০৮:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
হত্যার আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের বিমান বদল, গোপনে ছোট সামরিক বিমানে সরানো হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে তুরস্কে ইরানি হামলার আশঙ্কা, গোপনে বিমান বদলেছিলেন ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতেই বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদ ছাড়লেন মির্জা ফখরুল এক সপ্তাহেই দ্বিতীয়বার সোনার দাম বাড়ল, ভরি ছাড়াল ২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার প্রধান নৌঘাঁটিতে ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধজাহাজ ও বন্দর অবকাঠামো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ওলি আহমেদের মনোনয়ন জমা, ৩৫ বছর পর মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথে ভোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ: মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমা, মুখোমুখি বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট ঝু রংজির বইয়ে ফিরে দেখা চীনের এক উদার সময় থাইল্যান্ডে স্কুলে বন্দুক হামলা: নিহত ৯, শোকের ছায়ায় ব্যাংককের উপকণ্ঠ জাপানের চিপ শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে, বড় ভূমিকা সনি-টিএসএমসির

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির দৌড়ে মির্জা ফখরুল, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে সর্বোচ্চ পদে

তৃণমূলের রাজনীতি দিয়ে শুরু, এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব—দীর্ঘ ও নানা বাঁকে ভরা রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার নাম সামনে আসে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত জানান।

৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন প্রায় ছয় দশকের। ছাত্রজীবনের বামপন্থী রাজনীতি থেকে শুরু করে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসা—তার রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে আন্দোলন, নির্বাচনী রাজনীতি, কারাবরণ, দলীয় সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘ সময় সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা।

ছাত্ররাজনীতি দিয়েই শুরু

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যও হন। এরশাদ সরকারের সময় তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর মির্জা ফখরুল ঢাকার কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। সে সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন। একই সংগঠনের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় থেকেই তার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন মির্জা ফখরুল

শিক্ষকতা থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে

শিক্ষাজীবন শেষ করে মির্জা ফখরুল কিছু সময় শিক্ষকতা করেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে সরকারি চাকরিতেও যোগ দেন।

তবে শেষ পর্যন্ত চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হন।

এর আগেই ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

রাজনীতির শুরুতে তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দেন।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড় আসে আশির দশকের শেষ দিকে। ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান তিনি।

এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তাকে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি করা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পর একসময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।

দলের কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। সংগঠনটির প্রথমে সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০১১ সাল থেকে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি এই পদেই রয়েছেন।

কঠিন সময়ে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় দলকে নেতৃত্ব দেওয়া।

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বিএনপি নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপের মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম ঘিরে একের পর এক সংকট তৈরি হয়।

এই সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাবন্দি হন এবং প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকার পর অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন।

অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সালে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ছাড়েন এবং পরে লন্ডন থেকে দলের নেতৃত্ব দিতে থাকেন।

দলের শীর্ষ দুই নেতা দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে বা সক্রিয় রাজনীতির বাইরে থাকায় বাংলাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল।

সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে।

তবে এসব চাপের মধ্যেও তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান এবং বিভিন্ন সংকটের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দলকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায়ও ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন মির্জা ফখরুল।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সরকারের সময় তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান তিনি।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এটি ছিল ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় আসনের পাশের আসন তার নির্বাচনী এলাকা।

একজন ছাত্রনেতা, শিক্ষক থেকে মন্ত্রী - এখন রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় মির্জা  ফখরুল

দলকে ধরে রাখার কৃতিত্ব

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে দলের কঠিন পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুলের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন মামলা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সাংগঠনিক সমস্যার কারণে সরাসরি মাঠে থাকতে পারেননি, তখন দেশের ভেতরে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা, সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির প্রধান মুখ হিসেবে কাজ করেছেন।

তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বিএনপির ভেতরে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ও অভিজ্ঞ হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে দলের বিভিন্ন প্রজন্মের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায়

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এবার তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।

একজন ছাত্রনেতা থেকে অর্থনীতির শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বিএনপির মহাসচিব—তার রাজনৈতিক পরিচয়ের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।

