একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই আমার পৃথিবীটা ছিল অনেকটা মা-বাবাকে ঘিরেই। আমাদের পারিবারিক ভ্রমণগুলোতেও আমরা থাকতাম তিনজন—আমি, মা আর বাবা। ফলে সবসময় তাঁদের দুজনকে আমি একটি জুটি হিসেবেই দেখেছি। তাঁরা ছিলেন আমার অভিভাবক, পথপ্রদর্শক, আবার একই সঙ্গে বন্ধুও।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শুরু করলাম, মা-বাবা শুধু আমার মা-বাবা নন; তাঁদের নিজেদেরও আলাদা পছন্দ, আনন্দ, আগ্রহ, স্বপ্ন আর ব্যক্তিত্ব রয়েছে। জীবনের ত্রিশের কোঠায় এসে তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে ভ্রমণের সুযোগ পাওয়ার পর সেই উপলব্ধিটা আরও গভীর হলো।
একসঙ্গে পরিবারের সদস্য হিসেবে ভ্রমণ আর শুধু দুজনের একজনকে নিয়ে ভ্রমণ—দুটি অভিজ্ঞতা যে কতটা আলাদা হতে পারে, তা তখনই বুঝেছি।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে আমরা সাধারণত তাঁর দায়িত্বের মধ্য দিয়েই দেখি। মা মানেই যত্ন, পরামর্শ আর পরিবারের কথা ভাবা। বাবা মানেই দায়িত্ব, কাজ আর পরিবারের নিরাপত্তা। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে একান্তে ভ্রমণে বের হলে সেই পরিচয়ের বাইরের মানুষটিকেও দেখা যায়। তখন কোনো অফিস নেই, সংসারের ব্যস্ততা নেই, কারও দেখাশোনার দায়িত্ব নেই। থাকে শুধু দুজন মানুষ, যারা নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছেন।
এই কারণেই মা-বাবার সঙ্গে আলাদা করে ভ্রমণ আমার কাছে এতটা বিশেষ হয়ে উঠেছে।

বাবার সঙ্গে স্কটল্যান্ডে গিয়ে বাবাকে নতুন করে দেখলাম
এ বছর বাবার ষাটতম জন্মদিনে তাঁকে তাঁর বহুদিনের স্বপ্নের ভ্রমণ উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমরা গেলাম স্কটল্যান্ডের আইলাতে। বহু বছর ধরে বাবা সেখানে যেতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে আমরা একটি ভ্রমণ আয়োজন করলাম।
দিনগুলো কেটেছে হুইস্কি তৈরির কারখানা ঘুরে দেখা, সমুদ্রতীরের ছোট ছোট শহর ঘুরে বেড়ানো এবং নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। সঙ্গে ছিলেন গ্লাসগোর একজন স্থানীয় পথপ্রদর্শক এবং আরও কয়েকজন অপরিচিত ভ্রমণসঙ্গী।
বাড়িতে সাধারণত সপ্তাহান্তে বাবা কাজের ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে চান। তখন নতুন জায়গা ঘুরে দেখার চেয়ে নিজের পছন্দের অনুষ্ঠান দেখে আরাম করতেই তাঁর বেশি ভালো লাগে। কিন্তু স্কটল্যান্ডে গিয়ে যেন বাবার অন্য এক রূপ সামনে এলো।
প্রতিটি সকাল শুরু হতো নতুন কোনো অভিযানের মধ্য দিয়ে। কখনো সমুদ্রসৈকতে হাঁটা, কখনো হুইস্কি তৈরির কারখানায় স্বাদ নেওয়া, আবার কখনো এডিনবরায় ঘুরে বাবার পছন্দের জায়গাগুলো খুঁজে বের করা।
সেখানে বাবার পছন্দ আর আগ্রহের জগতটাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। এতদিন যেখানে তিনি আমার কথা, আমার পরিকল্পনা আর আমার আগ্রহ শুনতেন, এবার আমিই শুনছিলাম তাঁর কথা।
ভ্রমণে বাবা ছিলেন অনেক বেশি শান্ত, স্বতঃস্ফূর্ত এবং প্রাণবন্ত। মুহূর্তটাকে উপভোগ করছিলেন তিনি। সাধারণ সময়ে বাবা খুব বেশি কথা বলেন না। কিন্তু শুধু আমরা দুজন থাকায় নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে, হাসাহাসি হয়েছে, আর স্কটল্যান্ডের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের দুজনের স্মৃতিতে জমা হয়েছে।
আমি যেন সেদিন বাবার ভেতরের সেই মানুষটিকে আবিষ্কার করেছিলাম, যাঁকে দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে সবসময় দেখা যায় না।
মায়ের সঙ্গে গিয়ে বন্ধুত্বের অন্যরকম স্বাদ পেলাম
