আর মাত্র দুই মাস পর আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। এই সময়ে দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বেড়েছে। আফগানদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও প্রমাণ সামনে এলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরং কিছু দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।
রাশিয়া তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হিসেবে আলোচনায় আসে। চীনও আগেই তালেবান প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। এছাড়া কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ
তালেবান শাসনের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে নারীদের অধিকার সংকোচনের কারণে। গত পাঁচ বছরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ ব্যাপকভাবে সীমিত হয়েছে। নতুন নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ফলে অনেক নারী কার্যত ঘরবন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকবিধি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন এলাকায় নারী ও কিশোরীদের আটক করার অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব অভিযানে অনেককে অপমান, নির্যাতন এবং ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়েছে।
বিক্ষোভে সহিংসতা
হেরাতের জাবর-ইল এলাকায় পোশাকবিধি প্রয়োগের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে নামেন। অভিযোগ রয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনী শক্তি প্রয়োগ করে এবং এতে হতাহত ও আহতের ঘটনা ঘটে।
এরপর বহু নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। তাদের অনেকের অবস্থান সম্পর্কে দীর্ঘ সময় কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শঙ্কা
হাজারা, শিয়া, হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, হয়রানি ও দমন-পীড়নের খবর সামনে এসেছে।
সমালোচকদের মতে, এসব ঘটনার ফলে আফগানিস্তানের সামাজিক বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।ট

সম্পদ ও ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাদাখশান প্রদেশে অবৈধ খনিজ উত্তোলনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বহু মানুষকে আটক ও নির্যাতনের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ এর নেতিবাচক প্রভাব বহন করছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন খনিজ সম্পদ আহরণ থেকে প্রাপ্ত আয় বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের দাবি, এসব সম্পদের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ
আফগানিস্তানকে ঘিরে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, একাধিক জঙ্গি সংগঠন দেশটিতে সক্রিয় রয়েছে। এতে শুধু আফগানিস্তান নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আফগানদের প্রশ্ন
দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন একটি প্রশ্নই বেশি শোনা যাচ্ছে—মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা বাড়লে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও কার্যকর ভূমিকা নেবে?
পাঁচ বছর পরও সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে। অনেক আফগান মনে করছেন, তাদের সংকট বিশ্বমঞ্চে আলোচিত হলেও বাস্তব পরিবর্তন এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















