০২:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
বন্ধুরা বলেছিলেন বাবাকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে, কিন্তু আমি তা করিনি পোশাকে আর চেনা যাচ্ছে না তরুণদের—কেন বদলে গেল নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন? রোনাল্ড রিগ্যানকে হত্যাচেষ্টার ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে চান জন হিঙ্কলি? তীব্র গরমে কর্মক্ষেত্রে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত শ্রমিক, সুরক্ষা ঠেকাচ্ছে কিছু অঙ্গরাজ্য শেয়ারবাজার যত চড়ছে, ঝুঁকিও তত বাড়ছে—এখনই কি বিনিয়োগে লাগাম টানার সময়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্পদ—ভাগ চায় আমেরিকার জনপদ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে ফিরছে ১৯২০-এর দশকের কড়াকড়ির ছায়া জাতীয় উদ্যানের বুক চিরে সীমান্ত সড়ক, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ টেক্সাস ছোট প্রতারণার পেছনে ছুটছে যুক্তরাষ্ট্র, বড় কেলেঙ্কারির মামলা থেকে সরে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েলি সরকার, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ

তালেবানের ডাক, কাবুলে কি ফিরবে আমেরিকা?

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পর এবার যুক্তরাষ্ট্রকে আবার কাবুলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। তবে এবার কোনো সামরিক উপস্থিতি নয়—কূটনৈতিক সম্পর্ক, দূতাবাস এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তানে ফিরে আসার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেছেন, যুদ্ধের অধ্যায় শেষ হয়েছে এবং এখন দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও ইতিবাচক সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন করে শুরু হতে পারে।

মুত্তাকির প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে আবার দূতাবাস খুলতে পারে, কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে এবং আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদ, বাঁধ ও সড়ক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। পাঁচ বছর আগে যে দেশটি আফগানিস্তান থেকে তার সামরিক বাহিনী সরিয়ে নিয়েছিল, সেই দেশকেই এখন তালেবান সরকার অর্থনীতি ও কূটনীতির অংশীদার হিসেবে কাছে টানতে চাইছে।

যুদ্ধ নয়, এবার বিনিয়োগের আহ্বান

তালেবানের এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ফেরত চায় না। মুত্তাকি স্পষ্ট করে বলেছেন, আফগান মাটিতে অন্য কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি আফগান জনগণ মেনে নেবে না। আফগানিস্তানের ইতিহাসই এ ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পরিণতি দেখিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তালেবান সরকারের বক্তব্য, এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো। বিশেষ করে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদকে তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে।

A large, light-colored building with a sign that reads “Embassy of the United States of America Kabul, Afghanistan.” There is no indication of activity.

আফগানিস্তানে লিথিয়াম, তামা, লৌহ আকরিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে। বিরল খনিজ উপাদানেরও সম্ভাব্য মজুত রয়েছে দেশটিতে। তালেবান সরকার মনে করছে, এসব সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো কঠোর

তালেবানের আহ্বান এলেও ওয়াশিংটনের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তালেবান সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। মার্কিন সরকারের অভিযোগ, তালেবান আফগানিস্তানকে আরও স্থিতিশীল করতে এবং সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং আফগান ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে বলেও ওয়াশিংটনের দাবি।

তালেবান সরকার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে আশাবাদী। তাদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আফগান কূটনৈতিক মিশনও পুনরায় চালুর আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটনে তালেবানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনো তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার স্মৃতি রয়েছে। ফলে কাবুলে আবার সরাসরি কূটনৈতিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সহজ হবে না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে তালেবান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পাশাপাশি তালেবান সরকার গত কয়েক বছরে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে তারা। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তালেবান কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

Pakistani airstrikes kill 36 civilians in Afghanistan and wound 160,  officials say : NPR

এই কূটনৈতিক তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা। তালেবান সরকার মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে পারলে তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জিত হবে।

তবে এখনো বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তালেবান সরকারকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকেও আফগানিস্তান বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

ইউরোপের সঙ্গে অভিবাসন নিয়েও আলোচনা

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে তালেবান সরকার। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অভিবাসন বিষয়ে আলোচনা চলছে।

জার্মানি ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। জুনে ব্রাসেলসে আফগানিস্তানের পাঁচ কূটনীতিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫টি দেশের ২০ জনের বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের এবং দণ্ডিত অপরাধীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তালেবান সরকারের একজন কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে তালেবানের সঙ্গে কথা বলার যে অনীহা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমছে। তবে এখনো কোনো ইউরোপীয় দেশ তালেবান প্রশাসনকে আফগানিস্তানের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

খনিজ সম্পদই কি যুক্তরাষ্ট্রকে কাছে টানার মূল অস্ত্র?

