যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন সমঝোতার ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু হওয়ার পথে। তবে এই ঘোষণার পরও তেলবাহী জাহাজের মালিক, ব্যবসায়ী এবং জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। নিরাপত্তা, মাইন অপসারণ এবং নতুন নিয়ম-কানুন নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় অনেকেই অপেক্ষার কৌশল বেছে নিয়েছেন।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। কয়েক মাসের সংঘাতের কারণে এই পথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এখন নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চললেও বাস্তবে পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
অনিশ্চয়তার মাঝেও ইতিবাচক সংকেত
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে ৬০ দিনের জন্য জাহাজ চলাচলে কোনো টোল বা ফি না নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং আন্তর্জাতিক তেলের দামও কমেছে।
তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। সমুদ্রপথে পাতা মাইন অপসারণ, নিরাপদ রুট নির্ধারণ এবং জাহাজ চলাচলের স্পষ্ট নির্দেশনা এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। অনেক জাহাজ মালিক জানতে চাইছেন, প্রণালি ব্যবহার করতে হলে তাদের কার কাছে রিপোর্ট করতে হবে এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে।

জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক নয়
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু তেলবাহী জাহাজ রাতের অন্ধকারে প্রণালি পার হয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় জাহাজ চলাচল এখনো অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চুক্তি হলেই পরিস্থিতি রাতারাতি স্বাভাবিক হবে না। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা শত শত জাহাজকে আবার চলাচলে ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। অনেক কোম্পানি এখনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
বিশ্বের বড় বড় শিপিং প্রতিষ্ঠানও জানিয়েছে, তারা চুক্তির বিস্তারিত শর্ত, বীমা ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু করবে না।
আটকে আছে শত শত জাহাজ
সংঘাতের শুরু থেকে পারস্য উপসাগরে বিপুলসংখ্যক জাহাজ আটকে রয়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, প্রায় ৩০০ তেলবাহী জাহাজ মাল বোঝাই অবস্থায় প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। একই সংখ্যক খালি জাহাজ উপসাগরের বাইরে অবস্থান করছে, যাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তারা আবার রপ্তানি টার্মিনালে ফিরে যেতে পারে।
এছাড়া আরও শত শত জাহাজ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো দ্রুত তেল পরিবহনে যুক্ত হতে পারে। ফলে প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

নতুন নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তি-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়। ৬০ দিনের বিনামূল্যের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নিরাপত্তা, নৌচলাচল ও বীমা সেবার জন্য ফি আরোপ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কিছু দেশ ও কোম্পানি জানতে চাইছে, তারা কাদের সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং নতুন নিয়ম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না। এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না আসা পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান সতর্ক অবস্থানেই থাকবে।
নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতীতেও কয়েকবার ইতিবাচক সংকেত দেখা গেলেও পরে জাহাজে হামলা বা জব্দ করার ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল শুরু হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই নিরাপত্তা, সমন্বয় এবং আস্থার পরিবেশ তৈরি না হলে যুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















