চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় উপসর্গ দেখা দিলেই অনেক শিশুকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে। পরে নমুনা পরীক্ষায় তাদের কারও কারও হাম নেগেটিভ আসছে। এর মধ্যে হাম আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে কয়েক দিন থাকার কারণে নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সারাক্ষণ রিপোর্ট
১২ বছরের বর্ণ চৌধুরীর হঠাৎ ১০৪ ডিগ্রি জ্বরের পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। স্থানীয় চিকিৎসকের ওষুধে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক হামের আশঙ্কায় তাকে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। তবে দুই দিন পর আরেক চিকিৎসক জানান, ফুসকুড়িগুলো হামের উপসর্গ নাও হতে পারে। পরে বর্ণকে কেবিনে নেওয়া হয়। নমুনা পরীক্ষার তিন দিন পর জানা যায়, তার হাম হয়নি।
পরীক্ষা না হওয়ায় অনুমানের চিকিৎসা

বর্ণের মতো অনেক শিশুকেই চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনুমানের ভিত্তিতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এখান থেকে নমুনা ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। নমুনা সংগ্রহ থেকে রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত কয়েক দিন সময় লাগছে। ফলে পরীক্ষার ফল হাতে আসার আগেই শিশুদের হাম ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের উপসর্গের সঙ্গে অন্য ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের উপসর্গের মিল থাকতে পারে। তাই শুধু ফুসকুড়ি বা অন্যান্য উপসর্গ দেখে হাম নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব নয়। নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আড়াই মাসে ভর্তি প্রায় ৩ হাজার ৯০০ শিশু
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৬ জন। প্রতিদিন গড়ে নতুন করে অর্ধশতাধিক শিশু ভর্তি হচ্ছে। গত ৮ আগস্ট এক দিনেই ৭৭ জন এবং ১৩ আগস্ট ৭৪ জন ভর্তি হয়। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ভর্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৪৫।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসা জানান, রোগীর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হাসপাতালকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার মতে, প্রতিটি শিশুর উপসর্গ এক রকম নয় এবং ফুসকুড়ি থাকলেই সেটি হাম—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সক্ষম ল্যাব থাকলেও শুরু হয়নি পরীক্ষা

চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে হামের নমুনা পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে। আইজিএম অ্যান্টিবডি ও আরটি-পিসিআর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধাও সেখানে রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারির সময় এই প্রতিষ্ঠানেই চট্টগ্রামে প্রথম করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয়েছিল।
তবে হাম প্রাদুর্ভাব শুরুর সাড়ে চার মাস পরও সেখানে পরীক্ষা কার্যক্রম চালু হয়নি। বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরীক্ষা চালুর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত সরকারের অনুমোদনের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমতিসহ নির্ধারিত কিছু নির্দেশনা মেনে নিতে হয়।
স্বজনদের উদ্বেগ
হাম ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত শিশুদের পাশে থাকার কারণে নেগেটিভ রোগীদের নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বর্ণের মা লিপি চৌধুরীর প্রশ্ন, সুস্থ সন্তান যদি হাসপাতালে অবস্থানকালে হামে আক্রান্ত হয়, তার দায়ভার কে নেবে?

সাড়ে চার বছরের মায়মুনের বাবাও একই উদ্বেগ জানিয়েছেন। নমুনা দেওয়ার তিন দিন পরও রিপোর্ট না আসায় মেয়েকে হাম ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হয়েছে। সেখানে হাম শনাক্ত কয়েকজন শিশুর কাছাকাছি থাকায় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে বলে জানান তিনি। পাঁচ দিন পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন, মায়মুনের হাম হয়নি এবং তাকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
হাম ও উপসর্গ থাকা শিশুদের চিকিৎসায় সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম। তবে দ্রুত স্থানীয়ভাবে নমুনা পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় ভুল চিকিৎসা ও হাসপাতালে অবস্থানকালীন সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় উপসর্গযুক্ত শিশুদের অনুমানের ভিত্তিতে হাম ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে, এতে নেগেটিভ রোগীদেরও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















