বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। একসময় যাকে বিদেশি খেলা বলে উপহাস করা হতো, সেই ফুটবলই আজ দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ। যৌথ আয়োজক হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ মঞ্চের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের সংগ্রাম, সাফল্য ও পরিবর্তনের গল্প।
বিস্ময়কর এক জয়, তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা
১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফুটবলের জন্মদাতা দেশের বিপক্ষে সেই জয় তখন অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। হাইতিতে জন্ম নেওয়া জো গেটজেন্সের করা গোল যুক্তরাষ্ট্রকে এনে দেয় ঐতিহাসিক বিজয়।
তবে সেই সাফল্যের পর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। পরবর্তী ৪০ বছর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে দেশটিকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে।
পেশাদার লিগ গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ
১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর সঙ্গে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত—দেশটিকে একটি স্থায়ী পেশাদার ফুটবল লিগ গড়ে তুলতে হবে।
এই লক্ষ্য থেকেই জন্ম নেয় মেজর লিগ সকার। শুরুতে মাত্র ১০টি দল নিয়ে যাত্রা শুরু করা লিগটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি দেশের ফুটবল কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং খেলাটিকে নতুন গতি দেয়।
নারীদের বিশ্বকাপ বদলে দেয় চিত্র
১৯৯৯ সালের নারী বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। ফাইনালে নাটকীয় জয়ের পর ব্র্যান্ডি চ্যাস্টেইনের উদযাপন দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তে পরিণত হয়।
এই সাফল্য শুধু নারীদের ফুটবলকে জনপ্রিয় করেনি, বরং পুরো দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকেও শক্তিশালী করেছে।
ডেভিড বেকহ্যামের আগমনে নতুন যুগ
দুই হাজার ছয়ের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটে। বিশ্বখ্যাত তারকা ডেভিড বেকহ্যামকে দলে ভেড়ানোর সিদ্ধান্ত ছিল সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লস অ্যাঞ্জেলেসে তার আগমন ফুটবলের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের নজরও পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। এরপর আরও অনেক আন্তর্জাতিক তারকা দেশটির লিগে যোগ দিতে শুরু করেন।
এই সময়ে লিগের সম্প্রসারণও দ্রুত হয়। অল্প কয়েকটি দল থেকে বেড়ে আজ লিগটিতে ৩০টি দল অংশ নিচ্ছে এবং প্রতি ম্যাচে হাজার হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত থাকছেন।
বিশ্বকাপে নতুন আত্মবিশ্বাস
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক খেলোয়াড় ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ পেতে শুরু করেন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ফুটবল মর্যাদা বাড়ে।
২০১০ বিশ্বকাপে ল্যান্ডন ডোনোভানের শেষ মুহূর্তের গোল যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্ত দেশটির সমর্থকদের বিশ্বকাপের আবেগ নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ দেয়।
ইউরোপীয় ফুটবলের প্রভাব
দেশীয় লিগের পাশাপাশি ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সম্প্রচারও যুক্তরাষ্ট্রে খেলাটির জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সরাসরি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাওয়ায় নতুন প্রজন্মের দর্শক ফুটবলের প্রতি আরও আকৃষ্ট হয়।
ফলে বিশ্বকাপের চার বছরের অপেক্ষার বাইরেও সারা বছর ফুটবল নিয়ে আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

মেসির আগমনে নতুন উচ্চতা
ডেভিড বেকহ্যাম খেলোয়াড় হিসেবে যেমন প্রভাব ফেলেছিলেন, তেমনি ক্লাব মালিক হিসেবেও ফুটবলে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। তার ক্লাবে যোগ দেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা লিওনেল মেসি।
মেসির আগমন শুধু একটি ক্লাবের নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল অঙ্গনের জন্য বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। টিকিটের চাহিদা বেড়ে যায়, দর্শকসংখ্যা বাড়ে এবং দেশটির ফুটবল বিশ্বব্যাপী আরও বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
অবহেলা থেকে স্বীকৃতির পথে
একসময় যে খেলাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রান্তিক বলে মনে করা হতো, আজ সেটি দেশের ক্রীড়া পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শক্তিশালী দেশীয় লিগ, আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় এবং ক্রমবর্ধমান সমর্থকগোষ্ঠী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
বিশ্বকাপের বিশাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশটির ফুটবল যাত্রা প্রমাণ করছে, দীর্ঘদিনের ধৈর্য, বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত একটি খেলার ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















