বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক রাখা এক বিষয়, আর রাষ্ট্রকে পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে ফিরিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভারতের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান সরকারের নীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, বিএনপি-জামায়াত রাজনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে উদ্বেগ
শেখ হাসিনার মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্মৃতি এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার পাশাপাশি পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
তার ভাষ্য, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে আকৃষ্ট করার প্রবণতা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।
![]()
‘নতুন কূটনীতি’ নাকি পরিচয়ের সংকট?
বর্তমান সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও শেখ হাসিনা এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান এখনও ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি কিংবা যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করেনি। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
তার মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রীয় চেতনার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তিনি বলেন, যারা ১৯৭১ সালের ইতিহাসকে উপেক্ষা করেন, তারা বাংলাদেশের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করেন।
বিএনপি ও জামায়াত নিয়ে মন্তব্য
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি কি জামায়াতবিরোধী ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে? জবাবে তিনি দাবি করেন, বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, অতীতে বিএনপির মাধ্যমেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়েছে। মুখে নীতি-আদর্শের পার্থক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে উভয় দল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক ধারার অংশ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ সময় তিনি দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, মাজার ও দরগায় হামলার অভিযোগ এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ওপর চাপের বিষয়ও তুলে ধরেন। তার দাবি, বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও নিজের অবস্থান
ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত যে কোনো সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে, সেটিই স্বাভাবিক।
তিনি স্পষ্ট করেন, তার রাজনৈতিক অবস্থান কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনই তার মূল শক্তি। একই সঙ্গে তিনি ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করলেও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কখনও আপস করা হয়নি।
টেকসই সম্পর্কের শর্ত

শেখ হাসিনার মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি দাবি করেন, এসব বিষয়ে ব্যর্থতা থাকলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সম্পর্কের যে অধ্যায় শুরু করার চেষ্টা চলছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বিএনপি সরকারের ভারতনীতি সম্পর্কেও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন এবং বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারতবিরোধী প্রচারণাকে উৎসাহ দেওয়া হলে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্যে আবারও সামনে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় পরিচয় এবং আঞ্চলিক কূটনীতির প্রশ্ন। তার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















