পোপ লিও চতুর্দশের নিজের শহরের একটি বেসবল দলের প্রতি ভালোবাসা যেন হঠাৎ করেই শিকাগো হোয়াইট সক্সকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, মাঠে একের পর এক হার এবং দর্শকখরা পেরিয়ে দলটি এখন নিজেদের ভাগ্য বদলানোর গল্প বলছে। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পোপ লিও চতুর্দশ—যিনি শুধু শিকাগোর মানুষই নন, তিনি হোয়াইট সক্সের একজন ভক্তও।
শিকাগো হোয়াইট সক্সের মাঠ রেট ফিল্ডে ২০০৫ সালে পোপ লিও চতুর্দশ যে আসনে বসে দলের খেলা দেখেছিলেন, এখন সেখানে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মাঠের কাছে দেয়ালে আঁকা হয়েছে পোপের একটি বিশাল ছবি। পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর গত বছর এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল একটি উন্মুক্ত ধর্মীয় প্রার্থনা অনুষ্ঠান। আর সাম্প্রতিক এক খেলায় প্রায় ৪০ হাজার দর্শক মাথায় পরেছিলেন পোপের পোশাকের বিশেষ টুপি।
পোপ নির্বাচিত হওয়ার পরই বদলে গেল গল্প
২০২৫ সালের ৮ মে। শিকাগো হোয়াইট সক্সের প্রচার ও বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মাইক ডাউনি সেদিন কাজের ফাঁকে স্টেডিয়ামের তৃতীয় তলার খাবারঘরে গিয়েছিলেন। সেখানে টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো হচ্ছিল ভ্যাটিকানে নতুন পোপ নির্বাচনের খবর।
ডাউনি আজীবন ক্যাথলিক। তাই খবরটি শুনে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও তথ্য খুঁজতে শুরু করেন। প্রথমেই জানতে পারলেন, নতুন পোপ একজন আমেরিকান। গির্জার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো আমেরিকান পোপ হলেন।
তারপর আরও চমক।
পোপ শিকাগোর মানুষ।
ডাউনি ভাবলেন, ব্যাপারটি দারুণ। কিন্তু একটু পরেই জানতে পারলেন, পোপ আসলে শিকাগো শহরের ঠিক ভেতরের মানুষ নন; তিনি শহরের দক্ষিণের একটি উপশহর থেকে এসেছেন। তখন তার মনে হলো, ‘আমি কি তাকে চিনি?’
এরপর ছড়িয়ে পড়ল আরেক খবর—নতুন পোপ নাকি শিকাগো কাবসের ভক্ত। কাবস হলো হোয়াইট সক্সের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল, যারা শহরের উত্তরাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
কাবস কর্তৃপক্ষ আর দেরি করেনি। তারা স্টেডিয়ামের বিশাল বিজ্ঞাপনফলকে লিখে দিল, ‘শিকাগো, তিনি কাবসের ভক্ত!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পোপের ছবি দিয়ে সেই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হলো।
হোয়াইট সক্সের কার্যালয়ে তখন হতাশা। কর্মকর্তারা ভাবছিলেন, এমন সুযোগও বুঝি প্রতিদ্বন্দ্বী দলটি নিয়ে নিল। দক্ষিণ শিকাগোর মানুষ হয়েও যদি পোপ কাবসের সমর্থক হন, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!
কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এল নাটকীয় পাল্টা খবর।

পোপের ভাই জানালেন, না, আসলে পোপ লিও চতুর্দশ হোয়াইট সক্সেরই ভক্ত।
এই খবর শুনে ডাউনি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এতদিন ধরে শিকাগোবাসীকে দুর্বল দলটির খেলা দেখতে মাঠে আনার কঠিন দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে একটি চিন্তা এলো—এটাই তো সুযোগ!
তার নিজের ভাষায়, প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘হে ঈশ্বর!’
