০৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
হত্যার আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের বিমান বদল, গোপনে ছোট সামরিক বিমানে সরানো হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে তুরস্কে ইরানি হামলার আশঙ্কা, গোপনে বিমান বদলেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতেই বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল এক সপ্তাহেই দ্বিতীয়বার সোনার দাম বাড়ল, ভরি ছাড়াল ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার প্রধান নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ ও বন্দর অবকাঠামো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ওলি আহমেদের মনোনয়ন জমা, ৩৫ বছর পর মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে ভোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ: মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমা, মুখোমুখি বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট ঝু রংজির বইয়ে ফিরে দেখা চীনের এক উদার সময় থাইল্যান্ডে স্কুলে বন্দুক হামলা: নিহত ৯, শোকের ছায়ায় ব্যাংককের উপকণ্ঠ জাপানের চিপ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে, বড় ভূমিকা সনি-টিএসএমসির

টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যানের সামনে পাঁচ কঠিন পরীক্ষা, এয়ার ইন্ডিয়া থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ

ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রায় এক দশক টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এন চন্দ্রশেখরন আর নতুন মেয়াদে থাকার সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় তাঁর উত্তরসূরি বাছাই এখন গোষ্ঠীটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। টাটা ট্রাস্টস ইতিমধ্যে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে।

চন্দ্রশেখরনের উত্তরসূরিকে শুধু একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না; তাঁকে একই সঙ্গে টাটা গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, লোকসান কমানো, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নতুন চেয়ারম্যানের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

এয়ার ইন্ডিয়াকে লাভজনক করার কঠিন দায়িত্ব

টাটা গ্রুপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন এয়ার ইন্ডিয়া। ২০২২ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর টাটা গ্রুপ বিমান সংস্থাটিকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেয়।

কিন্তু সেই পরিকল্পনার পথে একের পর এক বাধা এসেছে। বিমান পরিচালনার ব্যয়, জ্বালানির দাম, রুট পরিবর্তন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক অবস্থাকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। টাটা গ্রুপের জন্য এখন শুধু বহর সম্প্রসারণ নয়, বরং লোকসান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করাই বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

ফলে নতুন চেয়ারম্যানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এয়ার ইন্ডিয়ায় আগের মতো দ্রুত বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ চলবে, নাকি আগে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি শক্ত করা হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে টাটার ব্যবসার ভবিষ্যৎ

টাটা গ্রুপের অন্যতম বড় সম্পদ টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস বা টিসিএস। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা খাতের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলকে বদলে দিচ্ছে।

আগে যে কাজের জন্য বিপুলসংখ্যক সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিকর্মীর প্রয়োজন হতো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন তার একটি অংশ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারছে। এর ফলে টাটা গ্রুপের নতুন চেয়ারম্যানকে একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগাতে এবং কর্মসংস্থান ও দক্ষতার ওপর এর প্রভাব সামলাতে হবে।

টাটার জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসা শুধু গোষ্ঠীর বড় আয়ের উৎস নয়, ভারতের বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে টাটার অবস্থানেরও অন্যতম ভিত্তি।

বিপুল বিনিয়োগের বোঝা ও লোকসানি নতুন ব্যবসা

চন্দ্রশেখরনের সময়ে টাটা গ্রুপ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, বিমান পরিবহন, ই-কমার্সসহ ভবিষ্যৎমুখী বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। এর কিছু উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও বেশ কয়েকটি ব্যবসা এখনও উল্লেখযোগ্য লোকসানে রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে টাটা গ্রুপের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগে বড় ধরনের লোকসানের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়া, টাটা ডিজিটাল, টাটা ইলেকট্রনিকস এবং ব্যাটারি-সংক্রান্ত ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিমাণ ও আর্থিক ফলাফল নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।

নতুন চেয়ারম্যানকে তাই একটি কঠিন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে—কোথায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে হবে এবং কোথায় খরচ কমিয়ে লাভজনকতার দিকে যেতে হবে।

Chair of India's Tata to step down after tension with controlling charity | Reuters

টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বড় পরীক্ষা

টাটা সন্সের চেয়ারম্যানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে সম্পর্ক। টাটা ট্রাস্টস টাটা সন্সের নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার এবং গোষ্ঠীর শাসনব্যবস্থায় এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চন্দ্রশেখরনের প্রস্থানের পেছনে টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও কৌশল নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টাটা গ্রুপের ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ফলে পরবর্তী চেয়ারম্যানকে শুধু ব্যবসায়িক দক্ষতাই দেখালে হবে না। তাঁকে টাটা ট্রাস্টস, পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ারহোল্ডার এবং বিভিন্ন টাটা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

