ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের ফ্লোরেস দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। শনিবার ভোরে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৪৮ জন নিহত এবং ১০১ জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি বাড়িঘর ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা। ভূমিকম্পের পর কয়েক ঘণ্টায় ৩৪১টি পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
প্রায় ৫ হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অন্তত একটি জরুরি সড়কও এখনো চলাচলের অনুপযোগী। ফলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট
উত্তর ফ্লোরেসের নাঙ্গাহালে গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খাবার, পানীয়, ওষুধ ও শিশুদের জন্য ডায়াপারের জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। আতঙ্কিত অনেক মানুষ বাড়িতে ফিরতে সাহস করছেন না। কেউ কেউ পাহাড়ি এলাকায় রাত কাটাচ্ছেন, কারণ পরাঘাতের আশঙ্কায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৫৫ বছর বয়সী নুরহিদায়াতি জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর থেকে তিনি আতঙ্কে রয়েছেন। ১৯৯২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতিও তার ভয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই বছর ফ্লোরেসে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর সুনামিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।

দুর্গতদের জন্য এখন জরুরি তাঁবু, খাবার, ওষুধ, কম্বল, ক্যাম্পবেড, মাদুর, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎ জেনারেটর প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা।
বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র বের্টন সুয়ার পেলিতা পাঞ্জাইতানের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৯১৪টি বাড়ি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েক শ বাড়ি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির শিকার হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৩৬টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ৩৮টি সরকারি কার্যালয়। প্রাদেশিক সরকার আগামী ১৪ দিনের জন্য জরুরি পরিস্থিতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তুতি
দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজারো মানুষের জন্য সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া সরকার দুর্গত এলাকায় ৫০ হাজার প্যাকেট ত্রাণ পাঠিয়েছে, যার মোট ওজন প্রায় ২৭৫ টন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সহায়তার প্রস্তাব এসেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ইউরোপের কোপার্নিকাস আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর প্রস্তুতি রয়েছে।
সুনামির আশঙ্কা কেটে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি
ভূমিকম্পের পর ফ্লোরেসের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের পানি সরে যেতে দেখে অনেক বাসিন্দা পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। এটি সম্ভাব্য সুনামির লক্ষণ হিসেবে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। পরে সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও উপকূলের কিছু এলাকায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৬ মিটার উচ্চতার ঢেউ রেকর্ড করা হয়েছে।
ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল ফ্লোরেসের উত্তর উপকূলের অদূরে অগভীর সমুদ্র এলাকায়। ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত হওয়ায় দেশটিতে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। ২০০৪ সালে সুমাত্রার উপকূলের কাছে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট সুনামিতে ইন্দোনেশিয়াসহ পুরো অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল, যাদের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজারই ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার।
ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন নিখোঁজ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের সন্ধানের পাশাপাশি দুর্গতদের জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফ্লোরেস ভূমিকম্পে ৫ হাজার মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে; ৪৮ জনের মৃত্যু ও ১০১ জন আহত হয়েছেন। দুর্গত এলাকায় খাবার, পানি, ওষুধ ও বিদ্যুতের জরুরি সংকট দেখা দিয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















