বিশ্বের অনেক দেশের রাজধানী শহর থেকে মানুষ ধীরে ধীরে অন্য শহর ও অঞ্চলের দিকে চলে যাচ্ছে। দূর থেকে কাজ করার সুযোগ, রাজধানীতে বাড়ির অতিরিক্ত দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বড় শহরের বাইরে বসবাসের প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু এই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে জাপানের টোকিও ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে। এই দুই রাজধানী এখনো দেশের মানুষের কাছে চাকরি, আয় ও উন্নত সুযোগের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আকর্ষণ ধরে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ দেশে রাজধানীকেন্দ্রিক জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ঘনত্ব কিছুটা কমছে। অর্থাৎ এসব দেশের মানুষ রাজধানীর বাইরে বসবাস ও কাজের সুযোগ খুঁজছেন। কিন্তু টোকিও ও সিউলের ক্ষেত্রে রাজধানীকেন্দ্রিক আকর্ষণ এখনো শক্তিশালী।
টোকিও কেন এখনো মানুষের প্রধান পছন্দ
জাপানে টোকিও শুধু প্রশাসনিক রাজধানী নয়, এটি দেশটির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র। উচ্চ আয়ের আশায় অনেক মানুষ টোকিও মহানগর এলাকায় বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন।
টোকিওতে বড় কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ একসঙ্গে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় কর্মজীবীদের জন্য শহরটির আকর্ষণ সহজে কমছে না। উন্নত রেল যোগাযোগও এই আকর্ষণকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে টোকিওর মূল শহরের বাইরে থেকেও মানুষ সহজে প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করতে পারেন।
এ কারণে দূর থেকে কাজ করার সুযোগ বাড়লেও টোকিওর প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমেনি। বরং অনেকের কাছে রাজধানীর কাছাকাছি থাকা এখনো ভালো চাকরি ও বেশি আয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সিউলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র
দক্ষিণ কোরিয়ায় রাজধানীকেন্দ্রিকতা আরও স্পষ্ট। সিউল ও আশপাশের অঞ্চল দেশটির অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রশাসন ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান কেন্দ্র।
সিউলে আবাসনের দাম অত্যন্ত বেশি হলেও চাকরি ও আয়ের সুযোগের কারণে মানুষের আগ্রহ কমছে না। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও সিউলের আবাসন বাজারে উচ্চমূল্যের চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিশেষ করে সিউলের জনপ্রিয় এলাকাগুলোতে সাধারণ আয়ের তুলনায় বাড়ির দাম অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে বসবাস কঠিন হয়ে উঠেছে। তবুও কর্মসংস্থান ও সুযোগের ঘনত্ব মানুষকে রাজধানী অঞ্চলেই থাকতে উৎসাহিত করছে।
দূর থেকে কাজের সুযোগ কেন সব জায়গায় রাজধানীর আকর্ষণ কমাতে পারছে না
মহামারির পর থেকে ঘরে বসে বা দূর থেকে কাজের সুযোগ বিশ্বজুড়ে দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে অনেক কর্মী বড় শহর ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ছোট শহর কিংবা গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
কিন্তু সব ধরনের কাজ দূর থেকে করা সম্ভব নয়। বড় কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন পেশাগত নেটওয়ার্কের জন্য বড় শহরে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন এখনো রয়েছে।
এই বাস্তবতা টোকিও ও সিউলের মতো বিশাল মহানগরকে অন্য অনেক রাজধানীর তুলনায় আলাদা করে রেখেছে।

শুধু চাকরি নয়, ভবিষ্যতের সুযোগও বড় কারণ
রাজধানীতে মানুষ শুধু বর্তমান চাকরির জন্য যান না। ভবিষ্যতে আরও ভালো চাকরি, বেশি আয়, উন্নত শিক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগের আশাতেও তারা রাজধানী বেছে নেন।
টোকিওর ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের প্রত্যাশা মানুষের রাজধানীমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। একইভাবে সিউলেও বড় প্রতিষ্ঠান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রাজধানী অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকায় তরুণদের একটি বড় অংশ সিউলমুখী থাকেন।
ফলে বাড়ির দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় যতই বাড়ুক, মানুষের কাছে রাজধানী ছাড়ার খরচও কম নয়। রাজধানী ছেড়ে গেলে ভালো চাকরি বা পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ কমে যেতে পারে—এই আশঙ্কা অনেককে শহরে থেকে যেতে বাধ্য করে।
বদলে যাচ্ছে বিশ্বের নগরজীবনের মানচিত্র
বিশ্বের অন্যান্য দেশে রাজধানীকেন্দ্রিকতা কমার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। প্রযুক্তি ও দূরবর্তী কাজের বিস্তার মানুষকে বড় শহরের বাইরে বসবাসের স্বাধীনতা দিচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বাড়িভাড়া, যানজট ও জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষকে বিকল্প শহর খুঁজতে উৎসাহিত করছে।
তবে টোকিও ও সিউল দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু প্রযুক্তি দিয়ে বড় শহরের আকর্ষণ শেষ করা যায় না। যখন একটি রাজধানীতে চাকরি, শিক্ষা, ব্যবসা, যোগাযোগ ও সামাজিক সুযোগ একসঙ্গে কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা সহজে থামে না।
বিশ্বের অনেক রাজধানী যখন জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত ঘনত্ব কমানোর চেষ্টা করছে, তখন টোকিও ও সিউল এখনো দেখাচ্ছে—অর্থনৈতিক সুযোগের শক্তিশালী টান থাকলে রাজধানীই মানুষের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হয়ে থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















