০৫:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
তৃণমূলে বিদ্রোহের মুখগুলো কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা বাংলাদেশের একাদশে সৌম্য, টসে জিতে আগে ব্যাটিংয়ে অস্ট্রেলিয়া নিয়ন্ত্রণ বনাম নিয়ন্ত্রণমুক্তি নয়, দরকার বুদ্ধিমান রাষ্ট্রব্যবস্থা নতুন ভূরাজনীতির সন্ধিক্ষণে: কোয়াডের দুর্বলতা কি চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে? ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সমীকরণের খোঁজে ঢাকা উড়ে যাচ্ছেন ত্রিবেদী তিন দেশে তিন উদ্বোধন, বিশ্বকাপ মাতাতে ফিরছেন শাকিরা ইন্দোনেশিয়ার ডে-কেয়ারে শিশু নির্যাতনের অভিযোগে তোলপাড়, গ্রেপ্তার ১৩ জর্ডানের আকাশে ফের ইরানের ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র  তেলবাজারে নতুন অস্থিরতা: ইরানে মার্কিন হামলার পর ব্যারেলপ্রতি দাম ৯৫ ডলারের কাছাকাছি নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, একই পরিবারের চারজনসহ দগ্ধ ৫

নিয়ন্ত্রণ বনাম নিয়ন্ত্রণমুক্তি নয়, দরকার বুদ্ধিমান রাষ্ট্রব্যবস্থা

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক চলে আসছে—বাজারকে কতটা স্বাধীন রাখা হবে, আর কতটা নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, এই বিতর্ককে সাদা-কালোভাবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতির প্রকৃতি, বাজারের কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কখনও কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কখনও আবার নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত না রাষ্ট্র বেশি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি কম করবে; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্র কীভাবে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ ও ফলপ্রসূভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। একদিকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যবসাগুলোকে নানা ধরনের অনুমোদন, জটিল বিধি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার জালে আটকে রাখা হয়। অন্যদিকে জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা বা পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োগ দুর্বল। ফলে অবৈধ চিকিৎসক, নিম্নমানের ওষুধ, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ কিংবা নানা ধরনের অনিয়ম প্রায়শই শাস্তি এড়িয়ে যায়।

এই বৈপরীত্যের একটি বড় অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। যখন বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে ওঠে, তখন অনেক উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরে থাকতে উৎসাহিত হন। ফলাফল হলো একটি বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট অবস্থায় আটকে থাকে এবং উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও কর আদায়ের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল প্রয়োগ একসঙ্গে মিলে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

The new left economics: how a network of thinkers is transforming  capitalism | Economic policy | The Guardian

নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই অস্বীকার করা যায় না। একটি মিশ্র অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা এবং বাজার ব্যর্থতা মোকাবিলার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য। কিন্তু সেই কাঠামোকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে নীতিনির্ধারণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি কাজকে আলাদা রাখতে হয়।

দুই দশকেরও বেশি আগে পাকিস্তান এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সংস্কারের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল। লক্ষ্য ছিল মন্ত্রণালয়গুলোকে নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ রাখা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত করা এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেওয়া। এর পেছনের যুক্তি ছিল সহজ। যদি একই প্রতিষ্ঠান একদিকে বাজারের নিয়ম নির্ধারণ করে এবং অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়, তাহলে নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা সম্ভব নয়।

কিন্তু কাগজে-কলমে সংস্কার আর বাস্তবায়নের মধ্যে প্রায়ই বড় ব্যবধান থেকে যায়। পাকিস্তানের জ্বালানি খাত তার একটি উদাহরণ। এখানে বিশেষায়িত নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য, সেবার নিম্নমান এবং বিপুল আর্থিক অদক্ষতা এখনও বিদ্যমান। এর একটি কারণ হলো, প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক অংশ কখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রকদের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও হস্তক্ষেপ অব্যাহত থেকেছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আনুগত্য বা প্রশাসনিক সুবিধা গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনীতি, প্রকৌশল, অর্থায়ন, আইন কিংবা বাজার বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

নিয়ন্ত্রকদের কাজ কী হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও নতুন করে ভাবতে হবে। একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল ভূমিকা হওয়া উচিত বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, ভোক্তাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু যখন একই সংস্থা নীতিনির্ধারণ, মূল্য নির্ধারণ এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে পড়ে, তখন জবাবদিহি দুর্বল হয়ে যায় এবং দায়িত্বের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের কাঠামো আধুনিক করা জরুরি | অর্থনীতি | Citizens Voice

বিশেষত জ্বালানি খাতে মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নটি নতুনভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে উঠলে ধীরে ধীরে মূল্য নির্ধারণের দায় বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। নিয়ন্ত্রকের কাজ হবে বাজারকে স্বচ্ছ রাখা, কারসাজি প্রতিরোধ করা এবং কোনো প্রতিষ্ঠান যেন প্রভাব খাটিয়ে প্রতিযোগিতা নষ্ট করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল বিধিনিষেধ আরোপ নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বিনিয়োগ বাড়বে, সেবা উন্নত হবে এবং বাজার আরও কার্যকর হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বেসরকারিকরণ যদি কেবল সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা, সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা।

Pakistan unable to pay its embassy staff, shows dire economic condition:  Report

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সেখানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বের চেয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত নীতিগত তদারকি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা পেশাদার নির্বাহীদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ। নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশিক্ষণ যদি মেধাভিত্তিক না হয়, তাহলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও জ্ঞানের বিকাশ অপরিহার্য।

