নরওয়ের রাজধানী অসলোতে চার দশক ধরে শিশুদের চোখে দেখা বিশ্বের গল্প তুলে ধরে আসা একটি অনন্য শিল্প জাদুঘর এখন অস্তিত্ব সংকটে। সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিশু শিল্প জাদুঘরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের তৈরি এক লাখেরও বেশি শিল্পকর্ম জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিশুদের চোখে ইতিহাস
১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরটি শুধু শিল্প প্রদর্শনের স্থান নয়, বরং সাম্প্রতিক বিশ্ব ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী নথি। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে আফগানিস্তানের গোপন স্কুলে পড়া কিশোরীদের আঁকা ছবি, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের শিশুদের শিল্পকর্ম এবং কোভিড মহামারির সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের অনুভূতির প্রকাশ।
সংগ্রহশালার দেয়ালে টাঙানো এসব ছবি, ভাস্কর্য ও অঙ্কন শিশুদের আনন্দ, ভয়, কষ্ট, আশা এবং স্বপ্নের প্রতিফলন তুলে ধরে। অনেক শিল্পকর্মে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও পারিবারিক সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

এক পরিবারের স্বপ্ন থেকে প্রতিষ্ঠা
জাদুঘরটির যাত্রা শুরু হয় একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠাতার পরিবার শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে বিভিন্ন দেশের শিশুদের আঁকা ছবি সংগ্রহ করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সেই সংগ্রহ এত বড় হয়ে ওঠে যে অসলোর একটি ভিলায় স্থায়ীভাবে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বর্তমানে সেখানে এক লাখেরও বেশি শিল্পকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিটি কাজের সঙ্গে শিল্পীর নাম ও দেশের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংগ্রহশালাটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
সরকারি সহায়তা বন্ধ
গত বছর নরওয়ের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাদুঘরের বার্ষিক অর্থায়নের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্তে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
সরকারের যুক্তি, দেশের জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা চালু হয়েছে, যেখানে গবেষণা কার্যক্রম ও অন্যান্য জাদুঘরের সঙ্গে সমন্বিত কাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, শিশু শিল্প জাদুঘরটি নতুন মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।

তবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, অর্থায়ন বন্ধের আগে তাদের কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি তারা দাবি করেছে যে গবেষণা, ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে।
বন্ধ হয়ে গেছে কার্যক্রম
অর্থ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে জাদুঘরটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে এবং সীমিত সঞ্চয় থেকে শিল্পকর্ম সংরক্ষণের খরচ বহন করা হচ্ছে।
এক সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর খোলা রাখা হলেও এখন সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিশুদের সৃষ্ট অসংখ্য মূল্যবান শিল্পকর্ম ভবিষ্যতে কোথায় সংরক্ষিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এখন বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে। তবুও পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সংগ্রহশালার কর্মকর্তারা আশা ছাড়েননি, কিন্তু বাস্তবতা বলছে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
যদি শেষ পর্যন্ত জাদুঘরটি টিকে না থাকে, তাহলে বিশ্বের নানা প্রান্তের শিশুদের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস বহনকারী এই বিশাল শিল্পভান্ডারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হবে। শিশুদের চোখে দেখা পৃথিবীর এই অনন্য সংগ্রহ হারিয়ে গেলে তা শুধু নরওয়ের নয়, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















