ইসরায়েলের পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। বাড়িঘরে হামলা, গাড়িতে আগুন, পশু চুরি, জলাধার ও পানির পাইপ ধ্বংস, কৃষিজমি ও জলপাইগাছ নষ্ট করা—প্রতিদিনই এমন নানা অভিযোগ সামনে আসছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বহু ফিলিস্তিনি পরিবার এখন নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভাবছে।
এদিকে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি ক্ষমতা হারালে শান্তি যে হঠাৎ ফিরে আসবে, এমন আশা করার কারণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং পশ্চিম তীরে চলমান দমন-পীড়নের সবচেয়ে চরম রূপগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর বিতর্ক
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর শাসনকাল একই সঙ্গে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি—উভয় পক্ষের জন্যই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
গাজা এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আগের তুলনায় কিছুটা কম থাকলেও সেখানে মানবিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ক্রমেই বাড়ছে। এসব সহিংসতা ইসরায়েল ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে দূরত্বও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটতে পারে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন জনমত জরিপে। তবে তাঁর বিদায়ের পর পরিস্থিতি কতটা বদলাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আইজেনকট কি নতুন পথ দেখাতে পারেন?
নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের নেতৃত্বে আসার সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন। তবে তাঁকে শান্তিকামী বা কট্টরপন্থাবিরোধী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ নয়।
আইজেনকট ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের ‘দাহিয়া নীতি’ প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই নীতির মূল ধারণা হলো, কোনো হামলার জবাবে এমন ব্যাপক ও মাত্রাতিরিক্ত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, যাতে ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষ ভয় পেয়ে হামলা থেকে বিরত থাকে। বৈরুতের দাহিয়া এলাকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এই নীতির নামকরণ করা হয়েছিল।
তবে গাজা যুদ্ধ পরিচালনার ধরন নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে আইজেনকট যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। গাজা যুদ্ধে তিনি নিজের ছেলেকেও হারিয়েছেন। ফলে ইসরায়েলি রাজনীতিতে তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত ক্ষতির প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড্যানিয়েল কার্টজারের মতে, আইজেনকট ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তাঁর মতে, তিনি একদিকে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করতে পারেন, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে চলা আইনহীনতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেন।
পশ্চিম তীরে প্রতিদিন বাড়ছে হামলা

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এখন দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, গত বছর সেখানে প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি করে এমন হামলা হয়েছে, যাতে মানুষ আহত হয়েছে বা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন প্রায় ছয়টিতে।
২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে প্রায় ১ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ২৪৩ জন শিশু।
ফিলিস্তিনি বাসিন্দা, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর আমলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অনেক ক্ষেত্রে সহিংস বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছে। জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনও জানিয়েছে, সেনাবাহিনী নিয়মিতভাবে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার সময় তাদের সঙ্গে থাকে।
আবদেল-মজিদ হাসানের জীবন যেন এক দীর্ঘ আতঙ্ক
পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামের সত্তরের কোঠায় থাকা ফিলিস্তিনি কৃষক আবদেল-মজিদ হাসান বছরের পর বছর ধরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন।
তিনি একজন শান্ত স্বভাবের রাখাল। নিজের ১২ সন্তানই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে—এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে গর্বিত। একবার নিজের ভেড়া চরাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমার ভেড়ারাই আমার সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে।”
কিন্তু এই মানুষটির জীবনই এখন বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার এক ভয়াবহ উদাহরণ।
হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর পায়ে গুলি করেছে, দুবার তাঁর বাড়িতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে, ভেড়া চুরি করেছে, বাড়িতে ঢুকে পড়েছে, জলপাইগাছের কাছে যাওয়ার পথ বন্ধ করেছে এবং তাঁর ভেড়াগুলোকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে। তাঁকে পশুদের জন্য ব্যবহৃত পানির ঝরনায় যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাতি-নাতনিদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাঁর পাঁচটি গাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে এবং অসংখ্যবার তাঁর দিকে পাথর ছোড়া হয়েছে।
হাসানের ভাষায়, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

