মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে খনিশিল্পের কারণে ছড়িয়ে পড়া দূষণ মোকাবিলায় গত সপ্তাহে একটি চুক্তি করেছে। তবে চুক্তিটি বাস্তবে চলমান পরিবেশগত সংকট সমাধানে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন থাইল্যান্ডের রাজনীতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের অভিযোগ, চুক্তিতে মিয়ানমারে নিয়ন্ত্রণহীন খনন কার্যক্রমের মূল সমস্যাটি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। একই সঙ্গে নদীদূষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য কক নদী দীর্ঘদিন ধরেই জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। নদীটির উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের শান রাজ্যের পাহাড়ি এলাকায়। ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরল খনিজ ও স্বর্ণের খনন বেড়ে যাওয়ায় নদীর পানিতে মাটি, পলি ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থের প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, খনির বর্জ্য ও পলিমাটি নদীতে নেমে আসার ফলে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মাছ ধরা, গবাদিপশু পালন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। নদীর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর কাছে এটি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং জীবিকা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত একটি বড় সংকট।
গত বছরের নভেম্বরেও থাইল্যান্ডের থা টন উপজেলার বাসিন্দারা কক নদীর ওপর একটি সেতুতে প্রতিবাদী ব্যানার ঝুলিয়েছিলেন। সেখানে খনি বন্ধ করা, নদীতে পলির প্রবাহ ঠেকানো এবং নদী ও মানুষের জীবন পুনরুদ্ধারের দাবি জানানো হয়। ওই সময় নদীর উৎসস্থলের দিকে বিরল খনিজ ও স্বর্ণের খনন বাড়ার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
চুক্তি হলেও মূল সমস্যার সমাধান কোথায়
পরিবেশবাদী ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের প্রধান আপত্তি হলো, নতুন চুক্তিতে দূষণের উৎসস্থলে নিয়ন্ত্রণহীন খনন কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা নেই। মিয়ানমারের যেসব এলাকায় খনন হচ্ছে, সেখান থেকে নদীতে দূষিত পদার্থ প্রবেশ করলে থাইল্যান্ডের ভেতরে শুধু নদীর পানি পরীক্ষা বা দূষণের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তাদের মতে, নদীদূষণ কমাতে হলে প্রথমেই খনির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খনন পদ্ধতি এবং পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে এসব কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকলে থাইল্যান্ডের উদ্যোগ সীমিত ফল দেবে।
তথ্য পাওয়ার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন
চুক্তি নিয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো তথ্যপ্রাপ্তির বিষয়টি। নদীর পানির মান, দূষণের মাত্রা এবং খনন কার্যক্রমের প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য না থাকলে ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকলে স্থানীয় জনগণ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের পক্ষে পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হবে। এতে দূষণের উৎস শনাক্ত করা, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সীমান্তের নদী, কিন্তু সংকট দুই দেশের
কক নদীর দূষণ দেখিয়ে দিয়েছে, একটি দেশের ভূখণ্ডে পরিচালিত খনন কার্যক্রম কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশের মানুষের জীবন ও পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধরনের নদীকে শুধু জাতীয় সীমারেখার ভেতরের সম্পদ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
থাইল্যান্ডের জন্য নদীটির পানি ও পরিবেশ রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মিয়ানমারের খনন এলাকায় পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও জরুরি। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথভাবে পানি পরীক্ষা এবং দূষণের উৎসস্থলে কার্যকর নজরদারি ছাড়া চুক্তির বাস্তব প্রভাব সীমিত থেকে যেতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান চুক্তি দুই দেশের সহযোগিতার একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু কক নদী ও আশপাশের জনপদকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে হলে আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা এবং খনন কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—চুক্তি কি শুধু নদীর দূষণের প্রভাব পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দূষণের মূল উৎস বন্ধ করতেও দুই দেশ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? সীমান্তের নদী ও নদীনির্ভর মানুষের ভবিষ্যৎ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















