পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। একের পর এক নেতা ও সাংসদের পদত্যাগ, বিধায়ক ও সাংসদদের বিদ্রোহী শিবিরে যোগদান এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা—সব মিলিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
বিদ্রোহী শিবিরের শক্তি বাড়ছে
সংকটের প্রথম বড় ইঙ্গিত আসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়। স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু বিদ্রোহী তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়ককে প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে তিনি দাবি করেন, বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা বেড়ে ৬৪ জনে পৌঁছেছে।
বিদ্রোহীদের অভিযোগ, দলের নেতৃত্ব অত্যন্ত কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে এবং দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে তারা প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাংসদদের মধ্যেও বিভক্তি

সংকট শুধু বিধানসভায় সীমাবদ্ধ নেই। দলের সাংসদদের মধ্যেও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, প্রায় ২০ জন সাংসদের সমর্থন তার সঙ্গে রয়েছে। তারা প্রয়োজনে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।
বিদ্রোহী শিবিরে একাধিক পরিচিত মুখের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সায়নী ঘোষ, মালা রায়, শতাব্দী রায়, ইউসুফ পাঠান, জুন মালিয়া, দেব অধিকারী, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও অনেক সাংসদ।
পদত্যাগের ধাক্কা
রাজ্যসভার সদস্য সুশ্মিতা দেবের পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে সুখেন্দু শেখর রায়ও রাজ্যসভা এবং দলের প্রাথমিক সদস্যপদ ছেড়ে দেন। তিনি সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দলের ফলাফল নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার আরও এক ধাক্কা আসে, যখন রাজ্যসভার সদস্য প্রকাশ চিক বরাইক পদত্যাগ করেন। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না কি নতুন সমীকরণ?
দলের ভেতরের এই অস্থিরতার মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর বৈঠক রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকেই তৃণমূল ও কংগ্রেসের সম্ভাব্য একীভূত হওয়ার জল্পনা শুরু করেন।

তবে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জয়রাম রমেশ স্পষ্ট জানিয়েছেন, দুই নেত্রীর বৈঠক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং সেখানে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলীয় একীভূত হওয়ার কোনও প্রস্তাব বিবেচনায় নেই বলেও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাহুল গান্ধীর বৈঠক রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন কৌতূহল তৈরি করেছে।
নতুন চ্যালেঞ্জে তৃণমূল নেতৃত্ব
সংকটের মধ্যে কলকাতা ও বিধাননগর পুরসভার প্রধান পদ থেকে ফিরহাদ হাকিম এবং কৃষ্ণা চক্রবর্তীর পদত্যাগ দলকে আরও অস্বস্তিতে ফেলেছে। ফিরহাদ হাকিমকে পরবর্তীতে বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানে দেখা গেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এদিকে চাঁদাবাজি মামলায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খানকে ভারত-নেপাল সীমান্তের কাছে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একাধিক তদন্তের মধ্যে এই গ্রেপ্তার দলকে আরও চাপে ফেলেছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরেও বিতর্ক চলছে। নবনির্বাচিত বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট তাকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটিকে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে বিদ্রোহী শিবিরের শক্তি কতটা বাড়ে এবং দলীয় নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















