ইংল্যান্ডে এপ্রিল ও মে বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। দীর্ঘ শীতের পর প্রকৃতি নতুন রঙে সেজে ওঠে। কিন্তু এই সময়টিই আমার কাছে আরেকটি স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে—২০২১ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলো, যখন কোভিড-১৯ ভারতে অসংখ্য পরিবারকে শোকের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়েছিল। প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রিয়জনকে হারিয়েছিল। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
পাঁচ বছর পর পৃথিবী আবার সংক্রামক রোগের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে মধ্য আফ্রিকায় ইবোলার পুনরুত্থান, অন্যদিকে একটি আন্তর্জাতিক জাহাজে হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা। দুটি প্রাদুর্ভাবের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হলেও এগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: কোভিডের পর বিশ্ব আসলে কতটা প্রস্তুত?
প্রস্তুতির প্রথম স্তম্ভ হলো রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ইবোলার ক্ষেত্রে বিশ্ব তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে, কারণ এই রোগ নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধমূলক কাঠামো তৈরি হয়েছে। কিন্তু হান্টাভাইরাসের ঘটনায় দেখা গেছে, অপ্রত্যাশিত ও বিরল সংক্রমণের ক্ষেত্রে সেই প্রস্তুতি অনেকটাই সীমিত। বিশেষ করে এমন পরিবেশে, যেখানে রোগের উপসর্গ শুরুতে সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার মতো মনে হয় এবং সংক্রমণের প্রেক্ষাপটও অস্বাভাবিক।
একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার দ্বিতীয় শর্ত হলো চিকিৎসা সক্ষমতা। হাসপাতাল, সুরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নিবিড় পরিচর্যা সুবিধা এবং সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হয়। ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বহু বছরের অভিজ্ঞতা এবং বিনিয়োগের সুফল দেখা গেছে। কিন্তু হান্টাভাইরাস দেখিয়েছে, অচেনা কোনো রোগ হঠাৎ দেখা দিলে সামনের সারির প্রস্তুতি কত দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তবে কেবল চিকিৎসা অবকাঠামো থাকলেই যথেষ্ট নয়। জনগণের আস্থা অর্জন এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইবোলা নিয়ে দীর্ঘদিনের জনসচেতনতা প্রচারের কারণে ঝুঁকি যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। কিন্তু নতুন কোনো রোগ দেখা দিলে অনিশ্চয়তা দ্রুত বিভ্রান্তি তৈরি করে। হান্টাভাইরাসের ক্ষেত্রেও সেই চিত্র দেখা গেছে। একই সঙ্গে ইবোলার মতো পরিচিত রোগেও ভুল তথ্য এবং গুজব পুরোপুরি দূর করা যায়নি। ফলে স্পষ্ট যে জনবিশ্বাস গড়ে তোলা এককালীন কাজ নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

মহামারির বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধের আরেকটি বড় উপাদান হলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ইবোলা নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত রোগগুলোর ক্ষেত্রে গবেষণা অবকাঠামো দুর্বল। ফলে নতুন প্রাদুর্ভাব ঘটলে বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে পরিচিত রোগের ক্ষেত্রেও সব সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, এমন নয়। সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি, জীবাণুনাশক সরবরাহের সমস্যা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণব্যবস্থা এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী সংক্রমণ নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, যা প্রচলিত প্রস্তুতি কাঠামোর বাইরে।
হান্টাভাইরাসের অভিজ্ঞতা আমাদের আরেকটি বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীতে এমন অসংখ্য প্রাণীজ উৎসের রোগজীবাণু রয়েছে, যেগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলা করতে হয় সাধারণ সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। অথচ একটি রোগ নিয়ন্ত্রণের সাফল্য কোনো একক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। নজরদারি, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রশাসন এবং জনসংযোগ—সবকিছুকে একই সঙ্গে কার্যকর হতে হয়।
কোভিডের পর বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বেড়েছিল। কিন্তু সেই অর্থায়নের বড় অংশ ছিল জরুরি পরিস্থিতিকেন্দ্রিক, স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়নি। ২০২৪-২৫ সালের পর থেকে অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বাস্থ্যনিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমাতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও দুর্বল হয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি জানি, উন্নত প্রযুক্তি হাতে পেয়েছি এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু সেই সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক ও আর্থিক অঙ্গীকার দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিচিত সংকটের জন্য আমাদের প্রস্তুতি আগের চেয়ে গভীর হয়েছে, কিন্তু অজানা সংকটের জন্য তা এখনও যথেষ্ট বিস্তৃত নয়।
মহামারির ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একই হারে বাড়েনি। এই বৈপরীত্যই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিপদ। কারণ পরবর্তী সংক্রমণ হয়তো এমন কোনো রোগজীবাণু থেকে আসবে, যার জন্য আজ আমাদের কোনো বিশেষ প্রস্তুতি নেই। তখন কেবল অতীতের অভিজ্ঞতা নয়, প্রস্তুতির বিস্তৃত পরিধিই নির্ধারণ করবে বিশ্ব কতটা সফলভাবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।
শাহিদ জামিল 



















