আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পরও আতঙ্ক কাটেনি ন্যাটো ও পশ্চিমা বাহিনীকে সহায়তা করা বহু পরিবারের। ব্রিটেনে পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরও প্রায় ৩ হাজার আফগানকে নিজেদের খরচে আফগানিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থের অভাব, ভিসা জটিলতা এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে তাদের অনেকেই এখন দেশ ছাড়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
তালেবানের আতঙ্কে গোপন জীবন
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান কাবুল দখল করার সময় লায়লা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়া কিশোরী। তার বাবা নাদিম, নামটি নিরাপত্তার কারণে পরিবর্তিত, আফগানিস্তানের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থায় প্রায় ২০ বছর কাজ করেছিলেন। পশ্চিমা ও ন্যাটো বাহিনীর সহায়তায় দায়িত্ব পালন করায় তালেবানের চোখে তিনি সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে ওঠেন।
ক্ষমতা দখলের পর থেকেই পরিবারটি আত্মগোপনে রয়েছে। নাদিম এখন বেশিরভাগ সময় বাড়ির বেসমেন্টে থাকেন। খাবার সংগ্রহের প্রয়োজন ছাড়া খুব কমই বাইরে বের হন এবং বের হলে মুখ ঢেকে রাখেন।
লায়লা বলেন, প্রতিদিনই তাদের ভয় হয় তালেবান তাদের খুঁজে বের করে হত্যা করবে। আইনজীবী হওয়ার স্বপ্নও এখন তার কাছে অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

ডেটা ফাঁসের পর বাড়ে ঝুঁকি
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক অনিচ্ছাকৃত তথ্য ফাঁসের ঘটনায় হাজার হাজার আফগানের ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে। ব্রিটিশ সরকার আশঙ্কা করেছিল, এসব তথ্য তালেবানের হাতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এই ঘটনার পর প্রায় দুই বছর নজিরবিহীন গোপনীয়তা আদেশও বহাল ছিল।
নাদিম ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের আফগান পুনর্বাসন ও সহায়তা নীতির আওতায় আবেদন করেছিলেন। প্রায় তিন বছর কোনো খবর না পাওয়ার পর ২০২৪ সালের আগস্টে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে জানায়, তিনি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য যোগ্য।
পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাকে জানানো হয়, তথ্য ফাঁসের তালিকায় থাকার কারণেই তাকে আফগান রেসপন্স রুটের আওতায় ব্রিটেনে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তার স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজনকেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে নেওয়ার কথা ছিল।
তবে বাস্তবতা হলো, পরিবারের সবাইকে নিরাপদে বের করে আনার সরকারি সহায়তা এপ্রিলে বন্ধ হয়ে যায়।
নিজ খরচে পালানোর নির্দেশ

আগে তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় যোগ্য আফগানদের পাসপোর্ট ও ভিসা সংগ্রহ, সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে যাওয়া এবং সেখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এপ্রিলে এই ব্যবস্থা বাতিল করে জানায়, আফগানরা নিজেরাই দেশ ছাড়ার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
এর ফলে যোগ্য ব্যক্তিদের ১২ মাসের মধ্যে নিজেদের উদ্যোগে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে। অথচ অনেককে আগে স্বাধীনভাবে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বৈধ ও সাশ্রয়ী পথের অভাবও রয়েছে।
পাকিস্তানের ভিসার খরচ ব্যক্তি প্রতি ২ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। নাদিমের পরিবারের ক্ষেত্রে শুধু ভিসাতেই প্রায় ১০ হাজার ডলার প্রয়োজন। এরপর রয়েছে নিরাপদে দেশ পার হওয়ার ব্যয়।
আফগানিস্তান থেকে তাজিকিস্তানের মতো তৃতীয় দেশে পৌঁছাতে পারলেও তাদের নিজেদের হোটেল, যাতায়াত ও বায়োমেট্রিক পরীক্ষার খরচ বহন করতে হবে। যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
প্রতিশ্রুতির সঙ্গে নিরাপদ পথের দাবি
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও আফগান অধিকারকর্মী সারা দে ইয়ং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে আফগানিস্তান থেকে তাজিকিস্তানের ভিসা আবেদনকেন্দ্রে পৌঁছানোর সহায়তা পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাবেক ব্রিটিশ সেনা সহায়ক ও দোভাষী জামাল বারাকও বলেছেন, ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে জীবন ঝুঁকিতে ফেলা মানুষদের নিজেদের নিরাপত্তার পথ নিজেরাই খুঁজে নিতে বলা উদ্বেগজনক। তার মতে, আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতির অর্থ হওয়া উচিত নিরাপদে সেই আশ্রয়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা।
২০১৪ সালে ব্রিটিশ যুদ্ধসেনা প্রত্যাহারের পর থেকে ৪০ হাজারের বেশি আফগানকে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে, যাদের বড় অংশ ২০২১ সালের পূর্ণ প্রত্যাহারের পর এসেছে।
তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান, তৃতীয় কোনো দেশে এক বছরের মধ্যে পৌঁছাতে না পারলে এসব আফগানকে আর যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসন করা হবে না। মন্ত্রণালয় বলছে, ঝুঁকি ও করদাতার অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয় বিবেচনা করেই আফগানিস্তানের ভেতর থেকে চলাচলের সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে।
এদিকে নাদিমের মতো পরিবারগুলোর কাছে এই সিদ্ধান্তের অর্থ একটাই—তালেবানের ভয়ে লুকিয়ে থেকেও এখন নিরাপদে পালানোর সামর্থ্য নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট
তালেবানের ভয়ে আফগানিস্তানে আত্মগোপনে থাকা হাজারো পরিবার ব্রিটেনে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েও এখন নিজেদের খরচে পালানোর বাধ্যবাধকতায় পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















