০২:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
পোশাকে আর চেনা যাচ্ছে না তরুণদের—কেন বদলে গেল নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন? রোনাল্ড রিগ্যানকে হত্যাচেষ্টার ইতিহাস কি নতুন করে লিখতে চান জন হিঙ্কলি? তীব্র গরমে কর্মক্ষেত্রে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত শ্রমিক, সুরক্ষা ঠেকাচ্ছে কিছু অঙ্গরাজ্য শেয়ারবাজার যত চড়ছে, ঝুঁকিও তত বাড়ছে—এখনই কি বিনিয়োগে লাগাম টানার সময়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্পদ—ভাগ চায় আমেরিকার জনপদ ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে ফিরছে ১৯২০-এর দশকের কড়াকড়ির ছায়া জাতীয় উদ্যানের বুক চিরে সীমান্ত সড়ক, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় ক্ষুব্ধ টেক্সাস ছোট প্রতারণার পেছনে ছুটছে যুক্তরাষ্ট্র, বড় কেলেঙ্কারির মামলা থেকে সরে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েলি সরকার, বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ অভিযোগের মুখে নাইজেল ফারাজ, ট্রাম্পের কৌশলেই কি জনতার রায়কে ঢাল বানাচ্ছেন?

একসময়ের নিষিদ্ধ মাওরি শিল্প আবার ফিরছে মানুষের মুখে

নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী মাওরি জনগোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মুখের উল্কি শিল্প তা মোকো দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। একসময় ঔপনিবেশিক শাসকদের নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে যে শিল্প লুকিয়ে রাখতে হতো, এখন সেটিই মাওরি পরিচয়, বংশপরম্পরা ও সাংস্কৃতিক গর্বের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৬৪ বছর বয়সী মার্ক কোপুয়া নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের পূর্ব উপকূলীয় শহর গিসবোর্নে তাঁর ছোট স্টুডিওতে ভাগনে ডেসমন্ড হোরোমিয়ার হাতে ঐতিহ্যবাহী নকশা আঁকছিলেন। পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা নকশাগুলো তিনি স্মৃতি থেকে প্রথমে কলম দিয়ে এঁকে নেন। পরে গ্লাভস পরে শুরু করেন মূল কাজ। কিন্তু এটি সাধারণ উল্কি নয়—এটি মাওরিদের পবিত্র তা মোকো, যা শত শত বছর ধরে তাদের সংস্কৃতির অংশ।

একসময় হারিয়ে যাওয়ার পথে ছিল ঐতিহ্য

কোপুয়া ও তাঁর ভাগনে এমন একটি মাওরি সম্প্রদায়ে বড় হয়েছেন, যেখানে একসময় ঐতিহ্যবাহী উল্কিশিল্পী বা ‘তোহুঙ্গা তা মোকো’ আর অবশিষ্ট ছিলেন না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মা-বাবা থেকে সন্তানদের কাছে এই শিল্পের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা মাওরিদের তা মোকোসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

✒️ Maori facial tattoos are making a “jubilant comeback” in New Zealand  after a colonial-era ban suppressed the Indigenous practice for a century.  https://www.nytimes.com/2026/07/25/world/australia/new-zealand-maori-ta-moko -tattoos.html

ফলে মাওরিরা তাঁদের উল্কি লুকাতে শুরু করেন। নতুন প্রজন্মকে শেখানোও বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসে।

এরপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন মাওরি নারীদের ঠোঁট ও চিবুকে এবং পুরুষদের মুখজুড়ে ঐতিহ্যবাহী নকশা আবার দেখা যাচ্ছে নিউজিল্যান্ডের রাস্তায়, টেলিভিশনে এমনকি দেশটির সংসদেও।

মুখের নকশায় লেখা থাকে একটি মানুষের ইতিহাস

মাওরিদের মুখের উল্কি শুধু সৌন্দর্য বা সাজসজ্জার বিষয় নয়। এর প্রতিটি নকশার সঙ্গে যুক্ত থাকে একজন মানুষের বংশপরিচয়, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক।

