০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার ব্রিটিশ ব্যবসার নীরবতা: রাজনীতিতে কথা না বলার খেসারত দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা মোগাদিশুতে ফিরছে স্বস্তি, তবে শান্তির আড়ালে রয়ে গেছে বড় শঙ্কা জাম্বিয়ার তামার সমৃদ্ধি, কিন্তু মানুষের ঘরে স্বস্তি কোথায়? মক্কা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোটে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ২৬৫ মৃত্যু, উদ্ধার তৎপরতায় বৈষম্যের অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ইসলামের পতন, তবু শেষ হয়ে যায়নি মুসলিম ব্রাদারহুড ইউরোপকে এক করার অদৃশ্য কারিগর কারা? লেবার ও ব্যবসা: অ্যান্ডি বার্নহামের সামনে সম্পর্ক মেরামতের নতুন সুযোগ শান্তির কথা বলাই এখন রাশিয়ায় অপরাধ, নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ উদারপন্থী ইয়াব্লোকো

নতুন ভূরাজনীতির সন্ধিক্ষণে: কোয়াডের দুর্বলতা কি চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে?

বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতীক ও ভাষার গুরুত্ব অনেক সময় সামরিক জোট বা অর্থনৈতিক চুক্তির চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের মধ্যে যে তুলনামূলক উষ্ণতা দেখা গেছে, তার প্রভাব কেবল দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত কাঠামোকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সরকারি ভাষ্যে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের নীতিগত রূপান্তরের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। একসময় বহুল ব্যবহৃত “ইন্দো-প্যাসিফিক” ধারণার বদলে “প্যাসিফিক” শব্দের প্রতি বাড়তি ঝোঁক কেবল শব্দচয়নের পরিবর্তন নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন চিন্তা।

ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার উত্থান

গত এক দশকে “ইন্দো-প্যাসিফিক” ছিল এশিয়ার কৌশলগত আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একক ভূরাজনৈতিক পরিসরে যুক্ত করা এবং সেই কাঠামোর মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মোকাবিলা করা।

Quad: a cornerstone of the 'Indo-Pacific Strategy,' or merely a 'platform  for diplomacy'? - Global Times

এই ধারণাকে সবচেয়ে জোরালোভাবে এগিয়ে নিয়েছিল জাপান। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময়ে টোকিও এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যেখানে গণতান্ত্রিক ও মার্কিনপন্থী শক্তিগুলো একত্র হয়ে চীনের উত্থানকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে। সেই চিন্তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল কোয়াড—যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার চার দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা।

কিন্তু যে বাস্তবতা থেকে এই ধারণার জন্ম, আজ সেই বাস্তবতাই বদলাতে শুরু করেছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর একটি বড় অংশ আর নতুন শীতল যুদ্ধের অংশ হতে আগ্রহী নয়। তারা নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইলেও সরাসরি পক্ষ বেছে নেওয়ার রাজনীতিতে নিজেদের জড়াতে অনিচ্ছুক।

কোয়াডের সীমাবদ্ধতা

কোয়াডকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে জোটটি এখনও তার ঘোষিত ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব অগ্রাধিকার ও স্বার্থ প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জাপান নিরাপত্তা উদ্বেগে সক্রিয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করতে পারে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও প্রশাসনভেদে পরিবর্তিত হয়।

ফলে কোয়াড প্রায়ই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণার বাইরে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখায়। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সরবরাহ শৃঙ্খল বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা ঘোষিত হলেও সেগুলোর অনেকটাই বাস্তব ফলাফলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় নেয়।

US-China head-to-head: Explained in 11 maps and charts | Interactive News |  Al Jazeera

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—কোয়াড কি সত্যিই আঞ্চলিক কৌশলগত স্থাপত্যের কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি এটি এখনো মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম?

চীনের সামনে নতুন সম্ভাবনা

যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সংঘাতের পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানের দিকে এগোয়, তাহলে বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা এমন একটি আঞ্চলিক পরিবেশ চায় যেখানে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ না নেয়।

চীনের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই সুযোগকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো। কেবল অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন যথেষ্ট নয়; প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জন, আঞ্চলিক উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো এবং সহযোগিতামূলক নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রদর্শনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বেইজিং নিজেকে সংঘাতের উৎস নয়, বরং স্থিতিশীলতার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে কোয়াডের তুলনামূলক দুর্বলতা থেকে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সুবিধা তার হাতেই যেতে পারে।

এশিয়ার ভবিষ্যৎ সম্ভবত এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে যেখানে দেশগুলোকে আর বাধ্যতামূলকভাবে দুই শিবিরের একটিতে অবস্থান নিতে হবে না। সেই নতুন ভারসাম্যের রাজনীতিতে যে শক্তি সহযোগিতা, আস্থা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াইয়ে তারাই এগিয়ে থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগরে ১৬ ঘণ্টা ভেসে থাকার পর বাবা ও দুই ছেলেকে জীবিত উদ্ধার

নতুন ভূরাজনীতির সন্ধিক্ষণে: কোয়াডের দুর্বলতা কি চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে?

