০৩:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি: শক্তির দম্ভ থেকে কূটনীতির সম্ভাবনার দিকে? বাংলাদেশের ভারসাম্যের কূটনীতি: দিল্লি না বেইজিং? শহরের রেলপথে ইতিহাসের চলমান পাঠশালা মস্তিষ্কের ব্যায়াম ছেড়ে দেবেন না: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের চিন্তার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে? গ্রেপ্তারের একদিন পর চট্টগ্রাম কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু শুভেন্দু অধিকারীর দাবি: ১০ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, অপেক্ষায় আরও ১,৮০০ দেশজুড়ে বৃষ্টির আভাস, কোথাও হতে পারে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় বগুড়ায় গ্রেপ্তার স্বাচিপ নেতা ডা. মিশু মিরপুরের হত্যাচেষ্টা মামলায় ফের গ্রেপ্তার দেখানো হলো কণ্ঠশিল্পী মমতাজকে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে ৪০ বছরের প্রবাসজীবন, ইংল্যান্ড সমর্থকদের অবিশ্বাস্য গল্প

করাচির সমুদ্রসৈকতে লাখো ঝিনুকের রহস্য, বর্ষার আগমনের সঙ্গে প্রকৃতির বিস্ময়

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে করাচির সমুদ্রসৈকতে দেখা যায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য। সৈকতের বালুচরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য সাদা ও হলুদ রঙের ঝিনুকের খোলস। এ বছরও জুন মাসে একই দৃশ্য দেখা গেছে। হাজার হাজার নয়, বরং লাখো ঝিনুক একসঙ্গে তীরে ভেসে আসায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এর পেছনে কি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নাকি এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্র?

বহু বছরের পরিচিত ঘটনা

স্থানীয় জেলেদের মতে, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে জুন ও জুলাই মাসে এমন দৃশ্য দেখা যায়। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষ এই ঘটনাকে একটি পরিচিত মৌসুমি প্রক্রিয়া হিসেবেই জানেন।

জেলেদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বর্ষার আগে সমুদ্রের গভীর স্তরের পানি ওপরে উঠে আসে। পরে ঢেউয়ের চাপে ঝিনুক ও সামুদ্রিক খোলসগুলো তীরের দিকে ভেসে আসে এবং সৈকতে জমা হয়।

Every monsoon, thousands of seashells wash up on Karachi's shores. Here's  why - iVerify Pakistan

বিজ্ঞান কী বলছে

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষা শুরু হলে প্রবল বাতাস সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণ পানি উপকূল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে।

এই গভীর পানিতে সাধারণত অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। যখন সেই পানি সমুদ্রতলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তলদেশে বসবাসকারী ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য ধীরগতির সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে ওঠে। অনেক প্রাণী মারা যায় এবং তাদের খালি খোলস পরবর্তীতে শক্তিশালী ঢেউয়ের মাধ্যমে সৈকতে ভেসে আসে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উপকূলবর্তী এলাকায় কম অক্সিজেনযুক্ত ঠান্ডা পানির উপস্থিতি থাকে। একই সময়ে উপকূলের কাছে ঝিনুকজাতীয় প্রাণীর সংখ্যাও বেশি থাকে। ফলে এই মৌসুমে সৈকতে বিপুল পরিমাণ ঝিনুকের খোলস জমা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ বছর কেন বেশি ঝিনুক?

তবে স্থানীয়দের ধারণা, এ বছর ভেসে আসা ঝিনুকের পরিমাণ স্বাভাবিক বছরের তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

Karachi coastline overwhelmed by massive seashell washup linked to climate  change - Pakistan - Aaj English TV

সাম্প্রতিক সময়ে আরব সাগরের বিভিন্ন অংশে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উষ্ণ পানি সমুদ্রের অক্সিজেনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুহার বেড়ে যেতে পারে এবং বেশি সংখ্যক খোলস তীরে এসে জমা হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যবেক্ষণ করছেন, তাপমাত্রার এই পরিবর্তন গভীর সমুদ্রের পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলছে।

ঝিনুকের খোলসের অর্থনৈতিক মূল্য

সৈকতে ভেসে আসা ঝিনুকের খোলস শুধু প্রকৃতির উপহার নয়, অনেক মানুষের জীবিকারও অংশ। উপকূলবর্তী এলাকার অনেক পরিবার এসব খোলস সংগ্রহ করে পরিষ্কার করেন। পরে সেগুলো দিয়ে গয়না, ছবির ফ্রেম, শোপিস, ফুলের টবসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করা হয়।

এ ছাড়া শিল্পখাতেও ঝিনুকের খোলসের ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো থেকে বিশেষ ধরনের ক্যালসিয়াম কার্বোনেট তৈরি করা সম্ভব, যা বিভিন্ন শিল্পপণ্যের মান উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে।

প্রকৃতির বার্ষিক এই ঘটনাটি তাই শুধু দর্শনীয় নয়, বরং সমুদ্রের পরিবেশ, মৌসুমি পরিবর্তন এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতি: শক্তির দম্ভ থেকে কূটনীতির সম্ভাবনার দিকে?

