দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সম্পদ ব্যয়ের কারণে এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন সত্যিই কতটা সামরিক সহায়তা দিতে পারবে—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বিতীয় থমাস শোল এলাকায় চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সংঘর্ষগুলোর একটি ঘটে। বিতর্কিত ওই এলাকায় ফিলিপাইনের নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি পুরোনো যুদ্ধজাহাজ ‘সিয়েরা মাদ্রে’ স্থাপন করে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের এক রায়ও ওই এলাকার ওপর ফিলিপাইনের দাবিকে সমর্থন করেছে।
কিন্তু গত মাসে চীনা কোস্টগার্ডের একটি জাহাজ যুদ্ধজাহাজটির চারপাশে টহল দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে চীনা বাহিনীর ছোট নৌযান ফিলিপাইনের সেনাসদস্যদের কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সেনাসদস্যকে কাঠের লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তিনি মাথায় আহত হন। চীন অবশ্য এই ঘটনার জন্য ফিলিপাইনকেই দায়ী করে।
ঘটনার পর ফিলিপাইনের পাশে থাকার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ম্যানিলায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও সংঘর্ষের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু একই সঙ্গে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—চীন যদি আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তখন যুক্তরাষ্ট্র কি বাস্তবে প্রয়োজনীয় শক্তি ও অস্ত্র নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারবে?
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এশিয়ার নিরাপত্তায়

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সম্পদ ব্যয় হচ্ছে। বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কোথাও কোথাও মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি ছাড়তেও হয়েছে।
এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ ইরানের তুলনায় চীনের সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি। ফলে এশিয়ায় বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে সামরিক চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে।
এর মধ্যেই জুলাইয়ের শুরুতে চীন পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বিরল পরীক্ষা চালিয়েছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়ে এবং এতে একটি পরীক্ষামূলক ওয়ারহেড ছিল। চীনের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম শক্তিশালী উপাদান হিসেবে এই অস্ত্রকে দেখা হয়।
এশিয়ায় মার্কিন উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন
চীন যখন সামরিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় কয়েকটি কনস্যুলেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মার্কিন কংগ্রেসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া নীতির সমালোচনাও বাড়ছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস বলেছেন, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য বর্তমান প্রশাসনের নীতি বড় ধরনের ব্যর্থতা তৈরি করেছে। তাঁর মতে, এই নীতি চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করছে এবং এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে না। আগস্টের ১০ তারিখ ম্যানিলায় দেওয়া এক বক্তব্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতিবিষয়ক উপসচিব এলব্রিজ কলবি বলেন, প্রথম দ্বীপমালাকে ঘিরে এমন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যাতে চীন তাইওয়ান, ফিলিপাইন বা জাপানের কোনো দ্বীপে হামলা চালানোর কথা চিন্তা করলেও তা থেকে বিরত থাকে।
তবে একই সঙ্গে এশিয়ার মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সমন্বয় আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
বাণিজ্যনীতিও বাড়াচ্ছে দূরত্ব
শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক নীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধের আওতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশও পড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক দেশের কাছে এখন শুধু নিরাপত্তার অংশীদার নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবেও মনে হচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের অভাবও নতুন নয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য চুক্তির যে উদ্যোগ সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে দুই দলের রাজনীতিবিদদের মধ্যেই সেটি এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ কমে যায়।
এর ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ভাবতে শুরু করেছে, চীনের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের আগের সেই আগ্রহ কোথায় হারিয়ে গেল।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝখানে এশিয়ার দেশগুলো
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কেউই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বড় শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে যেতে চায় না। কিন্তু একই সঙ্গে তারা চায়, চীনের বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র যেন একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন যদি এ অঞ্চলে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি দুর্বল করে, তাহলে এশিয়ার দেশগুলোর অনেকেই বাধ্য হয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।
এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় রয়েছে ফিলিপাইন। চীন তাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি, আবার চীনের সামরিক চাপ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও তাদের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।
ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড হেইদারিয়ান বলেন, দেশটি দুই পক্ষের সঙ্গেই সর্বোচ্চ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক মিত্র এবং চীনের হুমকির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন হলেও সামরিক সহযোগিতার বাইরে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে খুব বেশি সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্প-শি ঘনিষ্ঠতায় নতুন সমীকরণ
চীনকে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখালেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
গত মে মাসে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করেন। আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তুতিও চলছে।
ট্রাম্প যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তথাকথিত ‘দুই শক্তির’ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন, তাতে ওয়াশিংটনে গত এক দশকে চীনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া দ্বিদলীয় কঠোর অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় এশিয়ার কিছু দেশ নিজেদের আরও একা মনে করছে। আবার চীন যেহেতু বহু দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, তাই তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রবণতাও বাড়ছে।
ফিলিপাইন বিকল্প অংশীদার খুঁজছে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক থাকলেও ফিলিপাইন এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্য অংশীদারদের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।
আগের মার্কিন প্রশাসন ফিলিপাইনের সঙ্গে ‘লুজন অর্থনৈতিক করিডর’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল দেশটির পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।
ট্রাম্প প্রশাসন আবার ফিলিপাইনকে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্প উৎপাদনের উদ্যোগে যুক্ত করতে চাইছে। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার এসব উদ্যোগ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার তুলনায় অনেক ছোট।
যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য দীর্ঘদিনের। স্পেনের কাছ থেকে ফিলিপাইন দখলের পর এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম উপনিবেশিক ঘাঁটি ছিল দেশটি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা একমাত্র দেশও ফিলিপাইন।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ম্যানিলায় বলেন, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান অব্যাহত রাখবে। আন্তর্জাতিক জলপথ কোনো দেশের একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
জাপানের সঙ্গে নতুন সামরিক সমীকরণ

চীনের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জাপানের সঙ্গেও সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।
জুনে ফিলিপাইনে বহুজাতিক সামরিক মহড়ায় জাপানকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ফিলিপাইনের মাটিতে জাপানি সেনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ঘটে।
এ উদ্যোগ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিলিপাইনের বিদ্যমান সামরিক জোটের ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরও বিস্তৃত করার কৌশল।
ফলে দক্ষিণ চীন সাগরকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু চীন ও ফিলিপাইনের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ, এশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জাপানসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা হিসাব।
সব মিলিয়ে এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চীনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু কূটনৈতিকভাবে পাশে থাকবে, নাকি প্রয়োজনের মুহূর্তে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি নিয়েও এগিয়ে আসবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