০৩:৩৬:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতীক ও ভাষার গুরুত্ব অনেক সময় সামরিক জোট বা অর্থনৈতিক চুক্তির চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের মধ্যে যে তুলনামূলক উষ্ণতা দেখা গেছে, তার প্রভাব কেবল দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত কাঠামোকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের কিছু ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সরকারি ভাষ্যে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যতের নীতিগত রূপান্তরের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করে। একসময় বহুল ব্যবহৃত “ইন্দো-প্যাসিফিক” ধারণার বদলে “প্যাসিফিক” শব্দের প্রতি বাড়তি ঝোঁক কেবল শব্দচয়নের পরিবর্তন নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন চিন্তা।

ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার উত্থান

গত এক দশকে “ইন্দো-প্যাসিফিক” ছিল এশিয়ার কৌশলগত আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা। এর মূল লক্ষ্য ছিল ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে একক ভূরাজনৈতিক পরিসরে যুক্ত করা এবং সেই কাঠামোর মধ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মোকাবিলা করা।

Quad: a cornerstone of the 'Indo-Pacific Strategy,' or merely a 'platform  for diplomacy'? - Global Times

এই ধারণাকে সবচেয়ে জোরালোভাবে এগিয়ে নিয়েছিল জাপান। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময়ে টোকিও এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তুলতে চেয়েছিল, যেখানে গণতান্ত্রিক ও মার্কিনপন্থী শক্তিগুলো একত্র হয়ে চীনের উত্থানকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে। সেই চিন্তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল কোয়াড—যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার চার দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা।

কিন্তু যে বাস্তবতা থেকে এই ধারণার জন্ম, আজ সেই বাস্তবতাই বদলাতে শুরু করেছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর একটি বড় অংশ আর নতুন শীতল যুদ্ধের অংশ হতে আগ্রহী নয়। তারা নিরাপত্তা সহযোগিতা চাইলেও সরাসরি পক্ষ বেছে নেওয়ার রাজনীতিতে নিজেদের জড়াতে অনিচ্ছুক।

কোয়াডের সীমাবদ্ধতা

কোয়াডকে ঘিরে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে জোটটি এখনও তার ঘোষিত ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব অগ্রাধিকার ও স্বার্থ প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। অস্ট্রেলিয়া অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জাপান নিরাপত্তা উদ্বেগে সক্রিয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করতে পারে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও প্রশাসনভেদে পরিবর্তিত হয়।

ফলে কোয়াড প্রায়ই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ঘোষণার বাইরে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখায়। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সরবরাহ শৃঙ্খল বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনা ঘোষিত হলেও সেগুলোর অনেকটাই বাস্তব ফলাফলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় নেয়।

US-China head-to-head: Explained in 11 maps and charts | Interactive News |  Al Jazeera

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—কোয়াড কি সত্যিই আঞ্চলিক কৌশলগত স্থাপত্যের কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি এটি এখনো মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম?

চীনের সামনে নতুন সম্ভাবনা

যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সংঘাতের পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানের দিকে এগোয়, তাহলে বেইজিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশ স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। তারা এমন একটি আঞ্চলিক পরিবেশ চায় যেখানে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ না নেয়।

চীনের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই সুযোগকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো। কেবল অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন যথেষ্ট নয়; প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জন, আঞ্চলিক উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো এবং সহযোগিতামূলক নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রদর্শনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যদি বেইজিং নিজেকে সংঘাতের উৎস নয়, বরং স্থিতিশীলতার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে কোয়াডের তুলনামূলক দুর্বলতা থেকে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সুবিধা তার হাতেই যেতে পারে।

এশিয়ার ভবিষ্যৎ সম্ভবত এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে যেখানে দেশগুলোকে আর বাধ্যতামূলকভাবে দুই শিবিরের একটিতে অবস্থান নিতে হবে না। সেই নতুন ভারসাম্যের রাজনীতিতে যে শক্তি সহযোগিতা, আস্থা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ দিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াইয়ে তারাই এগিয়ে থাকবে।