ভয়াবহ ব্যর্থতার মাঝখানে পোপ যেন আশীর্বাদ
২০২৪ সালে হোয়াইট সক্স আধুনিক যুগের বড় লিগ বেসবলের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বাধিক হারের রেকর্ড গড়ে ১২১টি ম্যাচ হেরেছিল। ২০২৫ মৌসুম শুরু হওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পরও দলটি আমেরিকান লিগের মধ্যাঞ্চলীয় বিভাগে শেষ স্থানটি শক্ত করে ধরে রেখেছিল।
দুই মৌসুমেই তাদের ঘরের মাঠে গড় দর্শকসংখ্যা ছিল পুরো বড় লিগের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন।
ডাউনি ও তার সহকর্মীদের কাজ ছিল এমন হতাশার মধ্যেও দর্শকদের সামনে আনন্দের কোনো কারণ হাজির করা। ২০২৫ সালে দলের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তারা নানা ধরনের প্রচারণার পরিকল্পনা করেছিল।
ছিল নরম কম্বল, ১৯০৭ সালের পুরোনো পোশাকের আদলে তৈরি বিশেষ জার্সি, ১৯৭২ সালের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় ডিক অ্যালেনের ছোট মূর্তি এবং দলের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রধান মাঠ কমিসকি পার্কের আদলে তৈরি একটি কার্যকর রেডিও।
ডাউনি পরে বলেন, এসবের একটি উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে আগের বছরের ভয়াবহ ফলাফল ভুলিয়ে রাখা।
পোপ নির্বাচিত হওয়ার দিনও হোয়াইট সক্স তার দীর্ঘদিনের সমর্থনের বিনিময়ে কোনো জয় উপহার দিতে পারেনি। বরং কানসাস সিটি রয়্যালসের কাছে তারা ১০-০ ব্যবধানে হেরে যায়।
তবু পোপের ভক্তি দলটির জন্য একেবারে নতুন একটি প্রচারণার দরজা খুলে দেয়।
পোপ যে হোয়াইট সক্সেরই সমর্থক, তা নিশ্চিত হওয়ার পর দলটি বিষয়টি আর গোপন রাখেনি। কাবসের আগের বার্তাকে মজার ছলে সংশোধন করে হোয়াইট সক্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের স্কোরবোর্ডের ছবি প্রকাশ করে লিখল, ‘শিকাগো, তিনি সক্সের ভক্ত!’

এর ফলও দ্রুত দেখা গেল। পরের এক সপ্তাহে দলের প্রধান বেসবল টুপির বিক্রি বেড়ে গেল ৩৩ শতাংশ। বছরের শেষ নাগাদ হোয়াইট সক্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া ১০টি পোস্টের মধ্যে তিনটির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে পোপের সম্পর্ক ছিল।
তবে এগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন প্রচারণা। সেন্ট পিটারের ২৬৬তম উত্তরসূরিকে নিজেদের সমর্থক হিসেবে পাওয়া যখন নিশ্চিত হলো, তখন ডাউনি ও তার সহকর্মীরা আরও বড় পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন।
মাঠে পোপের স্মৃতি
দলের নকশা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্টেডিয়ামের ১৪০ ও ১৪১ নম্বর গ্যালারির মাঝের দেয়ালের জন্য পোপের একটি বিশাল চিত্র তৈরি করলেন।
চিত্রটির ওপরের ডানদিকে রাখা হলো ২০০৫ সালের বিশ্ব সিরিজের প্রথম ম্যাচের একটি টেলিভিশন দৃশ্যের ছোট ছবি। তখন পোপ লিও ছিলেন সেন্ট অগাস্টিনের ধর্মীয় সংঘের নেতা। ম্যাচের শেষ আউটের সময় ক্যামেরায় তাকে দেখা গিয়েছিল।
যে আসনে বসে তিনি সেই ম্যাচ দেখেছিলেন, সেটিকেও বিশেষ স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করা হলো।
এরপর হোয়াইট সক্সের লক্ষ্য হলো পোপকে অন্তত প্রতীকীভাবে আবার স্টেডিয়ামে ফিরিয়ে আনা।