তালেবানের প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রবিন র‍্যাফেল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলায় আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Trump Finds Reason for the U.S. to Remain in Afghanistan: Minerals - The  New York Times

আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের খনিজ খাত উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু তাতে উল্লেখযোগ্য বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলে মার্কিন সরকারের তদারকি সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বর্তমানে চীন, ইরান ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের কোম্পানির সঙ্গে তালেবান প্রশাসনের খনি ও বিনিয়োগ চুক্তি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই খাতে টানার চেষ্টা তালেবানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেই মনে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সংকটও বড় বাস্তবতা

তালেবানের কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে আফগানিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির আনুমানিক সাড়ে চার কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেকেরই মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জাতিসংঘের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

২০২৫ সালের শুরু থেকে পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ৪০ লাখ আফগান দেশে ফিরে এসেছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় বিপরীতমুখী অভিবাসনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় আফগানিস্তানের ঐতিহ্যগত বাণিজ্যপথও চাপের মুখে পড়েছে। ফলে মধ্য এশিয়া, ইরান ও ভারতের দিকে বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে কাবুল।

নারীদের অধিকার নিয়ে বড় বাধা

তালেবানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি এখনো নারীদের অধিকার ও শিক্ষার প্রশ্ন। তালেবান সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তকে সাময়িক বলে দাবি করলেও, একই ধরনের প্রতিশ্রুতি তাদের প্রথম শাসনামলেও দেওয়া হয়েছিল।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নারীদের ও মেয়েদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য তালেবানকে তাদের কঠোর নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

ICC prosecutor seeks arrest warrants for two Taliban leaders over  persecution of women

যুক্তরাষ্ট্রে তালেবান নিয়ে আলোচনার পক্ষে থাকা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু তালেবান তাদের সবচেয়ে কঠোর নীতিগুলো পরিবর্তন না করলে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন হবে—এমন মতও জোরালো।

কাবুলের নতুন কূটনৈতিক হিসাব

তালেবানের বর্তমান উদ্যোগকে তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে কাবুলে ফেরানোর আহ্বান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা এবং চীন-রাশিয়ার বাড়তে থাকা প্রভাবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা।

পাঁচ বছর আগে যে সম্পর্কের অবসান হয়েছিল সামরিক প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে, সেটিকে এবার অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে তালেবান। কিন্তু কাবুলের এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, সেটি নির্ভর করবে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, মানবাধিকার এবং বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার নিয়ে তালেবান কতটা পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত—তার ওপর।

তাই তালেবানের পক্ষ থেকে দরজা খোলার আহ্বান এলেও ওয়াশিংটন সেই দরজায় পা রাখবে কি না, এখনো তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই।

তালেবানের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মূল বার্তা অবশ্য পরিষ্কার—আফগানিস্তান আর যুদ্ধের জন্য নয়, এবার বিনিয়োগ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বন্ধুরা বলেছিলেন বাবাকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে, কিন্তু আমি তা করিনি

তালেবানের ডাক, কাবুলে কি ফিরবে আমেরিকা?

০১:০২:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পাঁচ বছর পর এবার যুক্তরাষ্ট্রকে আবার কাবুলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। তবে এবার কোনো সামরিক উপস্থিতি নয়—কূটনৈতিক সম্পর্ক, দূতাবাস এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তানে ফিরে আসার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বলেছেন, যুদ্ধের অধ্যায় শেষ হয়েছে এবং এখন দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও ইতিবাচক সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন করে শুরু হতে পারে।

মুত্তাকির প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে আবার দূতাবাস খুলতে পারে, কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে এবং আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদ, বাঁধ ও সড়ক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে পারে। পাঁচ বছর আগে যে দেশটি আফগানিস্তান থেকে তার সামরিক বাহিনী সরিয়ে নিয়েছিল, সেই দেশকেই এখন তালেবান সরকার অর্থনীতি ও কূটনীতির অংশীদার হিসেবে কাছে টানতে চাইছে।

যুদ্ধ নয়, এবার বিনিয়োগের আহ্বান

তালেবানের এই প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ফেরত চায় না। মুত্তাকি স্পষ্ট করে বলেছেন, আফগান মাটিতে অন্য কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি আফগান জনগণ মেনে নেবে না। আফগানিস্তানের ইতিহাসই এ ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পরিণতি দেখিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তালেবান সরকারের বক্তব্য, এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো। বিশেষ করে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদকে তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে।

A large, light-colored building with a sign that reads “Embassy of the United States of America Kabul, Afghanistan.” There is no indication of activity.

