দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন পথ দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। দক্ষিণ কোরিয়ায় একাকী ও অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে এখন নিয়মিত ফোন করছে এআই-চালিত চ্যাটবট। শুধু খোঁজখবর নেওয়াই নয়, স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া, মানসিক সঙ্গ দেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য ডাকার কাজও করছে এই প্রযুক্তি। এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে এটি মানুষের জীবনও বাঁচিয়েছে।
অসুস্থতার খবর পেয়ে দ্রুত সহায়তা
৭৭ বছর বয়সী এক প্রবীণ নারী হঠাৎ তীব্র অসুস্থ হয়ে পড়লে তার কাছে ফোন আসে একটি এআই চ্যাটবটের। তিনি কষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চ্যাটবট বিষয়টি সামাজিক সেবাকর্মীদের জানায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর তার জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, আরও দেরি হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারত।
বৃদ্ধ সমাজের নতুন সহায়ক

দক্ষিণ কোরিয়ায় গত ১৫ বছরে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও পারিবারিক পরিচর্যাকারীর ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। এই শূন্যস্থান পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে এআই প্রযুক্তি।
‘টকিং বাডি’ নামে পরিচিত একটি সেবা একা বসবাসকারী প্রবীণদের নিয়মিত ফোন করে। কয়েক মিনিটের কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা হয়, জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত করা হয় এবং স্মৃতিশক্তি সক্রিয় রাখতে নানা ধরনের আলোচনা করা হয়।
একাকীত্ব কমাতে প্রযুক্তির ভূমিকা
অনেক প্রবীণই এই এআই সঙ্গীর সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি ভাগ করে নেন। কেউ নিজের বিষণ্নতার কথা বলেন, কেউ আবার পিয়ানো বাজিয়ে শোনান। অনেকেই জানান, এই নিয়মিত যোগাযোগ তাদের মনে করিয়ে দেয় যে তারা সমাজের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ এবং কেউ তাদের খোঁজ রাখছে।
স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে ডিজিটাল লড়াই

এদিকে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হচ্ছে আরেকটি এআইভিত্তিক ডিজিটাল থেরাপি। বিশেষ ট্যাবলেটভিত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে প্রবীণদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, ওষুধ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নিয়মিত মানসিক অনুশীলনের সমন্বয় রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দুই দশকের মধ্যে দেশটিতে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
জরুরি সতর্কবার্তাও পাঠায় চ্যাটবট
এআই ফোনসেবাটি শুধু কথোপকথনেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো প্রবীণ বুকের ব্যথা, আঘাত বা গুরুতর অসুস্থতার কথা জানালে সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এরপর সমাজকর্মীরা সরাসরি যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করেন। হারিয়ে যাওয়া ডিমেনশিয়া রোগীকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মানুষের বিকল্প নয়, তবে মূল্যবান সঙ্গী
প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কখনও কথার মাঝখানে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, আবার কখনও ভুল প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলে। তবুও নিয়মিত যোগাযোগ, অসীম ধৈর্য এবং স্মরণশক্তির কারণে অনেক প্রবীণের কাছে এটি নির্ভরযোগ্য সঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। অনেকের ভাষায়, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এই কৃত্রিম সঙ্গী তাদের একাকীত্ব কমিয়ে দিয়েছে এবং বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















