বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার আগে উদ্বেগ যেন এক ধরনের ঐতিহ্য। প্রতি চার বছর পরপর একই দৃশ্য ফিরে আসে—আয়োজকদের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন, নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা, টিকিটের দাম নিয়ে ক্ষোভ, রাজনৈতিক বিতর্ক, মানবাধিকার ইস্যু কিংবা আয়োজক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা। যেন খেলা শুরুর আগেই বিশ্বকাপকে ঘিরে একটি আলাদা নাটক তৈরি হয়।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনটি দেশের যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়া এই আসরকে ঘিরেও নানা বিতর্ক সামনে এসেছে। সীমান্ত ও অভিবাসন নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কিছু সমর্থক টিকিটসংক্রান্ত সমস্যায় পড়েছেন, বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে, আর অনেক স্টেডিয়ামে দর্শকদের জন্য ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা চলছে। গরম আবহাওয়া ও আর্দ্রতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব ঘটনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। বরং বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, বড় এই টুর্নামেন্টের আগে এমন অস্থিরতা প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
তবু একটি বিষয় বারবার প্রমাণিত হয়েছে—খেলা শুরু হলে অধিকাংশ বিতর্ক দ্রুত পেছনে চলে যায়। প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকে বিশ্বের মনোযোগ চলে যায় মাঠের লড়াইয়ে। তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে গোল, কৌশল, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, অপ্রত্যাশিত জয় এবং নতুন নায়কদের উত্থান।
এটাই বিশ্বকাপের বিশেষ শক্তি। পৃথিবীর আর খুব কম অনুষ্ঠান আছে যা ভাষা, ধর্ম, জাতীয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে এত মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে। ফুটবল হয়তো একটি খেলা, কিন্তু বিশ্বকাপ তার চেয়ে অনেক বড় একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এটি এমন একটি মঞ্চ যেখানে ছোট দেশ বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যেখানে অপরিচিত খেলোয়াড় মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক পরিচিতি পেয়ে যায়, এবং যেখানে কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই ঘটনার সাক্ষী হয়।

অনেকে যুক্তি দেন, বিশ্বকাপের উন্মাদনা বাস্তব বিশ্বের গুরুতর সমস্যাগুলো থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ে ফুটবলকে গুরুত্ব দেওয়া তাদের কাছে বিলাসিতা মনে হতে পারে। যুক্তিটা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। তবে অন্য দিকটিও বিবেচনা করা দরকার।
দ্য টাইমস ভিউ-এর মূল যুক্তি হলো, বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি এমন এক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা যা বৈচিত্র্য ও ঐক্যকে একই সঙ্গে তুলে ধরে। প্রতিযোগিতা থাকে, কিন্তু তা নিয়মের ভেতরে। আবেগ থাকে, কিন্তু তা একটি যৌথ সাংস্কৃতিক মুহূর্তে রূপ নেয়। আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে এমন অভিজ্ঞতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
মানুষ কেবল সংকটের মধ্যেই বাঁচে না; মানুষ আশা, আনন্দ ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও বেঁচে থাকে। বিশ্বকাপ সেই বিরল উপলক্ষগুলোর একটি, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে সংঘাতের বদলে প্রতিযোগিতা এবং শত্রুতার বদলে ক্রীড়াসুলভ সম্মান সামনে আসে।
সামনের কয়েক সপ্তাহে বিশ্বকাপ আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে প্রতিযোগিতা ও ঐক্য পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং কখনও কখনও একটি ফুটবল ম্যাচই দেখিয়ে দিতে পারে, বৈচিত্র্যের মধ্যেও কীভাবে একটি সাধারণ মানবিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
এই কারণেই সব বিতর্ক, সমালোচনা এবং অনিশ্চয়তার পরও বিশ্বকাপ তার আকর্ষণ হারায় না। পৃথিবী যতই জটিল হয়ে উঠুক, এই টুর্নামেন্ট এখনও এমন এক বিরল আয়োজন, যা মানুষকে একই সঙ্গে ভাবায়, উত্তেজিত করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—একত্রিত করে।
দ্য টাইমস ভিউ-এর সম্পাদকীয় 



















