ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট্ট গ্রাম লে পোরজে। একসময় যেখানে ছিল ঘরবাড়ি, বাগান, কর্মশালা আর মানুষের স্বাভাবিক জীবন, ভয়াবহ দাবানলের পর সেখানে এখন শুধু পোড়া ধ্বংসস্তূপ। ১৩ দিন পর বাড়িতে ফিরে বাসিন্দারা নিজেদের পরিচিত জায়গাগুলো চিনতে পারছেন না। কোথাও ছাই, কোথাও পোড়া লোহার কাঠামো, আবার কোথাও ভেঙে পড়া দেয়াল—আগুন যেন একটি গোটা জনপদের স্মৃতি মুছে দিয়েছে।
কার্পেন্টার মারিও ফ্রেইতাস সোমবার যখন নিজের বাড়ির ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর শ্যালক ছাইয়ের স্তূপ থেকে একটি কার্বন ফাইবারের টুকরো তুলে আনেন। সেটি ছিল তাঁর সাইকেলের অবশিষ্ট অংশ। প্রায় এক দশক আগে নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন যে কাঠের বাড়িটি, তার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
৬১ বছর বয়সী ফ্রেইতাসের বাড়ির পাশাপাশি তাঁর কর্মশালাও আগুনে পুড়ে গেছে। পড়ে আছে কিছু ছাদের টালি, পোড়া ধাতব অংশ এবং বিছানার কাঠামোর মতো কয়েকটি বস্তু।
নিজের হারানো সম্পদের ক্ষতিপূরণ নিয়েও অনিশ্চিত তিনি। তাঁর কথায়, যা হারিয়েছেন, কোনো অর্থই তার সমান হতে পারবে না। স্ত্রী যেন তাঁর চোখের পানি না দেখতে পান, সে জন্য ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আবেগ সামলানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।

কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল
গত ২২ জুলাই লে পোরজে থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে আগুনের সূত্রপাত হয়। সরকারি কৌঁসুলিদের প্রাথমিক ধারণা, ঝোপঝাড় পরিষ্কারের একটি যন্ত্র থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গের মাধ্যমে আগুনের শুরু হতে পারে।
এরপর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই দাবানলে এক লাখ একরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে যায়। বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিতে হয়, যা শান্তিকালীন সময়ে দেশটির অন্যতম বৃহৎ উচ্ছেদ অভিযানে পরিণত হয়।
লে পোরজে ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। গ্রামের প্রায় ১৭ হাজার একর বা ৭ হাজার হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে যায়। ধ্বংস হয় প্রায় ১৮০টি বাড়ি—যা গ্রামের মোট বাড়ির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
পুরো অঞ্চলে প্রায় ২৪০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
আগুনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে প্রশ্ন

আগুন থেমেছে, কিন্তু বাসিন্দাদের মনে তৈরি হয়েছে নতুন ক্ষত। কেন এতগুলো বাড়ি পুড়ে গেল? সতর্কবার্তা কি যথেষ্ট দ্রুত দেওয়া হয়েছিল? জরুরি সাইরেন কেন কাজ করেনি? সবাইকে কি সময়মতো বার্তা পাঠানো হয়েছিল? আগুন মোকাবিলায় দমকল বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও জনবল ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখন ঘুরছে বাসিন্দাদের মধ্যে।
গ্রামের মেয়র মার্শাল জানিনেত্তি নিজেও বলেছেন, এত বাড়ি কীভাবে পুড়ে গেল, তা মানুষ বুঝতে পারছেন না।
সরকার জানিয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত হবে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী দমকলকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং যানজট এড়াতে ধাপে ধাপে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু বাসিন্দাদের ক্ষোভ তাতে কমছে না।
কেউ দরজায় দরজায় গিয়ে সতর্ক করেছিলেন
আগুন লাগার দিন ৪০ বছর বয়সী বাইসাইকেল মেরামতকারী ম্যাথিউ প্লেসিস গ্রামের একের পর এক বাড়িতে গিয়ে মানুষকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।

৭২ বছর বয়সী কনচিত্তা লদোয়ে জানিয়েছেন, প্লেসিসই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাঁকে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলেন। পরে তিনি প্লেসিসকে বলেন, তিনি তাঁদের জীবন বাঁচিয়েছেন।
নিজের পশুদের নিরাপদে সরিয়ে দেওয়ার পরও প্লেসিস পরদিন একা গ্রামে ফিরে এসেছিলেন দমকলকর্মীদের সহায়তা করতে। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আগুনের লেলিহান শিখা, ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া আকাশ আর চারপাশের প্রচণ্ড উত্তাপের মধ্যে তাঁকেও আবার পালিয়ে যেতে হয়।
এরপর তাঁর প্রতিবেশী দূর থেকে নজরদারি ক্যামেরায় দেখতে পান, আগুন প্লেসিসের বাড়ির উঠানেও পৌঁছে গেছে।
দ্বিতীয় রাতে যেন যুদ্ধক্ষেত্র
আগুনের তীব্রতার সবচেয়ে ভয়াবহ সময়গুলোর একটি ছিল দ্বিতীয় রাত।
সেদিন আগুন এমন একটি মাঠে পৌঁছে যায় যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাটির নিচে গোলার স্তূপ পুঁতে রাখা হয়েছিল। আগুনের তাপে সেগুলোর শত শতটি বিস্ফোরিত হয়।
মেয়র জানিনেত্তির বর্ণনায়, প্রায় ৪০ মিটার উঁচু আগুনের শিখা, বিস্ফোরণের শব্দ, প্রচণ্ড তাপ আর ধোঁয়ার মধ্যে পুরো এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।