আফগানিস্তানে লিথিয়াম, তামা, লৌহ আকরিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে। বিরল খনিজ উপাদানেরও সম্ভাব্য মজুত রয়েছে দেশটিতে। তালেবান সরকার মনে করছে, এসব সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আগ্রহ তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো কঠোর

তালেবানের আহ্বান এলেও ওয়াশিংটনের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তালেবান সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। মার্কিন সরকারের অভিযোগ, তালেবান আফগানিস্তানকে আরও স্থিতিশীল করতে এবং সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং আফগান ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে বলেও ওয়াশিংটনের দাবি।

তালেবান সরকার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে আশাবাদী। তাদের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আফগান কূটনৈতিক মিশনও পুনরায় চালুর আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটনে তালেবানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনো তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার স্মৃতি রয়েছে। ফলে কাবুলে আবার সরাসরি কূটনৈতিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত সহজ হবে না বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে তালেবান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পাশাপাশি তালেবান সরকার গত কয়েক বছরে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে তারা। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তালেবান কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

Pakistani airstrikes kill 36 civilians in Afghanistan and wound 160,  officials say : NPR

এই কূটনৈতিক তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা। তালেবান সরকার মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে পারলে তাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জিত হবে।

তবে এখনো বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তালেবান সরকারকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকেও আফগানিস্তান বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

ইউরোপের সঙ্গে অভিবাসন নিয়েও আলোচনা

শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে তালেবান সরকার। আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অভিবাসন বিষয়ে আলোচনা চলছে।

জার্মানি ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। জুনে ব্রাসেলসে আফগানিস্তানের পাঁচ কূটনীতিক ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫টি দেশের ২০ জনের বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের এবং দণ্ডিত অপরাধীদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তালেবান সরকারের একজন কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে তালেবানের সঙ্গে কথা বলার যে অনীহা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমছে। তবে এখনো কোনো ইউরোপীয় দেশ তালেবান প্রশাসনকে আফগানিস্তানের বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

খনিজ সম্পদই কি যুক্তরাষ্ট্রকে কাছে টানার মূল অস্ত্র?

তালেবানের প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক রবিন র‍্যাফেল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব মোকাবিলায় আফগানিস্তান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Trump Finds Reason for the U.S. to Remain in Afghanistan: Minerals - The  New York Times

আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের খনিজ খাত উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু তাতে উল্লেখযোগ্য বাস্তব অগ্রগতি হয়নি বলে মার্কিন সরকারের তদারকি সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বর্তমানে চীন, ইরান ও কাতারসহ কয়েকটি দেশের কোম্পানির সঙ্গে তালেবান প্রশাসনের খনি ও বিনিয়োগ চুক্তি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এই খাতে টানার চেষ্টা তালেবানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেই মনে হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সংকটও বড় বাস্তবতা

তালেবানের কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে আফগানিস্তানের গভীর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটির আনুমানিক সাড়ে চার কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেকেরই মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জাতিসংঘের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সময়ে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।

২০২৫ সালের শুরু থেকে পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ৪০ লাখ আফগান দেশে ফিরে এসেছে। কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় বিপরীতমুখী অভিবাসনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে পাকিস্তান সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ায় আফগানিস্তানের ঐতিহ্যগত বাণিজ্যপথও চাপের মুখে পড়েছে। ফলে মধ্য এশিয়া, ইরান ও ভারতের দিকে বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে কাবুল।

নারীদের অধিকার নিয়ে বড় বাধা

তালেবানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি এখনো নারীদের অধিকার ও শিক্ষার প্রশ্ন। তালেবান সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তকে সাময়িক বলে দাবি করলেও, একই ধরনের প্রতিশ্রুতি তাদের প্রথম শাসনামলেও দেওয়া হয়েছিল।

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা নারীদের ও মেয়েদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য তালেবানকে তাদের কঠোর নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

ICC prosecutor seeks arrest warrants for two Taliban leaders over  persecution of women

যুক্তরাষ্ট্রে তালেবান নিয়ে আলোচনার পক্ষে থাকা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে সীমিত পরিসরে যোগাযোগ বাড়াতে পারে। কিন্তু তালেবান তাদের সবচেয়ে কঠোর নীতিগুলো পরিবর্তন না করলে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কঠিন হবে—এমন মতও জোরালো।

কাবুলের নতুন কূটনৈতিক হিসাব

তালেবানের বর্তমান উদ্যোগকে তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে কাবুলে ফেরানোর আহ্বান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা এবং চীন-রাশিয়ার বাড়তে থাকা প্রভাবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা।

পাঁচ বছর আগে যে সম্পর্কের অবসান হয়েছিল সামরিক প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে, সেটিকে এবার অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে নতুনভাবে সাজাতে চাইছে তালেবান। কিন্তু কাবুলের এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, সেটি নির্ভর করবে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, মানবাধিকার এবং বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার নিয়ে তালেবান কতটা পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত—তার ওপর।

তাই তালেবানের পক্ষ থেকে দরজা খোলার আহ্বান এলেও ওয়াশিংটন সেই দরজায় পা রাখবে কি না, এখনো তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই।

তালেবানের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মূল বার্তা অবশ্য পরিষ্কার—আফগানিস্তান আর যুদ্ধের জন্য নয়, এবার বিনিয়োগ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়।