পোপের প্রার্থনায় ৩৫ হাজার মানুষের সমাবেশ
শিকাগোতে ক্যাথলিক জনগোষ্ঠী বড়। শিকাগোর ধর্মীয় প্রশাসনিক অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, শহরের ৫৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিজেদের খ্রিষ্টান হিসেবে পরিচয় দেন এবং ২৯ শতাংশ বলেন তারা ক্যাথলিক। কোনো একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এই হারই সর্বোচ্চ।
হোয়াইট সক্সের মাঠে কর্মীদের জন্য ছোট আকারের ধর্মীয় প্রার্থনা অনুষ্ঠানও হয়ে আসছে ৩০ বছর ধরে। মাঠের নিচতলার আতিথেয়তা এলাকার দায়িত্বে থাকা বারতুচ্চি পরিবার সেই আয়োজন শুরু করেছিল এবং এখনো তা পরিচালনা করে।

পোপ নির্বাচিত হওয়ার এক মাস পর হোয়াইট সক্স শিকাগোর ধর্মীয় প্রশাসনের সঙ্গে মিলে রেট ফিল্ডে একটি উন্মুক্ত প্রার্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার টিকিট বিক্রি হয়। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র ৫ ডলার। অথচ সেই মৌসুমে হোয়াইট সক্সের একটি খেলায় গড় দর্শকসংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৮৪৯ জন।
পরবর্তী সময়ে কিছু টিকিট পুনর্বিক্রয়ের বাজারে এক হাজার ডলারেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল।
দলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ব্রুকস বয়ার নিজেও একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক। পোপের সঙ্গে দলের কোনো ধরনের সম্পর্ক তৈরি হওয়াকে তিনি অসাধারণ ব্যাপার হিসেবে দেখছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, শিকাগোর মেয়ররা হোয়াইট সক্সের ভক্ত হয়েছেন, ইলিনয়ের গভর্নররা ভক্ত হয়েছেন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও দলের সমর্থক ছিলেন।
তিনি যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তখন মেয়রের চেয়ে বড় কোনো পর্যায়ে ওঠার কথা ভাবেননি। কিন্তু এখন যেন তারা ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে উঠতে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছেন, যেখানে পরবর্তী ধাপটি কী—তা ভাবাই কঠিন।
তার ভাষায়, মনে হচ্ছিল তারা ঈশ্বরের কাছ থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে।
পোপের প্রথম আমেরিকান বার্তা
পোপ রেট ফিল্ডের অনুষ্ঠানের জন্য আট মিনিটের একটি ধারণকৃত বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের উদ্দেশে সেটিই ছিল তার প্রথম বক্তব্য।
বক্তব্যের বড় অংশ ছিল তরুণদের উদ্দেশে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তরুণেরা যে বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, পোপ তা স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, তারা এখনো আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত হওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তবে একটি বিষয় নিয়ে হোয়াইট সক্স ভক্তরা বিশেষভাবে আনন্দ পেয়েছিলেন।
পোপ মাঠটির নাম ‘রেট ফিল্ড’ না বলে বলেছিলেন ‘হোয়াইট সক্স পার্ক’।
পোপের ছোট মূর্তি বানানোর পরিকল্পনা
খেলাধুলার দলগুলোর প্রচারণায় ছোট দুলতে থাকা মাথার মূর্তি দেওয়া এখন অত্যন্ত পরিচিত ব্যাপার। সেটিতে যে ব্যক্তির মাথা থাকবে তিনি দলের খেলোয়াড় হতেই হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