পরবর্তী কয়েক দিন গ্রামবাসীদের অনেকে নিজেরাই দমকলকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। কেউ আগুনের কাছাকাছি পানি পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ অন্যভাবে উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে সহায়তা করেছেন।
সাত প্রজন্মের বাড়িও রক্ষা পেল না
প্লেসিসের বাড়িটি ছিল তাঁদের পরিবারের সাত প্রজন্মের স্মৃতি বহনকারী একটি বাড়ি। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি বাড়িটির ভেতর সংস্কার করেছেন এবং একটি সুন্দর বাগান তৈরি করেছিলেন।
এখন সেই বাড়ির কেবল দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে।
বীমা হয়তো তাঁর যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর কিছু ক্ষতি পূরণ করবে। কিন্তু যে অসংখ্য দিন-রাত তিনি বাড়িটিতে কাজ করে কাটিয়েছেন, সেই সময়ের মূল্য কীভাবে ফেরত পাবেন—সে প্রশ্নের উত্তর নেই।
তিনি বলছিলেন, এই বাড়ি নিয়ে তাঁর অনেক পরিকল্পনা ছিল। কথার মাঝেই থেমে যেতে হয় তাঁকে।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
আগুনে বাড়ি হারানো ৪৫ বছর বয়সী লুদিভিন দোরিনিয়াক স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যে বাড়িতে থাকতেন, সেটিও ধ্বংস হয়েছে।
একজন আইনজীবীর সহায়তায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের বক্তব্য ও তথ্য সংগ্রহ করছেন। ভবিষ্যতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।

তাঁর প্রশ্নগুলো খুব সরল—কেন গ্রামের সতর্কীকরণ সাইরেন কাজ করেনি? কেন মোবাইলে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়নি? দমকল বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেন ছিল না?
বাসিন্দারা শুধু ক্ষতিপূরণ চান না। তাঁরা জানতে চান, কী ভুল হয়েছিল।
ভবিষ্যতের জন্য বদলাতে হবে বন ব্যবস্থাপনা
এই দাবানলের পর ফ্রান্সে বন ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার স্বীকার করেছে, ভবিষ্যতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আরও বেশি অগ্নিরোধী ফাঁকা অঞ্চল তৈরি করতে হবে এবং বনাঞ্চলে গাছের ধরন ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে।
একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের ৫০ মিটারের মধ্যে ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখার আইন মেনে চলেননি—এমন কিছু বাসিন্দার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মেয়র জানিনেত্তি অবশ্য ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা বলছেন। তাঁর আশা, এই ধ্বংসের জায়গা থেকেই আরও নিরাপদ একটি জনপদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তিনি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর কাছে ওই অঞ্চলের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনে দেওয়া ব্যাপক মার্কিন সহায়তার আদলে বিশেষ অর্থনৈতিক সহায়তা চেয়েছেন।
সবাই কি ফিরে আসবেন?
আগুনের পর এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি—যাঁরা সব হারিয়েছেন, তাঁরা কি আবার এই গ্রামেই ফিরে এসে জীবন শুরু করবেন?
কেউ বলছেন, তাঁরা নতুন করে ঘর বানাবেন। আবার কেউ আর ফিরতে চান না।
জোয়েল পেরেইরা আগুনে দুটি বাড়ি ও একটি গ্যারেজ হারিয়েছেন। তিনি ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জমি বিক্রি করার কথা ভাবছেন।

৩৪ বছর বয়সী জয় ভিলেত্তে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে এই গ্রামে থাকতেন। সব হারানোর পর তিনিও জানেন না, পরিবার নিয়ে আবার এখানে ফিরবেন কি না।
পোড়া জিনিসের গন্ধ, ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য আর পরিচিত জায়গাগুলোকে অচেনা হয়ে যেতে দেখা—সবকিছুই তাঁদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
ছাইয়ের মধ্যেও নতুন জীবনের ইঙ্গিত
তবু ধ্বংসস্তূপের মাঝেও জীবনের ছোট্ট একটি চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন মারিও ফ্রেইতাস।
নিজের পোড়া বাড়ির বাগানে তিনি একটি কলাগাছের নতুন কুঁড়ি দেখতে পেয়েছেন। চারপাশে যেখানে শুধু কালো ছাই আর পোড়া মাটি, সেখানে ছোট্ট সবুজ অঙ্কুরটি যেন ভবিষ্যতের একটি বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রেইতাস জানেন, ঘর হারানোর ক্ষত দ্রুত সেরে উঠবে না। হারানো স্মৃতি, বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা জীবন, নিজের হাতে বানানো বাড়ি—এসব ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
তবু তাঁর বিশ্বাস, প্রকৃতি আবার সবুজ হবে। আর মানুষের ক্ষতও একদিন কিছুটা শুকাবে।
সময়ই হয়তো সেই কাজটি করতে পারবে—যে ক্ষত আগুন তৈরি করেছে, তা সারিয়ে তুলতে।
আগুনে বিধ্বস্ত ফ্রান্সের এই গ্রামে এখন ঘর ফেরার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে জবাবের দাবি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















