চীনে গরুর পাল দ্রুত বাড়ছে। একসময় গোবি মরুভূমির প্রান্তে শুষ্ক, বালুময় ও পাথুরে এলাকা হিসেবে পরিচিত অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ার থংলিয়াও এখন বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণভূমি, ভুট্টাক্ষেত ও গবাদিপশুর খামারে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তর চীনে বৃষ্টিপাত বাড়ার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে মরুভূমি পুনরুদ্ধারের ফলে এই অঞ্চলে গবাদিপশু পালনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চীনের এই পরিবর্তন শুধু দেশটির কৃষি অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলছে না, বরং প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক গরুর মাংসের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কারণ চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংস আমদানিকারক দেশ। কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ মাংস আমদানি করার পর এখন দেশটি নিজেদের গরুর সংখ্যা বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে চাইছে।
কয়েক দশকে বদলে গেছে থংলিয়াও
থংলিয়াওয়ের যে বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক দশক আগেও মরুভূমি ও বালুময় ভূমি ছিল, তার বড় অংশ এখন ঘাস, ফসল ও বনভূমিতে ঢাকা। স্থানীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে অঞ্চলটির মাত্র ১২ শতাংশ এলাকায় তৃণভূমি বা বন ছিল। এখন সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ শতাংশে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানো, বালু নিয়ন্ত্রণ এবং সাম্প্রতিক সময়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের ফলে বালুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তবে আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চীনের সরকারি জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে উত্তর চীনের বড় অংশে বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফলে একসময় যে জমিতে কৃষিকাজ বা পশুপালন কঠিন ছিল, সেখানে এখন ঘাস ও ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে। এসব ঘাস ও ভুট্টা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাড়ছে গরুর সংখ্যা
চীনে গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য গবাদিপশুর সংখ্যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৯ কোটি গরু রয়েছে। শুধু থংলিয়াও এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ।
চীনের গরুর মাংস শিল্প বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের পরেই যার অবস্থান। একই সঙ্গে দেশটি গরুর মাংসের সবচেয়ে বড় আমদানিকারকও।
২০১৫ সালে চীন যেখানে ৫ লাখ টনেরও কম গরুর মাংস আমদানি করেছিল, ২০২৪ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় রেকর্ড ২৮ লাখ ৭০ হাজার টনে। বিপুল এই চাহিদা আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশের জন্য বড় বাজার তৈরি করেছিল।
কিন্তু এখন সেই বাজারের চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
আমদানিতে লাগাম, দেশীয় উৎপাদনে জোর
চীন দেশীয় গরুর খামারগুলোকে রক্ষা করতে বিদেশি মাংস আমদানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চলতি বছর বিভিন্ন দেশের জন্য আমদানির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া জুনের শেষ নাগাদ তার নির্ধারিত বার্ষিক সীমা পূরণ করে ফেলে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই অতিরিক্ত শুল্কের মুখে পড়ে। ব্রাজিলও নির্ধারিত সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
চীনের মোট আমদানি সীমা চলতি বছর ২৬ লাখ ৯০ হাজার টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আমেরিকান গরুর মাংসেও বড় বাধা
মে মাসে বেইজিংয়ে এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের নেতা শি জিনপিংকে আরও বেশি মার্কিন গরুর মাংস কেনার আহ্বান জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে গরুর মাংসের রপ্তানি এখনো প্রায় বন্ধই রয়েছে।
চীন ২০২৫ সালের শুরুতে মার্কিন গরুর মাংসের প্রায় সব আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি নিয়ন্ত্রক বাধা সরানো হলেও বাণিজ্য এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
তবে বিপুল জনসংখ্যার চীনের পক্ষে অদূর ভবিষ্যতে গরুর মাংসে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যত বাড়বে, বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা তত কমতে পারে।
উন্নত জাতের গরু তৈরির চেষ্টা
শুধু গরুর সংখ্যা বাড়ানো নয়, চীন এখন গরুর আকার ও মাংসের মানও উন্নত করতে চাইছে।
দেশটির স্থানীয় গরুর অনেক জাত ঐতিহাসিকভাবে লাঙল টানার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রজনন করা হয়েছে। এসব গরু স্থানীয় রোগ প্রতিরোধ এবং শীতল আবহাওয়ায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে দক্ষ হলেও মাংসের পরিমাণ তুলনামূলক কম।
তাই চীন স্থানীয় গরুর সঙ্গে সুইস সিমেন্টাল ও অ্যাঙ্গাসের মতো বড় আকৃতির মাংস উৎপাদনকারী জাতের সংকরায়ন করছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে তৈরি এসব সংকর গরুর ওজন স্থানীয় গরুর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, সংকর গরু স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা ধরে রেখেই দ্রুত ওজন বাড়াতে পারে।
ছোট খামারিদের মধ্যে দ্বিধা
তবে এই পরিবর্তন সবাই স্বাগত জানাচ্ছেন না। চীনে এখনো প্রায় ৭০ লাখ পরিবার নয়টি বা তার কম গরু পালন করে। এসব ছোট খামারি বড় আকারের বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়ন নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
হেবেই প্রদেশের এক খামারি জানিয়েছেন, তিনি সংকর গরুর প্রতি আগ্রহী নন। তার মতে, স্থানীয় জাতের ঘাস খাওয়া গরুর মাংসের স্বাদ বাজারে পাওয়া মাংসের তুলনায় ভালো।
এদিকে বড় খামারে গরু পালনের জন্য সরকার আর্থিক প্রণোদনা দিচ্ছে। অন্তর্দেশীয় মঙ্গোলিয়ায় এমন খামারকে প্রতি গরুর জন্য প্রায় ৪৪ ডলার পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, যদি সেই খামার বছরে অন্তত ৫০০টি গরু স্থানীয় কসাইখানায় সরবরাহ করে।
দাম বাড়ায় স্বস্তিতে কৃষক
আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাব ইতোমধ্যেই গরুর মাংসের দামে দেখা যাচ্ছে। গত বছরের মার্চের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে চীনে পাইকারি গরুর মাংসের দাম ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।
এর ফলে গরু পালনকারী কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পাচ্ছেন। বিশেষ করে থংলিয়াওয়ের মতো অঞ্চলে গবাদিপশু, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমের বিস্তার মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান বাড়াচ্ছে।
যে অঞ্চলে একসময় মানুষ পায়ে হেঁটে বা উটে চড়ে চলাচল করত, সেখানে এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই গাড়ি রয়েছে—স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন পরিবর্তনের চিত্র।
বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাবের আশঙ্কা
চীনের এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক গরুর মাংসের বাজারে। কারণ এতদিন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা হিসেবে চীনের বিপুল আমদানি আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো রপ্তানিকারক দেশগুলোর উৎপাদন ও দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এখন চীন একই সঙ্গে নিজেদের গরুর পাল বাড়াচ্ছে, উন্নত জাত তৈরি করছে এবং আমদানিতে শুল্ক ও কোটা আরোপ করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের চাহিদা কমে গেলে রপ্তানিকারকদের নতুন বাজার খুঁজতে হতে পারে।
তবে চীনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিপুল জনসংখ্যার মানুষের ক্রমবর্ধমান মাংসের চাহিদা পুরোপুরি দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো কঠিন। জলবায়ুর পরিবর্তনও সবসময় একইভাবে সহায়ক থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবু গোবি মরুভূমির প্রান্তে যে পরিবর্তন ইতোমধ্যে ঘটেছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে—চীন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংসের ক্রেতা হয়ে থাকতে চায় না; ভবিষ্যতে বড় উৎপাদক হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