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ আর নিয়ন্ত্রণমুক্তির মধ্যে বেছে নেওয়া নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে নিয়মগুলো নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে, প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হবে এবং বাজারে আস্থা তৈরি হবে। শক্তিশালী, স্বাধীন এবং পেশাদার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভোক্তা সুরক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণকে বাধা নয়, বরং সক্ষমতার একটি হাতিয়ারে পরিণত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।

জনপ্রিয় সংবাদ

তৃণমূলে বিদ্রোহের মুখগুলো কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা

নিয়ন্ত্রণ বনাম নিয়ন্ত্রণমুক্তি নয়, দরকার বুদ্ধিমান রাষ্ট্রব্যবস্থা

০৩:৪১:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক চলে আসছে—বাজারকে কতটা স্বাধীন রাখা হবে, আর কতটা নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, এই বিতর্ককে সাদা-কালোভাবে দেখার সুযোগ নেই। অর্থনীতির প্রকৃতি, বাজারের কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে কখনও কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কখনও আবার নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত না রাষ্ট্র বেশি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি কম করবে; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্র কীভাবে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ ও ফলপ্রসূভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। একদিকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যবসাগুলোকে নানা ধরনের অনুমোদন, জটিল বিধি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার জালে আটকে রাখা হয়। অন্যদিকে জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা বা পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োগ দুর্বল। ফলে অবৈধ চিকিৎসক, নিম্নমানের ওষুধ, ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ কিংবা নানা ধরনের অনিয়ম প্রায়শই শাস্তি এড়িয়ে যায়।

এই বৈপরীত্যের একটি বড় অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। যখন বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে ওঠে, তখন অনেক উদ্যোক্তা আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরে থাকতে উৎসাহিত হন। ফলাফল হলো একটি বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট অবস্থায় আটকে থাকে এবং উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও কর আদায়ের সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্বল প্রয়োগ একসঙ্গে মিলে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

The new left economics: how a network of thinkers is transforming  capitalism | Economic policy | The Guardian

নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই অস্বীকার করা যায় না। একটি মিশ্র অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করা এবং বাজার ব্যর্থতা মোকাবিলার জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো অপরিহার্য। কিন্তু সেই কাঠামোকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে নীতিনির্ধারণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি কাজকে আলাদা রাখতে হয়।

দুই দশকেরও বেশি আগে পাকিস্তান এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সংস্কারের পথে হাঁটতে শুরু করেছিল। লক্ষ্য ছিল মন্ত্রণালয়গুলোকে নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ রাখা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত করা এবং স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেওয়া। এর পেছনের যুক্তি ছিল সহজ। যদি একই প্রতিষ্ঠান একদিকে বাজারের নিয়ম নির্ধারণ করে এবং অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়, তাহলে নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা সম্ভব নয়।

কিন্তু কাগজে-কলমে সংস্কার আর বাস্তবায়নের মধ্যে প্রায়ই বড় ব্যবধান থেকে যায়। পাকিস্তানের জ্বালানি খাত তার একটি উদাহরণ। এখানে বিশেষায়িত নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলেও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য, সেবার নিম্নমান এবং বিপুল আর্থিক অদক্ষতা এখনও বিদ্যমান। এর একটি কারণ হলো, প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক অংশ কখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রকদের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ও হস্তক্ষেপ অব্যাহত থেকেছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার পরিবর্তে অনেক সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আনুগত্য বা প্রশাসনিক সুবিধা গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনীতি, প্রকৌশল, অর্থায়ন, আইন কিংবা বাজার বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞদের পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

নিয়ন্ত্রকদের কাজ কী হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও নতুন করে ভাবতে হবে। একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল ভূমিকা হওয়া উচিত বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, ভোক্তাকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু যখন একই সংস্থা নীতিনির্ধারণ, মূল্য নির্ধারণ এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় জড়িয়ে পড়ে, তখন জবাবদিহি দুর্বল হয়ে যায় এবং দায়িত্বের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের কাঠামো আধুনিক করা জরুরি | অর্থনীতি | Citizens Voice

বিশেষত জ্বালানি খাতে মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নটি নতুনভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে উঠলে ধীরে ধীরে মূল্য নির্ধারণের দায় বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। নিয়ন্ত্রকের কাজ হবে বাজারকে স্বচ্ছ রাখা, কারসাজি প্রতিরোধ করা এবং কোনো প্রতিষ্ঠান যেন প্রভাব খাটিয়ে প্রতিযোগিতা নষ্ট করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল বিধিনিষেধ আরোপ নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে বিনিয়োগ বাড়বে, সেবা উন্নত হবে এবং বাজার আরও কার্যকর হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বেসরকারিকরণ যদি কেবল সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা, সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা।

Pakistan unable to pay its embassy staff, shows dire economic condition:  Report

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সেখানে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বের চেয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বোর্ডের কাজ হওয়া উচিত নীতিগত তদারকি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা পেশাদার নির্বাহীদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ। নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশিক্ষণ যদি মেধাভিত্তিক না হয়, তাহলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা ও জ্ঞানের বিকাশ অপরিহার্য।

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ আর নিয়ন্ত্রণমুক্তির মধ্যে বেছে নেওয়া নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে নিয়মগুলো নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হবে, প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হবে এবং বাজারে আস্থা তৈরি হবে। শক্তিশালী, স্বাধীন এবং পেশাদার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ভোক্তা সুরক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণকে বাধা নয়, বরং সক্ষমতার একটি হাতিয়ারে পরিণত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।