আটলান্টা ব্রেভস যেমন দুইবার বিগ বয় ও আন্দ্রে থ্রি থাউজেন্ডকে নিয়ে বিশেষ মূর্তি দিয়েছিল, যেখানে তারা লাল রঙের একটি গাড়িতে বসে ছিলেন। নিউ ইয়র্ক ইয়াঙ্কিসও জর্জ কস্তানজাকে নিয়ে তৃতীয় সংস্করণের একটি মূর্তি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তাই পোপ লিওর মূর্তি বানানোর চিন্তা হোয়াইট সক্সের মাথায় আসা ছিল প্রায় অনিবার্য।

পোপ নির্বাচিত হওয়ার দিনই ডাউনি দলের মূর্তি প্রস্তুতকারককে ফোন করেন। প্রথমে চারটি নমুনা তৈরি করতে বলা হয়। সেখানে পোপকে তার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পোশাকে দেখানো হয়, আর তার বুকে রাখা থাকে হোয়াইট সক্সের টুপি।
পরে পোপকে হোয়াইট সক্সের টুপি পরা অবস্থায় দেখা একটি ছবির ভিত্তিতেও আরও চারটি নমুনা তৈরি করা হয়।
ডাউনি সেগুলো বয়ারকে দেখান। বয়ার স্টেডিয়ামের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় দুটি নমুনা শিকাগোর ধর্মীয় প্রশাসনের প্রধান কার্ডিনাল ব্লেজ কাপিচকে দেন।
তার আশা ছিল, কার্ডিনাল পরবর্তীবার ভ্যাটিকানে গেলে মূর্তিগুলো যথাযথ ব্যক্তিদের দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
বয়ার স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ভ্যাটিকানের অনুমতি ছাড়া তারা পোপের অবয়ব ব্যবহার করতে চান না।
ডাউনি অবশ্য নিশ্চিত ছিলেন, ভ্যাটিকান শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেবে।
কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে মাসের পর মাস কেটে গেল।
তার ভাষায়, এরপর আর কোনো খবরই এল না। এক মাস গেল, তারপর আরেক মাস। কিছুই হলো না।
ভ্যাটিকান শেষ পর্যন্ত বলল, তারা আগ্রহী নয়
গত বছরের নভেম্বর মাসে ডাউনি নিজের বিয়েতে যিনি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনা করেছিলেন, সেই ফাদার টম হার্লিকে ই-মেইল করেন। পোপের মূর্তির অনুমোদন পাওয়ার জন্য সেটিই ছিল তার শেষ চেষ্টা।
ফাদার হার্লি তাকে আরেক ধর্মযাজকের কাছে পাঠান—ফাদার টম ম্যাকার্থির কাছে। তিনি শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা এবং পোপ লিওর মতোই সেন্ট অগাস্টিনের ধর্মীয় সংঘের সদস্য।
ম্যাকার্থির নিজেরও হোয়াইট সক্সের প্রতি গভীর টান রয়েছে। তার মা দলের পুরোনো স্টেডিয়ামে একটি মাংসের খাবারের দোকানে কাজ করতেন। বাবার সঙ্গে তিনি ছোটবেলায় বহুবার খেলা দেখতে গিয়েছেন।
ম্যাকার্থি জানান, পোপ লিওকে তিনি ৩৫ বছর ধরে চেনেন। তবে এখন আর সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নেই।
তাই তিনি ভ্যাটিকানের যোগাযোগ দপ্তরে ই-মেইল করেন।
উত্তর এসেছিল। কিন্তু উত্তরটি ছিল সরাসরি—তারা আগ্রহী নয়।
ম্যাকার্থি হেসে বলেন, সম্ভবত তারা মনে করেন এ ধরনের মূর্তি পোপের প্রতি অসম্মানজনক।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ সাধারণত বোঝে, এ ধরনের মূর্তি আসলে প্রশংসা ও ভালোবাসার প্রকাশও হতে পারে।
