নাইজেরিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী লাগোসে গত মাসের আকস্মিক বন্যায় অনেক এলাকায় পানি গাড়ির দরজা পর্যন্ত উঠে যায়। ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে কয়েক দিন ধরে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার তীব্রতা বাড়ছে বলে মনে করা হলেও শহরের দরিদ্র উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের আশঙ্কা, কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্প পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষ করে নতুন একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় আবাসন এলাকা রক্ষায় নির্মিত সমুদ্রপ্রাচীর এবং প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের উপকূলীয় মহাসড়ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এসব নির্মাণের কারণে সমুদ্রতীরের স্বাভাবিক গঠন বদলে গিয়ে উপকূলীয় এলাকায় বন্যার ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তবে এসব প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো সাম্রাজ্য
এই বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লেবানিজ-নাইজেরীয় ধনকুবের গিলবার্ট শাগুরি। তিনি নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবুর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শাগুরি ও তার ভাইয়ের পরিচালিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ১৯৭১ সালে যাত্রা শুরু করে। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি ময়দার কল থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হোটেল পর্যন্ত নানা ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে।
টিনুবু প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গোষ্ঠীটির অবকাঠামো ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের উপকূলীয় মহাসড়ক, সমুদ্রপ্রাচীর এবং সেটিকে ঘিরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের আবাসন প্রকল্পের পাশাপাশি দুটি বন্দর সংস্কারের দায়িত্বও শাগুরির নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পেয়েছে।
বন্দর সংস্কারের প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে ব্রিটিশ সরকারের নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত প্রায় ৭৪৬ মিলিয়ন পাউন্ডের ঋণ ব্যবহারের কথা রয়েছে। উপকূলীয় আবাসন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ব্যাংকও অর্থায়নে যুক্ত হয়েছে।
দরপত্র নিয়ে বিরোধ
নাইজেরিয়া সরকার বলছে, শাগুরির প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রকল্প পাচ্ছে কারণ তারা বিশ্বমানের অবকাঠামো দক্ষতার সঙ্গে নির্মাণ করতে পারে এবং দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের সক্ষমতা বেশি।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া ও পরিবেশগত বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
উপকূলীয় মহাসড়ক নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র। হিসাববিদ ও বিরোধী রাজনীতিক ফুনসো দোহার্টির অভিযোগ, প্রকল্পটি কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেন এবং দাবি করেন, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই রাস্তার নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছিল।
তবে আদালত তার মামলা গ্রহণযোগ্য নয় বলে খারিজ করে দেয়। দোহার্টির মতে, এ ধরনের আইনি উদ্যোগ বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অনেকেই এখন সরকারি প্রকল্প নিয়ে আদালতে যেতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তার ধারণা, আপিলের প্রক্রিয়াও কয়েক বছর ধরে চলতে পারে।
সরকার অবশ্য বলছে, উপকূলীয় মহাসড়কের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হাইটেক একটি বাছাই করা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজটি পেয়েছে এবং নির্মাণ শুরুর আগেই পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছিল। শাগুরি ও হাইটেকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ঋণ বাড়ছে, প্রকল্পও হচ্ছে ব্যয়বহুল
নাইজেরিয়ায় অবকাঠামো প্রকল্পের আকার ও ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পের বড় অংশ ঋণের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সরকারি চুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এপ্রিল মাসে দেশটির আইনসভা একটি আন্তঃদেশীয় মহাসড়কের জন্য প্রায় ৫১৬ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। প্রকল্পটি শাগুরির একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার বলছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তার বিশেষ দক্ষতার কারণে নির্বাচিত করা হয়েছে।
এদিকে ২০২৫ সালে নাইজেরিয়ার রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন নাইরা, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত ঘাটতি আরও বেশি হতে পারে। তাদের ধারণা, প্রায় ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন নাইরার সরকারি ব্যয় হিসাবের বাইরে থেকে গেছে। তবে দেশটির অর্থমন্ত্রী এই হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
অতীতের বিতর্কও ফিরে আসছে
প্রেসিডেন্ট টিনুবু ও শাগুরির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নাইজেরিয়ার কিছু মানুষের কাছে অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
২০০০ সালে সুইজারল্যান্ডের একটি আদালত শাগুরিকে নাইজেরিয়ার সাবেক সামরিক শাসক সানি আবাচার চুরি করা অর্থ পাচারে সহায়তার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। শাগুরি তখন দাবি করেছিলেন, তিনি যে অর্থ স্থানান্তর করছিলেন তা চুরি করা সরকারি অর্থ—এ বিষয়টি তিনি জানতেন না।
পরবর্তীতে তিনি নাইজেরিয়াকে ৬৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেন এবং ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ জরিমানাও দেন।
আরেক বিতর্কিত ব্যক্তি আবুবকর বাগুদু, যিনি বর্তমানে নাইজেরিয়ার সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী, ২০০৩ সালে আবাচার অর্থ লুটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মামলার নিষ্পত্তিতে নাইজেরিয়াকে ১৬৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন। তবে তিনি কোনো অপরাধ স্বীকার করেননি।
টিনুবুর আস্থায় শাগুরি
সমালোচনা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট টিনুবু তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পিছিয়ে আসেননি। বরং আগামী বছরের সম্ভাব্য পুনর্নির্বাচনী প্রচেষ্টায় শাগুরির সমর্থন তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
টিনুবু সমুদ্রপ্রাচীরের সমালোচনাও প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি উপকূলীয় এলাকাকে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি শাগুরিকে নাইজেরিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মানে ভূষিত করেন।
২০২৪ সালে টিনুবু তার এই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, এমন বন্ধু পাশে থাকলে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।
নাইজেরিয়ায় তাই এখন প্রশ্ন শুধু কে দেশের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করছে তা নিয়ে নয়; বরং এসব প্রকল্প কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কতটা এবং বিপুল সরকারি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে—সেটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নাইজেরিয়ার অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থের প্রকল্প যখন কয়েকটি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তখন স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















