আইনের ভাষা কখনোই নিছক শব্দের সমষ্টি নয়। আদালতের রায়ে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং ভুক্তভোগীর প্রতি রাষ্ট্রের অবস্থানকে প্রকাশ করে। যৌন সহিংসতার মামলায় এই সত্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটি অসংবেদনশীল শব্দ বা ধারণা শুধু আইনি বিশ্লেষণকে দুর্বল করে না, বরং নির্যাতনের শিকার একজন মানুষকে আদালতের ভেতরেও নতুন করে অপমানিত করতে পারে।
২০২৫ সালের মার্চে এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি পকসো মামলার রায় এই সমস্যাটিকে তীব্রভাবে সামনে নিয়ে আসে। মামলায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছিল। অভিযুক্ত তার পায়জামার দড়ি ছিঁড়ে পোশাক নামানোর চেষ্টা করে এবং তাকে যৌনভাবে স্পর্শ করে। কিন্তু হাইকোর্ট এই আচরণকে ধর্ষণের চেষ্টা না বলে ‘প্রস্তুতির পর্যায়’ হিসেবে দেখেছিল। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং আদালতের যুক্তিকে সম্পূর্ণ অসংবেদনশীল ও অমানবিক বলে অভিহিত করে।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, যৌন সহিংসতার বিচার শুধু আইনের ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন নয়। বিচারকের সামনে থাকা ঘটনাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে, কোন শব্দে তা বর্ণনা করা হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীর আচরণকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে—এসবও ন্যায়বিচারের অংশ।
ভাষা বদলের প্রয়োজন কেন এত জরুরি
ভারতের বিচারব্যবস্থায় নারী ও যৌন সহিংসতার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমন কিছু শব্দ ও ধারণা ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। ‘অসহায় নারী’, ‘সতীত্ব হারানো’ কিংবা ‘নারীর শালীনতা লঙ্ঘন’-এর মতো শব্দ একজন নারীর ওপর সংঘটিত অপরাধকে তার ব্যক্তিগত মর্যাদা বা সামাজিক সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করে। এতে অপরাধের কেন্দ্র থেকে সরে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি—একজন মানুষের শরীর, স্বাধীনতা ও সম্মতির ওপর আক্রমণ।

২০২৬ সালে প্রকাশিত ‘জাজমেন্টস অ্যান্ড জেন্ডার: সেনসিটিভিটি অ্যান্ড কমপ্যাশন ইন রাইটিং জাজমেন্টস’ শীর্ষক হ্যান্ডবুক এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। পুরোনো ও অবমাননাকর শব্দ বাদ দিয়ে ‘নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি’ বা ‘অভিযোগকারী’-এর মতো শব্দ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ‘প্রসিকিউট্রিক্স’-এর মতো পুরোনো আইনি পরিভাষা থেকেও সরে আসার কথা বলা হয়েছে।
এটি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। তবে ভাষা পরিবর্তনকে চূড়ান্ত সমাধান মনে করার সুযোগ নেই।
আসল সংকট আদালতের যুক্তিতে
যৌন সহিংসতার মামলায় সবচেয়ে গভীর সমস্যা হলো ‘আদর্শ ভুক্তভোগী’ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণা। একজন নারী নির্যাতনের পর সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করেননি—তাহলে সন্দেহ। শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন নেই—তাহলে সন্দেহ। ঘটনার পর তিনি শান্ত ছিলেন—তাহলেও সন্দেহ। অথচ ট্রমার প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না।
আইন যদি এসব সামাজিক ধারণাকে প্রমাণের মূল্যায়নের মধ্যে ঢুকতে দেয়, তাহলে বিচারব্যবস্থা অজান্তেই ভুক্তভোগীকেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।
যৌন সহিংসতাকে নারীর ‘সম্মান’ বা ‘সতীত্বের’ বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখার পরিবর্তে ব্যক্তির শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর আঘাত হিসেবে বোঝা জরুরি। একজন নারী কী পরেছিলেন, কত দ্রুত অভিযোগ করেছিলেন, ঘটনার পর কীভাবে আচরণ করেছিলেন—এসব প্রশ্ন তখনই অর্থবহ, যখন সেগুলো প্রমাণের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের অংশ। এগুলোকে নৈতিক চরিত্র বিচারের হাতিয়ার বানানো হলে বিচার আর নিরপেক্ষ থাকে না।
আদালত যেন দ্বিতীয়বার আঘাতের জায়গা না হয়
নতুন হ্যান্ডবুকের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা হলো ‘সাক্ষীকে অতিথি’ হিসেবে দেখা। এর অর্থ হলো, আদালতে আসা একজন যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিকে কেবল মামলার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না; তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রয়োজনকেও বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক নির্যাতন থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তির জন্য আদালত নিজেই দ্বিতীয় দফার আঘাতের জায়গা হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ জেরা, অসংবেদনশীল প্রশ্ন, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা আইনি সহায়তার অভাব একজন ভুক্তভোগীকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে যেখানে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইটিই নতুন এক মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