আগে কখনও কখনও ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের থামাত। এখন তাঁর অভিযোগ, সেনারা অনেক সময় তাদেরই রক্ষা করে।
একদিন কথা বলার সময় তাঁর এক ছেলে ফোন করে জানায়, ২০ জনের বেশি বসতি স্থাপনকারী তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। হাসান তখন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, তারা পাথর ছুড়বে, আর কোনো গাড়ি দেখলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেবে।
বাড়ি ছাড়ার কথা ভাবছে ফিলিস্তিনি পরিবার
পশ্চিম তীরের প্রত্যন্ত হালাওয়া গ্রামেও একই ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
৫৪ বছর বয়সী শিফা আবু আরাম জানিয়েছেন, তাঁরা প্রায়ই গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবেন। তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় সন্তানদের নিয়ে। তাঁর কিশোরী মেয়েরা বসতি স্থাপনকারীদের যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারে—এই আশঙ্কা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
গ্রামবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীরা বাড়িতে ঢুকে পুরুষদের হাতকড়া পরিয়েছে ও মারধর করেছে, একটি বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, পানির পাইপ কেটে দিয়েছে, জলপাই ও ডালিমগাছ উপড়ে ফেলেছে, সৌর প্যানেল ও পানির ট্যাংক নষ্ট করেছে। এমনকি নারীরা ভেতরে থাকা অবস্থায় শৌচাগারের দরজাতেও আঘাত করেছে তারা।
কখনও কখনও হামলাকারীদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা গেছে বলে গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন।
সবচেয়ে আতঙ্কজনক ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে স্কুলগামী শিশুদের বহনকারী গাড়িকে ঘিরে। বসতি স্থাপনকারীরা সেই গাড়িতে ধাক্কা দিয়েছে বলে শিশু ও তাদের অভিভাবকেরা জানিয়েছেন।
৯ বছর বয়সী এক শিশু কাওথার বলেছে, গাড়িতে হামলার সময় সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
ইসরায়েলের ভেতরেও বাড়ছে প্রতিবাদ

বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ঠেকানোর সম্ভাবনা বাড়িয়েছে ইসরায়েলের ভেতরে এ নিয়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। দেশটির অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন প্রকাশ্যে এসব হামলার নিন্দা করছেন এবং সরকারের কাছে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীসহ ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা চলতি গ্রীষ্মে একটি যৌথ চিঠিতে নেতানিয়াহুর সরকারকে পশ্চিম তীরে ছড়িয়ে পড়া “ইহুদি সন্ত্রাস” অবিলম্বে বন্ধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান তামির পারদো পশ্চিম তীরের গ্রামগুলো ঘুরে দেখার পর বলেন, তাঁর মা হলোকাস্টের জীবিতদের একজন ছিলেন। পশ্চিম তীরে তিনি যা দেখেছেন, তা তাঁকে গত শতাব্দীতে ইহুদিদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত ইসরায়েলি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোনাতান শিমশোনিও আরও কঠোর মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল এখন পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এমনকি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও বসতি স্থাপনকারীদের হামলাকে “ভয়াবহ সহিংসতার ঢেউ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং হামলাকারীদের নৈরাজ্যবাদী জনতা বলে নিন্দা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও বদলাচ্ছে জনমত
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

একটি সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার পক্ষে থাকা আমেরিকানদের সংখ্যা বিপক্ষে থাকা মানুষের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। আরেকটি জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ স্বতন্ত্র ভোটার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সহায়তা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, পশ্চিম তীরে সহিংসতার মাত্রা যত বাড়বে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থন ততই চাপে পড়তে পারে।
লেখাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে পশ্চিম তীরে চলা কিছু সহিংসতার দায় থেকেও পুরোপুরি মুক্ত নয়।
নেতানিয়াহুর বিদায় মানেই কি পরিবর্তন?
নেতানিয়াহু যদি অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজিত হন, তাহলে ইসরায়েলের নীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্রুত শান্তি বা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইসরায়েলের নতুন সরকার সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও কাজটি সহজ হবে না বলে মনে করেন ইসরায়েলভিত্তিক নির্যাতনবিরোধী সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সারি বাশি।

তাঁর মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সরকার অস্ত্র ও যানবাহন দিয়েছে, তাদের সাহস জুগিয়েছে। ফলে যে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।
এ কারণেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পতন ঘটলেও পশ্চিম তীরের বাস্তবতা রাতারাতি বদলে যাবে না। গাজায় মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকতে পারে, পশ্চিম তীরেও বৈষম্য ও দমন-পীড়ন থেকে যেতে পারে।
তবে নতুন নেতৃত্ব যদি সহিংসতার লাগাম টানতে চায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাস্তব পদক্ষেপ নেয়, তাহলে অন্তত পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো—ইসরায়েল কি এমন একটি রাজনৈতিক পথ বেছে নেবে, যেখানে নিরাপত্তার নামে সহিংসতা আরও বাড়বে, নাকি পশ্চিম তীর ও গাজায় দীর্ঘদিনের রক্তপাত ও দমন-পীড়ন কমানোর দিকে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