টাটার বিশাল সাম্রাজ্যকে একই কৌশলে এগিয়ে নেওয়া

টাটা গ্রুপ এখন আর কেবল ইস্পাত, গাড়ি বা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নয়। এর বিস্তার বিমান পরিবহন থেকে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ভোক্তা পণ্য থেকে আর্থিক পরিষেবা—বহু খাতে।

এই বিশাল বৈচিত্র্যই নতুন চেয়ারম্যানের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা। একটি খাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অন্য খাতের বিনিয়োগ, নগদ প্রবাহ বা ব্র্যান্ডের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে টাটা গ্রুপের সামগ্রিক বাজারমূল্য ও ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে একই সময়ে কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বড় অর্থের প্রয়োজন তৈরি করেছে।

এখন নতুন চেয়ারম্যানকে ঠিক করতে হবে, আগামী দশকে টাটা গ্রুপ কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে এবং কোন ব্যবসাগুলোকে কৌশলগতভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

উত্তরসূরি নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চন্দ্রশেখরন ২০১৭ সালে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের বাইরে থেকে আসা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ প্রযুক্তি, বিমান পরিবহন ও নতুন শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

এখন তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়টি তাই শুধু একজন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রশ্ন নয়। এটি টাটা গ্রুপ আগামী দশকে কোন পথে এগোবে, তারও একটি ইঙ্গিত দেবে।

নতুন চেয়ারম্যানকে একই সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়াকে ঘুরে দাঁড় করাতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টিসিএসের অবস্থান ধরে রাখতে হবে, বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি সামলাতে হবে, লোকসানি ব্যবসাগুলো পুনর্গঠন করতে হবে এবং টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যানের সামনে যে পাঁচটি পরীক্ষা সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেগুলো হলো—এয়ার ইন্ডিয়ার পুনর্গঠন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব মোকাবিলা, নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পুরো টাটা সাম্রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ।

এই উত্তরসূরির সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধু টাটা সন্সের নেতৃত্ব বদলাবে না; ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী করপোরেট সাম্রাজ্যের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকও নির্ধারণ করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হত্যার আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের বিমান বদল, গোপনে ছোট সামরিক বিমানে সরানো হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে

টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যানের সামনে পাঁচ কঠিন পরীক্ষা, এয়ার ইন্ডিয়া থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ

০৬:৩২:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী টাটা গ্রুপের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রায় এক দশক টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এন চন্দ্রশেখরন আর নতুন মেয়াদে থাকার সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় তাঁর উত্তরসূরি বাছাই এখন গোষ্ঠীটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। টাটা ট্রাস্টস ইতিমধ্যে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে।

চন্দ্রশেখরনের উত্তরসূরিকে শুধু একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না; তাঁকে একই সঙ্গে টাটা গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, লোকসান কমানো, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নতুন চেয়ারম্যানের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

এয়ার ইন্ডিয়াকে লাভজনক করার কঠিন দায়িত্ব

টাটা গ্রুপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি এখন এয়ার ইন্ডিয়া। ২০২২ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর টাটা গ্রুপ বিমান সংস্থাটিকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেয়।

কিন্তু সেই পরিকল্পনার পথে একের পর এক বাধা এসেছে। বিমান পরিচালনার ব্যয়, জ্বালানির দাম, রুট পরিবর্তন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি এয়ার ইন্ডিয়ার আর্থিক অবস্থাকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। টাটা গ্রুপের জন্য এখন শুধু বহর সম্প্রসারণ নয়, বরং লোকসান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করাই বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

ফলে নতুন চেয়ারম্যানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এয়ার ইন্ডিয়ায় আগের মতো দ্রুত বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ চলবে, নাকি আগে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি শক্ত করা হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে টাটার ব্যবসার ভবিষ্যৎ

টাটা গ্রুপের অন্যতম বড় সম্পদ টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস বা টিসিএস। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা খাতের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলকে বদলে দিচ্ছে।