হ্যান্ডবুক তৈরির প্রক্রিয়ায় বিচারিক রায় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এমন একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে—প্রতি পাঁচজন অংশীজনের মধ্যে চারজনই সাক্ষী সুরক্ষা প্রকল্প সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। অর্থাৎ অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা নাগালের বাইরে থেকে যেতে পারে।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। নিরাপত্তা বা আইনি সহায়তার জন্য সব দায়িত্ব ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দিলে অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিচারকের প্রথম পর্যায়েই ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও আইনজীবীর প্রয়োজন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে লিখিতভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব সেই দায় রাষ্ট্রের দিকে সরিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সংস্কারের ইতিহাস, ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি
ভারতে নারী নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি সংস্কারের ইতিহাস আসলে এক দীর্ঘ বেদনাদায়ক ধারাবাহিকতা। ১৯৯২ সালে ভানওয়ারি দেবীর ওপর সংঘটিত ভয়াবহ নির্যাতন থেকে ১৯৯৭ সালের বিশাখা নির্দেশিকা; দিল্লি, উন্নাও, কাঠুয়া, হাথরাস কিংবা কলকাতার মর্মান্তিক ঘটনাগুলো থেকে পরবর্তী আইন ও নীতিগত পরিবর্তন—প্রতিটি বড় ঘটনা রাষ্ট্রকে নতুন করে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করেছে।
কিন্তু প্রতিটি সংস্কারের পরও নতুন ঘটনা ঘটেছে। এই পুনরাবৃত্তিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে: আইন কি সত্যিই বদলাচ্ছে, নাকি কেবল প্রতিটি সংকটের পর নতুন কিছু নিয়ম যুক্ত হচ্ছে?

আদালতের ভাষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাষার পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে বিচারিক চিন্তারও পরিবর্তন ঘটবে। নারীকে নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার না করে তার সাংবিধানিক অধিকারকে কেন্দ্রীয় জায়গায় বসাতে হবে। যৌন সহিংসতার শিকার একজন মানুষকে ‘দুর্বল’ বা ‘অসহায়’ হিসেবে দেখার বদলে তাকে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ন্যায়বিচারের জন্য একজন নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় আদালতের সামনে দাঁড়াতে হবে—এমন কোনো অদৃশ্য মানদণ্ড থাকতে পারে না। দৃশ্যমান ক্ষত না থাকলেও নির্যাতন বাস্তব হতে পারে। অভিযোগ জানাতে সময় লাগলেও অপরাধ মিথ্যা হয়ে যায় না। নির্যাতনের মানসিক অভিঘাতের প্রতিক্রিয়া প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে না মিললেও একজন ভুক্তভোগীর মর্যাদা কমে না।
সুতরাং ২০২৬ সালের হ্যান্ডবুক একটি প্রয়োজনীয় সূচনা। এটি আদালতের শব্দভাণ্ডার বদলাতে পারে, বিচারকদের আরও সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে আনতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ভাষা নিয়ে নয়, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। আদালত কীভাবে লিখছে, তার পাশাপাশি আদালত কীভাবে শুনছে—সেটিই নির্ধারণ করবে এই সংস্কার কতটা সফল।
লেখকঃ আশীষ ভরদ্বাজ ডব্লিউপিইউ গোয়ার প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর। ইনসিয়াহ ভানাতভাটি একজন সমাজ-রাজনৈতিক ভাষ্যকার এবং ‘দ্য ফিয়ারলেস জাজ’ বইয়ের লেখক।
আশীষ ভরদ্বাজ ও ইনসিয়াহ ভানাতভাটি 



















