ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নতুন জৈবিক পরিচয়ভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থা চালুর পর যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে যাত্রীরা উড়োজাহাজের সংযোগও হারাচ্ছেন। নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার ও বিদেশি যাত্রীদের চলাচল আরও কার্যকরভাবে নজরদারি করা। কিন্তু বাস্তবে এর প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে ইউরোপের অনেক বিমানবন্দরেই তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খলা।
পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা, হারিয়ে গেল ভাড়া করা গাড়ি
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২৩ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে ব্রাসেলস বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন ৩৯ বছর বয়সী শোনিজ স্যালি। বিমান থেকে নেমে তিনি যে দৃশ্য দেখলেন, সেটি ছিল দীর্ঘ পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণের সারি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ১৫ মিনিট তাকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
তার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার যাত্রীর জন্য মাত্র ছয়টি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বুথ খোলা ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তিনি আগে থেকে বুক করা ভাড়া করা গাড়িটিও নিতে পারেননি। গাড়ি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সেটি অন্য গ্রাহককে দিয়ে দেয়। পরে নতুন গাড়ি নিতে তাকে প্রায় ৭৪০ ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হয়।

দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে উঠেছিল যে কিছু যাত্রী মেঝেতে বসে পড়েন। লাইন সামান্য এগোলেই তারা বসা অবস্থায় শরীর টেনে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
শুধু ব্রাসেলস নয়, লিসবন-আমস্টারডামেও দীর্ঘ জট
বিমানবন্দরের এই সংকট শুধু ব্রাসেলসেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্তুগালের লিসবন বিমানবন্দরে অপেক্ষার সময় কখনো ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে। আমস্টারডামে ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের উড়োজাহাজ মিস করার হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি বড় ইউরোপীয় বিমান সংস্থা।
ছুটিতে যাওয়া পরিবার থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক যাত্রী—অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষা ও বিশৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। ইউরোপের নতুন সীমান্ত ব্যবস্থাকেই এই ভোগান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় ইউরোপের বাইরে থেকে আসা নির্দিষ্ট শ্রেণির যাত্রীদের আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত চলাচল অঞ্চলে কে প্রবেশ করছে এবং কে বের হচ্ছে, সে বিষয়ে আরও নির্ভুল তথ্য রাখা।
প্রযুক্তি চালু হলেও অনেক জায়গায় যন্ত্রই প্রস্তুত নয়
নতুন ব্যবস্থার বড় সমস্যা হচ্ছে প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতি। অনেক বিমানবন্দরে যাত্রীদের নিজেরাই জৈবিক তথ্য দেওয়ার জন্য যেসব স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বসানো হয়েছে, সেগুলো এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। কোথাও আবার যন্ত্র কাজ করছে না।

ব্রাসেলস বিমানবন্দরে প্রায় ৬০টি এমন যন্ত্র বসানো হলেও সেগুলো এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে যাত্রীদের দ্রুত নিবন্ধনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তাদের অনেককেই কর্মী পরিচালিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বুথের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনও নতুন ব্যবস্থায় কারিগরি সমস্যার কথা স্বীকার করেছে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে দীর্ঘ লাইন কমাতে কিছু সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তথ্য সংগ্রহ বন্ধ রাখার সুযোগ বিমানবন্দরগুলোকে দেওয়া হয়েছে।
মিষ্টি ও পানি দিয়েও ক্ষোভ কমছে না
দীর্ঘ অপেক্ষার সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের পানি ও খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের ক্ষোভ তাতে কমছে না।
ইতালির লেক কোমো থেকে ছুটি কাটিয়ে ফেরার সময় ব্রাসেলসে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী টেলর হেনরিকসেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রগামী সংযোগকারী উড়োজাহাজটি মিস করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের বিস্কুট ও লজেন্স দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু যাত্রীদের অনেকেই তখন খাবারের চেয়ে দ্রুত সীমান্ত পার হয়ে বাড়ি ফিরতে বেশি মরিয়া ছিলেন। কেউ কেউ প্রায় কান্নার পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন।
নতুন ব্যবস্থা কেন এত ধীর?
ইউরোপের নতুন সীমান্ত ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো আগের তুলনায় আরও নিরাপদ ও আধুনিকভাবে বিদেশি যাত্রীদের চলাচল নথিবদ্ধ করা। কিন্তু হাজার হাজার যাত্রী একই সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রত্যেকের পরিচয় যাচাই, আঙুলের ছাপ নেওয়া এবং মুখের ছবি সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে।
২০২৫ সালের শরৎ থেকে ব্যবস্থাটি ধাপে ধাপে চালুর পর থেকেই বিভিন্ন বিমানবন্দরে বড় ধরনের জটের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের জনবল ও ব্যবস্থাপনার পুরোনো সমস্যার সঙ্গেও নতুন প্রযুক্তির জটিলতা যুক্ত হয়েছে।
তবে সব সময় পরিস্থিতি খারাপ থাকছে না। একটি যাত্রীসেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের শুরুর দিকে আমস্টারডামে গড়ে অপেক্ষার সময় ছিল প্রায় ১৫ মিনিট এবং প্যারিসে প্রায় ৯ মিনিট। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ে নতুন ব্যবস্থা দ্রুতই কাজ করতে পারে। সমস্যা তৈরি হচ্ছে মূলত ব্যস্ত সময়ে বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে।
কিছু দেশ বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে
পর্তুগাল পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্তরক্ষীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের আগেই তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। একটি বিশেষ আবেদন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীরা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় তথ্যের বড় একটি অংশ জমা দিতে পারেন। সুইডেনেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
লিসবনে একসময় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষার ঘটনা ঘটলেও এখন ব্যস্ত সময়ে অপেক্ষার সময় প্রায় এক ঘণ্টায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। গ্রীষ্মের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে দেশটি শত শত নতুন সীমান্তরক্ষী নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছে।
সেপ্টেম্বরের পর কী হবে?
বর্তমানে সীমান্তরক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি সংগ্রহের প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারেন। এই বিশেষ সুবিধার মেয়াদ সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ চাইছে, কোনো বড় যাত্রীস্রোত আসার পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগেভাগেই এই ব্যবস্থা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সুযোগ দেওয়া হোক। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা এখনো এ দাবিতে সম্মতি দেননি।
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, বর্তমান সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে নতুন সীমান্ত ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আগের ব্যবস্থার তুলনায় একই সঙ্গে নিরাপদ ও দ্রুত হবে। তবে সেই ভবিষ্যৎ আসার আগ পর্যন্ত ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার বাস্তবতা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