নারীদের ঐতিহ্যবাহী মুখের উল্কিকে বলা হয় মোকো কাওয়ে। সাধারণত ঠোঁট ও চিবুকে এর নকশা করা হয়। পুরুষদের মুখের উল্কিকে বলা হয় মাতাওরা, যা চিবুক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মুখের অন্য অংশে বিস্তৃত হয়।

ঐতিহ্যবাহী কাঠখোদাই শিল্পী রুইহানা স্মিথ ২০২৩ সালে তাঁর প্রপিতামহীকে সম্মান জানাতে মুখে মাতাওরা করান। তাঁর চিবুক, নাক ও গালে নকশা করতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। পরিবারের সদস্যরা পুরো সময় পাশে থেকে তাঁকে সমর্থন করেন।

স্মিথের ভাষায়, এটি যেন একজন মানুষের বংশপরিচয়ের আঙুলের ছাপ। একই পরিবারের সদস্যদের মুখে বারবার ফিরে আসা কিছু নকশার মাধ্যমে পারিবারিক শিকড়ও শনাক্ত করা যায়।

ঔপনিবেশিক দমন বদলে দিয়েছিল মানুষের মন

Ancient preserved heads give up their secrets as Māori tattoos see  resurgence | New Zealand | The Guardian

উনিশ শতকে ব্রিটিশ বসতিস্থাপনকারীরা মাওরি যোদ্ধাদের সংরক্ষিত মাথা কৌতূহলের বস্তু ও স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করত। এর বিনিময়ে অস্ত্র ও স্বর্ণ দেওয়ার ঘটনাও ঘটত। এ কারণে মুখে ঐতিহ্যবাহী উল্কি থাকা মাওরিদের হত্যা করে মাথা সংগ্রহের ঘটনাও ঘটে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি পূর্বপুরুষদের মধ্যে মুখে উল্কি করার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা অনেক মাওরিকেও উল্কি থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।

১৯০৭ সালের তোহুঙ্গা দমন আইন ছিল এই সাংস্কৃতিক দমনের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। এই আইনের মাধ্যমে মাওরি পুরোহিত, চিকিৎসক, শিক্ষক, কাঠখোদাই শিল্পী ও উল্কিশিল্পীসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানধারী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়।

আইনটি ১৯৬২ সালে নিউজিল্যান্ডের সংসদ বাতিল করে। কিন্তু আইন উঠে যাওয়ার পরও বহু বছর ধরে মুখে মোকো থাকা মানুষকে অপরাধী বা গ্যাং সদস্য হিসেবে দেখা হতো।

নতুন প্রজন্ম ফিরিয়ে আনছে হারানো পরিচয়

১৯৭০-এর দশকে মাওরি অধিকার ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার পর কোপুয়াসহ কয়েকজন শিল্পী আবার মুখে ঐতিহ্যবাহী উল্কি আঁকার কাজ শুরু করেন। তাঁরা এমন এক সময়ে এই শিল্পকে ফিরিয়ে আনেন, যখন মাওরি সংস্কৃতিকে আবার নিজেদের পরিচয়ের কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল।

এখন তরুণ মাওরিরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তা মোকো গ্রহণ করছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের উল্কি করার অনুষ্ঠান তুলে ধরছেন। কেউ কেউ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদেরও আবার এই ঐতিহ্য গ্রহণে উৎসাহিত করছেন।

২০১৮ সালের নিউজিল্যান্ড সরকারের একটি জরিপে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মাওরিদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষের ঐতিহ্যবাহী উল্কি ছিল। বিপরীতে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।

Traditional Maori Tattoo of New Zealand - World History Encyclopedia

শিল্পী এড হারাওয়িরার মতে, বয়স্ক মাওরিদের অনেকেই দীর্ঘদিনের নিপীড়নের কারণে মোকো গ্রহণ করতে ভয় পেতেন। তাঁদের বড় করে তোলা হয়েছিল এমন এক ধারণার মধ্যে যে মাওরি সংস্কৃতি আধুনিক সমাজে তাঁদের এগিয়ে নিতে পারবে না।