আগে যে কাজের জন্য বিপুলসংখ্যক সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিকর্মীর প্রয়োজন হতো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন তার একটি অংশ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারছে। এর ফলে টাটা গ্রুপের নতুন চেয়ারম্যানকে একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগাতে এবং কর্মসংস্থান ও দক্ষতার ওপর এর প্রভাব সামলাতে হবে।

টাটার জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসা শুধু গোষ্ঠীর বড় আয়ের উৎস নয়, ভারতের বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে টাটার অবস্থানেরও অন্যতম ভিত্তি।

বিপুল বিনিয়োগের বোঝা ও লোকসানি নতুন ব্যবসা

চন্দ্রশেখরনের সময়ে টাটা গ্রুপ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস, বিমান পরিবহন, ই-কমার্সসহ ভবিষ্যৎমুখী বিভিন্ন খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। এর কিছু উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও বেশ কয়েকটি ব্যবসা এখনও উল্লেখযোগ্য লোকসানে রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে টাটা গ্রুপের বিভিন্ন নতুন উদ্যোগে বড় ধরনের লোকসানের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়া, টাটা ডিজিটাল, টাটা ইলেকট্রনিকস এবং ব্যাটারি-সংক্রান্ত ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিমাণ ও আর্থিক ফলাফল নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।

নতুন চেয়ারম্যানকে তাই একটি কঠিন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে—কোথায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে হবে এবং কোথায় খরচ কমিয়ে লাভজনকতার দিকে যেতে হবে।

Chair of India's Tata to step down after tension with controlling charity | Reuters

টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বড় পরীক্ষা

টাটা সন্সের চেয়ারম্যানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে সম্পর্ক। টাটা ট্রাস্টস টাটা সন্সের নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার এবং গোষ্ঠীর শাসনব্যবস্থায় এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চন্দ্রশেখরনের প্রস্থানের পেছনে টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটার সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও কৌশল নিয়ে মতপার্থক্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে টাটা গ্রুপের ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ফলে পরবর্তী চেয়ারম্যানকে শুধু ব্যবসায়িক দক্ষতাই দেখালে হবে না। তাঁকে টাটা ট্রাস্টস, পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ারহোল্ডার এবং বিভিন্ন টাটা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

টাটার বিশাল সাম্রাজ্যকে একই কৌশলে এগিয়ে নেওয়া

টাটা গ্রুপ এখন আর কেবল ইস্পাত, গাড়ি বা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নয়। এর বিস্তার বিমান পরিবহন থেকে সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিকস থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ভোক্তা পণ্য থেকে আর্থিক পরিষেবা—বহু খাতে।

এই বিশাল বৈচিত্র্যই নতুন চেয়ারম্যানের জন্য আরেকটি বড় পরীক্ষা। একটি খাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অন্য খাতের বিনিয়োগ, নগদ প্রবাহ বা ব্র্যান্ডের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে টাটা গ্রুপের সামগ্রিক বাজারমূল্য ও ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে একই সময়ে কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বড় অর্থের প্রয়োজন তৈরি করেছে।

এখন নতুন চেয়ারম্যানকে ঠিক করতে হবে, আগামী দশকে টাটা গ্রুপ কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে এবং কোন ব্যবসাগুলোকে কৌশলগতভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

উত্তরসূরি নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চন্দ্রশেখরন ২০১৭ সালে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের বাইরে থেকে আসা প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ প্রযুক্তি, বিমান পরিবহন ও নতুন শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

এখন তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের বিষয়টি তাই শুধু একজন নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রশ্ন নয়। এটি টাটা গ্রুপ আগামী দশকে কোন পথে এগোবে, তারও একটি ইঙ্গিত দেবে।

নতুন চেয়ারম্যানকে একই সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়াকে ঘুরে দাঁড় করাতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে টিসিএসের অবস্থান ধরে রাখতে হবে, বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি সামলাতে হবে, লোকসানি ব্যবসাগুলো পুনর্গঠন করতে হবে এবং টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, টাটা সন্সের পরবর্তী চেয়ারম্যানের সামনে যে পাঁচটি পরীক্ষা সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেগুলো হলো—এয়ার ইন্ডিয়ার পুনর্গঠন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব মোকাবিলা, নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পুরো টাটা সাম্রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ।

এই উত্তরসূরির সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শুধু টাটা সন্সের নেতৃত্ব বদলাবে না; ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী করপোরেট সাম্রাজ্যের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকও নির্ধারণ করতে পারে।