারা নিজ দেশের আইন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে।
দিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বৈঠক
বিজিবি-বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মূলত ‘পুশ-ইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করেই আলোচনা হয়। পাশাপাশি সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, আহত ও নির্যাতনের ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ও গুরুত্ব পায়।
চার দিনের এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ভারতের পক্ষে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রভীন কুমার তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বুধবার যৌথ আলোচনার নথি চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে এবং সম্মেলন শেষ হবে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে।

‘পুশ-ইন’ নিয়ে দুই দেশের যুক্তি
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া একতরফাভাবে সীমান্ত পার করে পাঠানো মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালার পরিপন্থী। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানায়, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হলে তাকে ফিরিয়ে নিতে আপত্তি নেই, তবে তা অবশ্যই আইনসম্মত ও মানবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।
বাংলাদেশ আরও প্রশ্ন তোলে, কেন অনেক ক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে মানুষকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষ জানায়, অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের অভ্যন্তরীণ আইনের অংশ। তারা দাবি করে, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার আওতায় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এসব ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারত অভিযোগ করে, সন্দেহভাজন অবৈধ নাগরিকদের তালিকা বাংলাদেশকে দেওয়ার পর যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে।
সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। চলতি বছরের মে মাস থেকে আবারও এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ অভিবাসন শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বর্তমান পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
অন্যান্য সীমান্ত ইস্যুও আলোচনায়
বৈঠকে মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান বন্ধ, মানবপাচার প্রতিরোধ, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি অনুমোদনহীন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়।

দুই দেশই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ‘পুশ-ইন’ প্রশ্নে অবস্থানগত পার্থক্য এখনো স্পষ্ট।
দ্রুত সমাধানের আশা
সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক সংকট তৈরি হলেও তিনি দ্রুত সমাধানের আশা করছেন। তার মতে, দুই দেশের বর্তমান সরকার পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে আগ্রহী এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তিনি মনে করেন, সীমান্ত ইস্যু নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব এবং উভয় দেশই সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















