রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেলেও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা থামাননি। বরং সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে রাশিয়া ন্যাটোর প্রতিরোধক্ষমতা ও রাজনৈতিক ঐক্য পরীক্ষা করে দেখার পথ বেছে নিতে পারে।
এটি সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বরং সীমান্তের কাছে সন্দেহজনক হামলা, সাইবার আক্রমণ, অবকাঠামোতে নাশকতা, পারমাণবিক হুমকি কিংবা ছদ্মবেশী বাহিনীর তৎপরতার মতো ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা চাপের মাধ্যমে মস্কো পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া যাচাই করতে পারে।
সম্প্রতি পোল্যান্ডের সীমান্তের ভেতরে একটি রুশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে। একই সময় জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরের একটি রানওয়েতে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোনও পাওয়া যায়। রাশিয়া ওই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে। এসব ঘটনা দুর্ঘটনাবশতও ঘটতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনকে ঘিরে রাশিয়ার সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ন্যাটো নিয়ে মস্কোর সম্ভাব্য পরিকল্পনার খবর একসঙ্গে বিবেচনা করলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
পুতিন কেন এখন এমন ঝুঁকি নিতে চাইবেন?
এর উত্তর ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান গতিপথে খুঁজে পাওয়া যায়। রাশিয়া বিপুল সামরিক ব্যয় করেও ইউক্রেনকে দ্রুত পরাজিত করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রতিরোধ, ড্রোন ব্যবহারের দক্ষতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অস্ত্র সহায়তা মস্কোর অগ্রযাত্রাকে আটকে রেখেছে।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে ইউক্রেনকে পশ্চিমা সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। যুক্তরাষ্ট্র আগের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে সমর্থন কমিয়ে আনলেও ইউরোপীয় দেশগুলো সহায়তার বড় অংশ বহন করছে। ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভয় দেখিয়ে, বিভক্ত করে কিংবা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে যদি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন দুর্বল করা যায়, তাহলে মস্কো আবার কৌশলগত সুবিধা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
এখানেই ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ।
সরাসরি আক্রমণের বদলে ‘ধূসর অঞ্চলের’ যুদ্ধ
ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পুতিনের জন্য আরও কার্যকর পথ হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড, যেগুলো যুদ্ধের সীমা স্পষ্টভাবে অতিক্রম না করেও ইউরোপীয় সমাজে আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করবে।
বিমানবন্দর, রেলপথ, জ্বালানি সরবরাহ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন অবকাঠামোর কাছে অস্ত্র বা ড্রোন পৌঁছে যাওয়া তার একটি অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার হামলার লক্ষ্য হতে পারে এমন সব ব্যবস্থা, যেগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন নির্ভরশীল—জ্বালানি বিতরণ, খাদ্য সরবরাহ, হাসপাতাল কিংবা অন্যান্য জরুরি সেবা।
সামরিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সাইবার সুরক্ষার আওতায় থাকলেও বিদ্যুৎ, পানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, তথ্যকেন্দ্র ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জায়গায় আঘাত হানতে পারলে রাশিয়া বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষ ছাড়াই ইউরোপীয় জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।
পারমাণবিক হুমকিও এই কৌশলের অংশ হতে পারে। গত কয়েক বছরে রুশ নেতৃত্ব বারবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা সামনে এনে পশ্চিমাদের সতর্ক করেছে। রাশিয়া পশ্চিমাঞ্চলে কিংবা বেলারুশে পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র সরিয়ে এনে তার দৃশ্যমান প্রদর্শন করলেও সেটি সামরিক আক্রমণের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার একটি উপায় হতে পারে।

বাল্টিক অঞ্চল হবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র
আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ার মতো ছোট বাল্টিক দেশগুলোতে। রাশিয়া যদি সরাসরি সেনা পাঠানোর পরিবর্তে বেসামরিক পোশাকে বিশেষ বাহিনী বা ছদ্মবেশী অপারেটর ব্যবহার করে পরিবহন, বিদ্যুৎ কিংবা যোগাযোগব্যবস্থায় নাশকতা চালায়, তাহলে ন্যাটোর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হবে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য শুধু ক্ষয়ক্ষতি করা নয়। মূল লক্ষ্য হতে পারে ন্যাটোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি পরীক্ষা করা। একটি সদস্যদেশে সীমিত হামলার পর পুরো জোট কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এই প্রশ্নের উত্তর মস্কো জানতে চাইতে পারে।
ন্যাটোর এখনই প্রস্তুত হওয়া দরকার
এই কারণেই ন্যাটোর উচিত পরিস্থিতিকে বড় সামরিক সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা। রাশিয়ার সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড নিয়ে জোটের রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে প্রকাশ্য আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় স্থলবাহিনী এবং মার্কিন গোয়েন্দা সক্ষমতাকে সমন্বিত করে বড় পরিসরের মহড়া আয়োজন করা প্রয়োজন।
সাইবার প্রতিরক্ষাকে এই প্রস্তুতির কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে। শুধু আক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা দেখালেই হবে না; প্রয়োজন হলে দ্রুত ও পরিমিত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও ন্যাটোকে প্রদর্শন করতে হবে।
কারণ প্রতিপক্ষ যদি মনে করে যে কোনো আক্রমণের জবাব দেওয়া হবে না, তাহলে সীমিত ঝুঁকি নেওয়ার প্রলোভন বাড়ে। বিপরীতে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মাত্রা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে একই পদক্ষেপ নেওয়ার আগে মস্কোকে হিসাব করতে হবে।

ন্যাটোর সামরিক শক্তি রাশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু শক্তি থাকা আর সেই শক্তিকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধে রূপান্তর করা এক বিষয় নয়। বাল্টিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষায় জোটের পরিকল্পনা নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। এতে মস্কোর কাছে পরিষ্কার বার্তা যাবে যে কোনো সীমিত আক্রমণও উপেক্ষা করা হবে না।
পুতিনের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ন্যাটোর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা। তাই পশ্চিমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হওয়া উচিত ঐক্য ধরে রাখা। রাশিয়া যদি দেখে যে ভয় দেখিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা যাচ্ছে না, তাহলে তার ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষার মূল্যও বেড়ে যাবে।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়া ন্যাটোর সরাসরি প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি। এখন তাই দরজা ভাঙার বদলে দরজার দুর্বল পাশ খুঁজে দেখা তার কৌশল হতে পারে। সেই দুর্বলতা যদি রাজনৈতিক বিভাজন, সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি কিংবা সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা হয়, তাহলে ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সেগুলো আগেই বন্ধ করা।
মস্কোকে এমন কোনো ভুল হিসাব করার সুযোগ দেওয়া যাবে না, যাতে সীমিত উসকানি ধীরে ধীরে বড় সংঘাতে রূপ নেয়। শক্তি দেখানোর অর্থ যুদ্ধ শুরু করা নয়; বরং এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ তৈরি করা, যাতে প্রতিপক্ষ যুদ্ধের পথে এগোনোর আগেই বুঝতে পারে—এই পথে লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি।
জেমস স্টাভরিডিস 



