কিন্তু তরুণ প্রজন্ম সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে।

নারীরাও ফিরিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়

৩৪ বছর বয়সী হুইরাঙ্গি ল এমন এক পরিবারের সদস্য, যেখানে তিন প্রজন্ম ধরে কেউ মুখে ঐতিহ্যবাহী মোকো নেননি। চতুর্থ সন্তানের জন্মের পর তিনি সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন।

বাইরের মানুষ তাঁকে ভিন্নভাবে দেখবে কি না, তা নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি আস্থা রাখেন।

মাওরি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনীতি। ২০১৬ সালে নানাইয়া মাহুতা নিউজিল্যান্ডের সংসদে মোকো কাওয়ে পরা প্রথম নারী হন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

Māori art of tattoo: History, meaning and modern expression

মাওরি অধিকার আন্দোলনের নেতা তামে ইতি বলেন, এখন রাজনীতিবিদ, বিচারকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মোকো পরছেন। একসময় যে চিহ্ন মানুষকে জনসমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিত, সেটিই এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে—এটাই সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তন।

শুধু শিল্প নয়, বেঁচে থাকার ইতিহাস

তা মোকোর পুনর্জাগরণ শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া উল্কিশিল্পকে ফিরিয়ে আনার গল্প নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে পুনরুদ্ধারের গল্প।

ঐতিহ্যগতভাবে মাওরি উল্কিশিল্পীরা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতেন না। হাঙরের দাঁত কিংবা অ্যালবাট্রস পাখির ডানার হাড় দিয়ে তৈরি ধারালো যন্ত্র ব্যবহার করে তাঁরা নকশা তৈরি করতেন। মার্ক কোপুয়া নিজেও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে সরাসরি এই জ্ঞান পাননি। কাঠখোদাই ও বয়নশিল্পে ব্যবহৃত নকশা এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক মোকোর নমুনা দেখে তিনি এই শিল্প পুনরায় শেখার চেষ্টা করেন।

এখন তিনি নতুন শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যাতে এই জ্ঞান আবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়।

কোপুয়ার কাছে লক্ষ্য শুধু ঘুমিয়ে পড়া একটি শিল্পকে জাগিয়ে তোলা নয়। তাঁর লক্ষ্য সেটিকে জাগ্রত রেখেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

পোশাকে আর চেনা যাচ্ছে না তরুণদের—কেন বদলে গেল নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন?

একসময়ের নিষিদ্ধ মাওরি শিল্প আবার ফিরছে মানুষের মুখে

১২:৫৪:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী মাওরি জনগোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মুখের উল্কি শিল্প তা মোকো দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। একসময় ঔপনিবেশিক শাসকদের নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে যে শিল্প লুকিয়ে রাখতে হতো, এখন সেটিই মাওরি পরিচয়, বংশপরম্পরা ও সাংস্কৃতিক গর্বের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে।

৬৪ বছর বয়সী মার্ক কোপুয়া নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপের পূর্ব উপকূলীয় শহর গিসবোর্নে তাঁর ছোট স্টুডিওতে ভাগনে ডেসমন্ড হোরোমিয়ার হাতে ঐতিহ্যবাহী নকশা আঁকছিলেন। পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা নকশাগুলো তিনি স্মৃতি থেকে প্রথমে কলম দিয়ে এঁকে নেন। পরে গ্লাভস পরে শুরু করেন মূল কাজ। কিন্তু এটি সাধারণ উল্কি নয়—এটি মাওরিদের পবিত্র তা মোকো, যা শত শত বছর ধরে তাদের সংস্কৃতির অংশ।