এখন রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনয়ন পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এগিয়ে যাবেন।

পারিবারিক জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ।

তার স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন কাটিয়ে অবসর নিয়েছেন।

বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন এবং সিডনিতে গবেষণার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও দায়িত্বের পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল এখন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।

জনপ্রিয় সংবাদ

হত্যার আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের বিমান বদল, গোপনে ছোট সামরিক বিমানে সরানো হয়েছিল প্রেসিডেন্টকে

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির দৌড়ে মির্জা ফখরুল, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে সর্বোচ্চ পদে

০৭:০৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

তৃণমূলের রাজনীতি দিয়ে শুরু, এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব—দীর্ঘ ও নানা বাঁকে ভরা রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয় বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তার নাম সামনে আসে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত জানান।

৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন প্রায় ছয় দশকের। ছাত্রজীবনের বামপন্থী রাজনীতি থেকে শুরু করে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসা—তার রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে আন্দোলন, নির্বাচনী রাজনীতি, কারাবরণ, দলীয় সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘ সময় সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা।

ছাত্ররাজনীতি দিয়েই শুরু

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে দুইবার দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যও হন। এরশাদ সরকারের সময় তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর মির্জা ফখরুল ঢাকার কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। সে সময় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন। একই সংগঠনের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ফলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় থেকেই তার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন মির্জা ফখরুল

শিক্ষকতা থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে

শিক্ষাজীবন শেষ করে মির্জা ফখরুল কিছু সময় শিক্ষকতা করেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে সরকারি চাকরিতেও যোগ দেন।

তবে শেষ পর্যন্ত চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হন।

এর আগেই ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

রাজনীতির শুরুতে তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দেন।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড় আসে আশির দশকের শেষ দিকে। ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান তিনি।

এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে তাকে বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি করা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পর একসময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন।

দলের কৃষক সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। সংগঠনটির প্রথমে সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০১১ সাল থেকে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে তিনি এই পদেই রয়েছেন।

কঠিন সময়ে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় দলকে নেতৃত্ব দেওয়া।

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বিএনপি নানা ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপের মুখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির আন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম ঘিরে একের পর এক সংকট তৈরি হয়।

এই সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাবন্দি হন এবং প্রায় দুই বছর কারাগারে থাকার পর অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাজনীতির বাইরে ছিলেন।

অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৮ সালে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ছাড়েন এবং পরে লন্ডন থেকে দলের নেতৃত্ব দিতে থাকেন।

দলের শীর্ষ দুই নেতা দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে বা সক্রিয় রাজনীতির বাইরে থাকায় বাংলাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ হয়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল।

সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে।

তবে এসব চাপের মধ্যেও তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যান এবং বিভিন্ন সংকটের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে দলকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেন।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায়ও ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন মির্জা ফখরুল।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সরকারের সময় তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পান তিনি।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হলেও নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এটি ছিল ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন মির্জা ফখরুল। প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় আসনের পাশের আসন তার নির্বাচনী এলাকা।

একজন ছাত্রনেতা, শিক্ষক থেকে মন্ত্রী - এখন রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় মির্জা  ফখরুল

দলকে ধরে রাখার কৃতিত্ব

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে দলের কঠিন পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুলের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন মামলা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা সাংগঠনিক সমস্যার কারণে সরাসরি মাঠে থাকতে পারেননি, তখন দেশের ভেতরে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা, সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির প্রধান মুখ হিসেবে কাজ করেছেন।

তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বিএনপির ভেতরে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ও অভিজ্ঞ হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে দলের বিভিন্ন প্রজন্মের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায়

ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এবার তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।

একজন ছাত্রনেতা থেকে অর্থনীতির শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বিএনপির মহাসচিব—তার রাজনৈতিক পরিচয়ের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ।

এখন রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনয়ন পাওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এগিয়ে যাবেন।

পারিবারিক জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ।

তার স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন কাটিয়ে অবসর নিয়েছেন।

বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন এবং সিডনিতে গবেষণার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও দায়িত্বের পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল এখন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।