করাচির সমুদ্রসৈকতে লাখো ঝিনুকের রহস্য, বর্ষার আগমনের সঙ্গে প্রকৃতির বিস্ময়

১২:৩৭:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে করাচির সমুদ্রসৈকতে দেখা যায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য। সৈকতের বালুচরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য সাদা ও হলুদ রঙের ঝিনুকের খোলস। এ বছরও জুন মাসে একই দৃশ্য দেখা গেছে। হাজার হাজার নয়, বরং লাখো ঝিনুক একসঙ্গে তীরে ভেসে আসায় অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এর পেছনে কি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নাকি এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্র?

বহু বছরের পরিচিত ঘটনা

স্থানীয় জেলেদের মতে, এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে জুন ও জুলাই মাসে এমন দৃশ্য দেখা যায়। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী মানুষ এই ঘটনাকে একটি পরিচিত মৌসুমি প্রক্রিয়া হিসেবেই জানেন।

জেলেদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বর্ষার আগে সমুদ্রের গভীর স্তরের পানি ওপরে উঠে আসে। পরে ঢেউয়ের চাপে ঝিনুক ও সামুদ্রিক খোলসগুলো তীরের দিকে ভেসে আসে এবং সৈকতে জমা হয়।

Every monsoon, thousands of seashells wash up on Karachi's shores. Here's  why - iVerify Pakistan

বিজ্ঞান কী বলছে

বিজ্ঞানীরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বর্ষা শুরু হলে প্রবল বাতাস সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণ পানি উপকূল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে আসে।

এই গভীর পানিতে সাধারণত অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। যখন সেই পানি সমুদ্রতলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তলদেশে বসবাসকারী ঝিনুক, শামুক ও অন্যান্য ধীরগতির সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে ওঠে। অনেক প্রাণী মারা যায় এবং তাদের খালি খোলস পরবর্তীতে শক্তিশালী ঢেউয়ের মাধ্যমে সৈকতে ভেসে আসে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত উপকূলবর্তী এলাকায় কম অক্সিজেনযুক্ত ঠান্ডা পানির উপস্থিতি থাকে। একই সময়ে উপকূলের কাছে ঝিনুকজাতীয় প্রাণীর সংখ্যাও বেশি থাকে। ফলে এই মৌসুমে সৈকতে বিপুল পরিমাণ ঝিনুকের খোলস জমা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ বছর কেন বেশি ঝিনুক?

তবে স্থানীয়দের ধারণা, এ বছর ভেসে আসা ঝিনুকের পরিমাণ স্বাভাবিক বছরের তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

Karachi coastline overwhelmed by massive seashell washup linked to climate  change - Pakistan - Aaj English TV

সাম্প্রতিক সময়ে আরব সাগরের বিভিন্ন অংশে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উষ্ণ পানি সমুদ্রের অক্সিজেনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুহার বেড়ে যেতে পারে এবং বেশি সংখ্যক খোলস তীরে এসে জমা হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যবেক্ষণ করছেন, তাপমাত্রার এই পরিবর্তন গভীর সমুদ্রের পরিবেশে কতটা প্রভাব ফেলছে।

ঝিনুকের খোলসের অর্থনৈতিক মূল্য

সৈকতে ভেসে আসা ঝিনুকের খোলস শুধু প্রকৃতির উপহার নয়, অনেক মানুষের জীবিকারও অংশ। উপকূলবর্তী এলাকার অনেক পরিবার এসব খোলস সংগ্রহ করে পরিষ্কার করেন। পরে সেগুলো দিয়ে গয়না, ছবির ফ্রেম, শোপিস, ফুলের টবসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করা হয়।

এ ছাড়া শিল্পখাতেও ঝিনুকের খোলসের ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো থেকে বিশেষ ধরনের ক্যালসিয়াম কার্বোনেট তৈরি করা সম্ভব, যা বিভিন্ন শিল্পপণ্যের মান উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে।

প্রকৃতির বার্ষিক এই ঘটনাটি তাই শুধু দর্শনীয় নয়, বরং সমুদ্রের পরিবেশ, মৌসুমি পরিবর্তন এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।