একই রকম শক্তিশালী ভূমিকম্প, অথচ উদ্ধারকাজে দুই দেশের চিত্র যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষকেই খালি হাতে লড়াই করতে হয়েছে। অন্যদিকে কলম্বিয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাথমিকভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করলেও দ্রুত সরকারি সংস্থাগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো তৎপরতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
সাম্প্রতিক দুই ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার উদ্ধার কার্যক্রমের এই পার্থক্য সামনে এসেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দুর্যোগের সময় শুধু ভূমিকম্পের শক্তি নয়, রাষ্ট্রের প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দ্রুত সমন্বয়ও মানুষের জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে।
ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপ সরাতে মানুষের হাতই ভরসা
জুনের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলায় পরপর ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল। সেখানে মৃতের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লা গুয়াইরার লস কোকোস এলাকায় হুগো চাভেজের নামে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ১০০ পরিবারের একটি আবাসন প্রকল্পের অধিকাংশ ভবন ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে প্রথমদিকে পরিবার, প্রতিবেশী ও স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেরাই মাঠে নামেন।
খালি হাত, বালতি ও লাঠি দিয়ে দিনের পর দিন ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চলে। পরে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল এবং সীমিতসংখ্যক সরকারি কর্মী তাদের সঙ্গে যোগ দেন।

সবচেয়ে বড় সংকট ছিল ভারী যন্ত্রপাতির অভাব। ধ্বংসস্তূপ সরাতে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্রেনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির দাবি জানালেও সেগুলো পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। এমনকি মরদেহ উদ্ধারের সময় পুরোনো গদি ব্যবহার করতে দেখা যায় স্থানীয়দের।
এক মাস পর পৌঁছায় ভারী যন্ত্রপাতি
ভূমিকম্পের প্রায় এক মাস পর ঘটনাস্থলে দুটি ক্রেনসহ ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়। কিন্তু ততদিনে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সরকারি কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর ছয়তলা পর্যন্ত গর্ত করে কাজ করেন। সেনাসদস্যদের সহায়তায় সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তাদের হাতে থাকা কিছু যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো কাজ করছিল না।
ভেনেজুয়েলার এই পরিস্থিতি দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। তবে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার উদ্ধার তৎপরতায় কোনো ধরনের গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কলম্বিয়ায় দ্রুত বদলে যায় উদ্ধারচিত্র
এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে কলম্বিয়ার ক্যালিতে। সেখানে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রথমেই উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রায় ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন।
এরপর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় দমকল বাহিনী, পুলিশ, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থা। উদ্ধার তৎপরতায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় গড়ে ওঠে।

মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ক্যালির উদ্ধারকাজ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দিষ্ট দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়, যাতে ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনীয় ভিড় না বাড়ে। এতে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের ক্ষীণ শব্দও শুনতে সক্ষম হন।
একই সময়ে নিয়মিত ট্রাক ও ক্রেন ব্যবহার করে ধ্বংসাবশেষ সরানো হয়। মরদেহ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফরেনসিক পুলিশ সদস্যদের।
ভূমিকম্পের মাত্রাই সবকিছুর ব্যাখ্যা নয়
কলম্বিয়ার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৮৫ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৩৮০ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পটির শক্তি ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের কাছাকাছি হলেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্রে বড় পার্থক্য দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে ভৌগোলিক কারণও রয়েছে। ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল তুলনামূলকভাবে অগভীর। কিছু এলাকায় মাটির স্থিতিশীলতাও কম ছিল। অন্যদিকে কলম্বিয়ার ভূমিকম্পটি তুলনামূলকভাবে গভীরে সংঘটিত হয়।
তবে শুধু ভূমিকম্পের গভীরতা কিংবা শক্তি দিয়ে দুই দেশের পার্থক্য ব্যাখ্যা করা যায় না। দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি, উদ্ধার সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ও বড় বিষয়।

কলম্বিয়ার সামনেও বড় চ্যালেঞ্জ
কলম্বিয়ার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সংগঠিত হলেও দেশটির দরিদ্রতম প্রদেশ চোকো নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ভূমিকম্পে সেখানে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, সরকারি সেবার সীমাবদ্ধতা এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সেখানে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ত্রাণকর্মীরা।
দুই দেশের অভিজ্ঞতা তাই একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শুধু ভবন নির্মাণের মান নয়, দুর্যোগের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় দ্রুত উদ্ধার, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশেই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিয়েছে, একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার পার্থক্য মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজে ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার পার্থক্য দেখিয়েছে, দুর্যোগের মুহূর্তে সময়ই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রথম কয়েক ঘণ্টায় যত দ্রুত ও সমন্বিতভাবে উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়, তত বেশি জীবন বাঁচানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