বাবার সঙ্গে স্কটল্যান্ড ভ্রমণের কয়েক মাস আগে মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম কুরাসাওয়ে। মায়ের জন্য সেটি ছিল মা দিবসের বিশেষ উপহার। আমাদের দুজনেরই তখন একটু বিশ্রাম প্রয়োজন ছিল।
সেখানে ছিল নীল জল, নিরিবিলি সৈকত, ব্যক্তিগত উপহ্রদ, দিনের বিভিন্ন ভ্রমণ আর কোনো কাজ না করে অলসভাবে সময় কাটানোর সুযোগ।
আমার মা সাধারণ জীবনে সবকিছু খুব গুছিয়ে রাখেন। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি যুক্তির কথা বলেন, পরিকল্পনা করেন এবং প্রয়োজনের সময়ে সবসময় পাশে থাকেন। তাঁকে দেখলে মনে হয়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, তিনি সব সামলে নিতে পারবেন।
কিন্তু কুরাসাওয়ে গিয়ে তাঁর আরও একটি দিক দেখলাম।
সেখানে তাঁর কোনো তাড়া ছিল না। সকালে কখন ঘুম থেকে উঠতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে—এসবের কোনো চাপ ছিল না। তিনি শুধু সময়টাকে উপভোগ করছিলেন।
আমরাও খুব সাধারণ বিষয়গুলোতেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলাম। কখনো হঠাৎ কোনো পানীয় তৈরির কারখানায় চলে যাওয়া, কখনো আশপাশের মানুষদের দেখা, কখনো পথপ্রদর্শকের সঙ্গে মজা করা—সবকিছুতেই ছিল সহজ আনন্দ।
সবচেয়ে ভালো লাগত যখন আমরা আমাদের থাকার জায়গায় ফিরে শুধু গল্প করতাম। গায়ে জড়ানো তোয়ালে, হাতে এক গ্লাস পানীয় আর সামনে দীর্ঘ সময়—কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই মা-মেয়ের গল্প চলত।
সেই মুহূর্তগুলোতে মা যেন শুধু আমার মা ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
মা-বাবাকে তাঁদের নিজেদের মানুষ হিসেবে দেখার সুযোগ
জীবনে মা-বাবার সঙ্গে অনেক ভ্রমণ করেছি। আইসল্যান্ডে উত্তর আকাশের আলো দেখেছি, বাহামায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। সেই ভ্রমণগুলোর প্রত্যেকটিরই আলাদা স্মৃতি রয়েছে।
কিন্তু মা ও বাবার সঙ্গে আলাদা করে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণে আমরা তিনজনই একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকি। সেখানে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্দিষ্ট। কিন্তু একান্তে ভ্রমণ করলে সেই ভূমিকার অনেকটাই সরিয়ে রাখা যায়।
তখন বাবা শুধু বাবা নন—তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর নিজের স্বপ্ন আছে, নিজের পছন্দের জায়গা আছে, নিজের আনন্দের বিষয় আছে।
মাও শুধু মা নন—তিনি এমন একজন নারী, যিনি অবসরে থাকতে, হাসতে, গল্প করতে এবং কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই একটি সুন্দর দিন কাটাতে ভালোবাসেন।
এই ভ্রমণগুলো আমাকে বুঝিয়েছে, মা-বাবাকে শুধু তাঁদের দায়িত্বের পরিচয়ে দেখলে তাঁদের সম্পূর্ণ মানুষটিকে দেখা হয় না।
এই ভ্রমণ থামাতে চাই না
মা-বাবা আমার কাছে সবসময়ই মা-বাবা থাকবেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে একান্তে ভ্রমণ করে আমি তাঁদের আরও কাছ থেকে চিনতে পেরেছি। ব্যস্ত জীবন, কাজ, দায়িত্ব আর প্রতিদিনের নানা চিন্তার বাইরে তাঁদের ব্যক্তিগত মানুষটিকে দেখেছি।
সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব করার সুযোগ পেয়েছি।
এখন তাই মনে হয়, ভবিষ্যতে মা কিংবা বাবাকে নিয়ে শুধু পারিবারিক ভ্রমণ নয়, আলাদা আলাদা করে আরও অনেক ভ্রমণে যেতে চাই। কারণ কখনো কখনো প্রিয় মানুষকে সত্যিকারের নতুন করে চিনতে খুব দূরে কোথাও যেতে হয় না—শুধু তাঁর সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগই যথেষ্ট।
মা-বাবার সঙ্গে ভ্রমণ তাই শুধু নতুন জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা নয়। কখনো কখনো এটি তাঁদের নতুন করে আবিষ্কার করারও একটি পথ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