একসময় হারিয়ে যাওয়ার পথে ছিল ঐতিহ্য

কোপুয়া ও তাঁর ভাগনে এমন একটি মাওরি সম্প্রদায়ে বড় হয়েছেন, যেখানে একসময় ঐতিহ্যবাহী উল্কিশিল্পী বা ‘তোহুঙ্গা তা মোকো’ আর অবশিষ্ট ছিলেন না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মা-বাবা থেকে সন্তানদের কাছে এই শিল্পের জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা মাওরিদের তা মোকোসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

✒️ Maori facial tattoos are making a “jubilant comeback” in New Zealand  after a colonial-era ban suppressed the Indigenous practice for a century.  https://www.nytimes.com/2026/07/25/world/australia/new-zealand-maori-ta-moko -tattoos.html

ফলে মাওরিরা তাঁদের উল্কি লুকাতে শুরু করেন। নতুন প্রজন্মকে শেখানোও বন্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে যেতে বসে।

এরপর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন মাওরি নারীদের ঠোঁট ও চিবুকে এবং পুরুষদের মুখজুড়ে ঐতিহ্যবাহী নকশা আবার দেখা যাচ্ছে নিউজিল্যান্ডের রাস্তায়, টেলিভিশনে এমনকি দেশটির সংসদেও।

মুখের নকশায় লেখা থাকে একটি মানুষের ইতিহাস

মাওরিদের মুখের উল্কি শুধু সৌন্দর্য বা সাজসজ্জার বিষয় নয়। এর প্রতিটি নকশার সঙ্গে যুক্ত থাকে একজন মানুষের বংশপরিচয়, পারিবারিক ইতিহাস, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক।

নারীদের ঐতিহ্যবাহী মুখের উল্কিকে বলা হয় মোকো কাওয়ে। সাধারণত ঠোঁট ও চিবুকে এর নকশা করা হয়। পুরুষদের মুখের উল্কিকে বলা হয় মাতাওরা, যা চিবুক থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে মুখের অন্য অংশে বিস্তৃত হয়।

ঐতিহ্যবাহী কাঠখোদাই শিল্পী রুইহানা স্মিথ ২০২৩ সালে তাঁর প্রপিতামহীকে সম্মান জানাতে মুখে মাতাওরা করান। তাঁর চিবুক, নাক ও গালে নকশা করতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। পরিবারের সদস্যরা পুরো সময় পাশে থেকে তাঁকে সমর্থন করেন।

স্মিথের ভাষায়, এটি যেন একজন মানুষের বংশপরিচয়ের আঙুলের ছাপ। একই পরিবারের সদস্যদের মুখে বারবার ফিরে আসা কিছু নকশার মাধ্যমে পারিবারিক শিকড়ও শনাক্ত করা যায়।

ঔপনিবেশিক দমন বদলে দিয়েছিল মানুষের মন

Ancient preserved heads give up their secrets as Māori tattoos see  resurgence | New Zealand | The Guardian

উনিশ শতকে ব্রিটিশ বসতিস্থাপনকারীরা মাওরি যোদ্ধাদের সংরক্ষিত মাথা কৌতূহলের বস্তু ও স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করত। এর বিনিময়ে অস্ত্র ও স্বর্ণ দেওয়ার ঘটনাও ঘটত। এ কারণে মুখে ঐতিহ্যবাহী উল্কি থাকা মাওরিদের হত্যা করে মাথা সংগ্রহের ঘটনাও ঘটে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি পূর্বপুরুষদের মধ্যে মুখে উল্কি করার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা অনেক মাওরিকেও উল্কি থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।

১৯০৭ সালের তোহুঙ্গা দমন আইন ছিল এই সাংস্কৃতিক দমনের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি। এই আইনের মাধ্যমে মাওরি পুরোহিত, চিকিৎসক, শিক্ষক, কাঠখোদাই শিল্পী ও উল্কিশিল্পীসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানধারী ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়।

আইনটি ১৯৬২ সালে নিউজিল্যান্ডের সংসদ বাতিল করে। কিন্তু আইন উঠে যাওয়ার পরও বহু বছর ধরে মুখে মোকো থাকা মানুষকে অপরাধী বা গ্যাং সদস্য হিসেবে দেখা হতো।

