জাপানে ভালুকের উপদ্রব ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শুধু পাহাড়ি বনাঞ্চল নয়, এখন শহর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও দেখা মিলছে এসব বন্য প্রাণীর। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালুক ধীরে ধীরে মানুষের প্রতি তাদের স্বাভাবিক ভয় হারিয়ে ফেলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গত বছর জাপানে ভালুক দেখার ঘটনা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছায়। একই সঙ্গে প্রাণ হারান ১৩ জন, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চলতি বছরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু পর্যন্ত ভালুকের হামলায় ইতোমধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
শহরমুখী ভালুকের নতুন প্রবণতা
সম্প্রতি তোচিগি প্রিফেকচারের উতসুনোমিয়া শহরে একটি ভালুক তিন দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল ও বিপণিবিতান এলাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস বাতিল করতে বাধ্য হয়। পরে প্রাণীটিকে আটক করা হয়।

এরও এক সপ্তাহ আগে ফুকুশিমা শহরের একটি আবাসিক এলাকায় একটি ভালুক চারজনকে আহত করে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণীটি একটি কারখানায় ঢুকে পড়ে এবং ধরার জন্য পাতা ফাঁদ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এমনকি পানি পেতে কলও চালু করেছিল বলে জানা যায়, যা তার আচরণগত বুদ্ধিমত্তার ইঙ্গিত দেয়।
কেন বাড়ছে ভালুকের সাহস?
ইবারাকি নেচার মিউজিয়ামের প্রধান ও ভালুক গবেষক কোজি ইয়ামাজাকির মতে, ভালুকের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে নয়, বরং তারা মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বলেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তার ভাষায়, গত বছর বিপুল সংখ্যক ভালুক নিধন করা হয়েছে। ফলে জনসংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং অনেক ভালুক মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকতে শিখেছে এবং সেখানে খাবার পাওয়ার সুযোগও খুঁজে পেয়েছে।
হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোশিও সুবোতার মতে, ভালুক এখন মানুষকে আগের মতো হুমকি হিসেবে দেখছে না। ফলে তারা আবাসিক এলাকায় ঢুকতেও ভয় পাচ্ছে না। একসময় মানুষকে এড়িয়ে চলাই ছিল তাদের স্বাভাবিক আচরণ, কিন্তু সেই প্রবণতা বদলাচ্ছে।

প্রজনন মৌসুমেরও প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন মাস ভালুকের প্রজনন মৌসুম। এ সময় পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ভালুক সঙ্গীর খোঁজে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। একই সময়ে অনেক শাবকও মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের এলাকা খুঁজতে বের হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিচরণক্ষেত্র বিস্তৃত হয় এবং মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসার সম্ভাবনা বাড়ে।
তবে গবেষকদের ধারণা, গত বছরের মতো খাদ্যসংকট এ বছর ততটা প্রকট হবে না। বনাঞ্চলে ভালুকের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত উদ্ভিদের প্রাপ্যতা তুলনামূলক ভালো থাকায় শরৎকালে ভালুকের ব্যাপক বিচরণ কিছুটা কম হতে পারে।
সমাধান কী?
ভালুকের হামলা ঠেকাতে গত বছর জাপান সরকার জরুরি নিধন ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থার আওতায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আবাসিক এলাকাতেও শিকারিরা গুলি চালাতে পারেন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮ বার এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নিধনের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের মতে, প্রতিটি অঞ্চলে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মানুষের বসতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের সীমারেখা যত অস্পষ্ট হচ্ছে, ততই বাড়ছে সংঘাতের ঝুঁকি। আর সেই বাস্তবতায় জাপানের জন্য ভালুক-সংকট এখন শুধু বনাঞ্চলের নয়, শহরেরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