নতুন প্রজন্ম ফিরিয়ে আনছে হারানো পরিচয়

১৯৭০-এর দশকে মাওরি অধিকার ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার পর কোপুয়াসহ কয়েকজন শিল্পী আবার মুখে ঐতিহ্যবাহী উল্কি আঁকার কাজ শুরু করেন। তাঁরা এমন এক সময়ে এই শিল্পকে ফিরিয়ে আনেন, যখন মাওরি সংস্কৃতিকে আবার নিজেদের পরিচয়ের কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল।

এখন তরুণ মাওরিরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তা মোকো গ্রহণ করছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের উল্কি করার অনুষ্ঠান তুলে ধরছেন। কেউ কেউ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদেরও আবার এই ঐতিহ্য গ্রহণে উৎসাহিত করছেন।

২০১৮ সালের নিউজিল্যান্ড সরকারের একটি জরিপে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মাওরিদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষের ঐতিহ্যবাহী উল্কি ছিল। বিপরীতে ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।

Traditional Maori Tattoo of New Zealand - World History Encyclopedia

শিল্পী এড হারাওয়িরার মতে, বয়স্ক মাওরিদের অনেকেই দীর্ঘদিনের নিপীড়নের কারণে মোকো গ্রহণ করতে ভয় পেতেন। তাঁদের বড় করে তোলা হয়েছিল এমন এক ধারণার মধ্যে যে মাওরি সংস্কৃতি আধুনিক সমাজে তাঁদের এগিয়ে নিতে পারবে না।

কিন্তু তরুণ প্রজন্ম সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে।

নারীরাও ফিরিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়

৩৪ বছর বয়সী হুইরাঙ্গি ল এমন এক পরিবারের সদস্য, যেখানে তিন প্রজন্ম ধরে কেউ মুখে ঐতিহ্যবাহী মোকো নেননি। চতুর্থ সন্তানের জন্মের পর তিনি সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন।

বাইরের মানুষ তাঁকে ভিন্নভাবে দেখবে কি না, তা নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি আস্থা রাখেন।

মাওরি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনীতি। ২০১৬ সালে নানাইয়া মাহুতা নিউজিল্যান্ডের সংসদে মোকো কাওয়ে পরা প্রথম নারী হন। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

Māori art of tattoo: History, meaning and modern expression

মাওরি অধিকার আন্দোলনের নেতা তামে ইতি বলেন, এখন রাজনীতিবিদ, বিচারকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ মোকো পরছেন। একসময় যে চিহ্ন মানুষকে জনসমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিত, সেটিই এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে—এটাই সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তন।

শুধু শিল্প নয়, বেঁচে থাকার ইতিহাস

তা মোকোর পুনর্জাগরণ শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া উল্কিশিল্পকে ফিরিয়ে আনার গল্প নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে পুনরুদ্ধারের গল্প।

ঐতিহ্যগতভাবে মাওরি উল্কিশিল্পীরা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করতেন না। হাঙরের দাঁত কিংবা অ্যালবাট্রস পাখির ডানার হাড় দিয়ে তৈরি ধারালো যন্ত্র ব্যবহার করে তাঁরা নকশা তৈরি করতেন। মার্ক কোপুয়া নিজেও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে সরাসরি এই জ্ঞান পাননি। কাঠখোদাই ও বয়নশিল্পে ব্যবহৃত নকশা এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক মোকোর নমুনা দেখে তিনি এই শিল্প পুনরায় শেখার চেষ্টা করেন।

এখন তিনি নতুন শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যাতে এই জ্ঞান আবার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়।

কোপুয়ার কাছে লক্ষ্য শুধু ঘুমিয়ে পড়া একটি শিল্পকে জাগিয়ে তোলা নয়। তাঁর লক্ষ্য সেটিকে জাগ্রত রেখেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।