হোয়াইট সক্স কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা শিকাগোর ধর্মীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ভ্যাটিকানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে ধর্মীয় প্রশাসনের এক মুখপাত্র বলেন, হোয়াইট সক্স ব্যক্তিগত কোনো প্রচারণার জন্য অনুমোদন চায় না এবং ধর্মীয় প্রশাসনও এ ধরনের প্রচারণায় অনুমোদন দেয় না।
ফলে হোয়াইট সক্সের পোপের ছোট মূর্তি আর তৈরি হয়ে বাজারে আসেনি।
পোপের টুপি নিয়ে উন্মাদনা
ডাউনির আরেকটি পরিকল্পনা ছিল আরও বড়। তিনি দর্শকদের ‘পুরো পোপের পোশাক’ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন—বিশেষ টুপি, পোশাক ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার চাদরসহ।
তিনি বিষয়টি ফাদার হার্লির সঙ্গে আলোচনা করলে ধর্মযাজক পরামর্শ দেন, শুধু টুপিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে।
এরপর হোয়াইট সক্স গত মঙ্গলবার সিনসিনাটি রেডসের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য বিশেষ টিকিট কেনা দর্শকদের মধ্যে ১ হাজার ৫০০টি পোপের টুপি দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
টিকিট এত দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় যে আরও ৫০০টি টিকিট যোগ করতে হয়।
তারপর আরও ৫০০টি।
শেষ পর্যন্ত ডাউনি ও বিপণন ও বিজ্ঞাপন বিভাগের সহসভাপতি গ্যারেথ ব্রুনলিন দলের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা বয়ারের কাছে কিছুটা সংকোচের সঙ্গে প্রস্তাব রাখেন—ম্যাচে আসা প্রত্যেক দর্শককেই যদি টুপি দেওয়া হয়?
ডাউনি তখন বলেছিলেন, ‘পোপের টুপি পাগলের মতো জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে।’
বয়ার সম্মতি দেন।
ফলে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ সেদিন মাথায় পোপের বিশেষ টুপি পরে স্টেডিয়ামে বসেন।
তাহলে কি পোপের আশীর্বাদেই বদলে গেল দলটির ভাগ্য?
পোপের বেসবল পছন্দ নিয়ে এমন একটি প্রতিবেদনে ঈশ্বরের বেসবল-পছন্দ নিয়ে রসিকতা করা সহজ। কিন্তু হোয়াইট সক্সের বর্তমান সাফল্য এমন প্রশ্নের সুযোগও তৈরি করেছে।
গত বছর দলটি ১০২টি ম্যাচ হেরে বিভাগে সবার নিচে শেষ করেছিল।
এ বছর সেই একই দল এখন নিজেদের বিভাগে প্রথম স্থানে।
কেউ অবশ্য বলছে না যে ঈশ্বর হোয়াইট সক্সের সমর্থক।
তবে কেউ এটাও বলছে না যে তিনি নন।
গত ২৬ জুন কানসাস সিটি রয়্যালসের বিপক্ষে এক ম্যাচে দলের সম্প্রচার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য পিচার মাইক ভাসিলের গায়ে একটি শব্দ ধারণের যন্ত্র ছিল।
ক্যাথলিক দলের ক্যাচার ড্রু রোমো তখন ডাগআউট থেকে তার কাছে এগিয়ে আসেন।
তিনি যন্ত্রটির সামনে মজা করে বলেন, পোপ লিও যদি এখন ম্যাচটি দেখে থাকেন, তাহলে যেন জ্যাকব গনজালেসের একটি হোম রান হওয়ার জন্য দ্রুত প্রার্থনা করেন।
কয়েক সেকেন্ড পরই গনজালেস রেট ফিল্ডে তার প্রথম হোম রান করেন।
ভাসিল চিৎকার করে ওঠেন, ‘এটা কাজ করছে, লিও!’
সেদিন হোয়াইট সক্স মোট ২২ রান করে। ১৯৭০ সালের পর এক ম্যাচে এটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ রান।
রোমো পরে বলেন, তিনি বিষয়টি মজা করেই করেছিলেন, কিন্তু এর মধ্যে কিছুটা বিশ্বাসও ছিল। পোপ যদি সত্যিই ম্যাচটি দেখে থাকেন, তাহলে তার প্রার্থনা দলের কাজে আসতে পারে।
পোপ জানতেন, হোয়াইট সক্স প্রথম স্থানে
পোপ যদি সেই ম্যাচ সরাসরি না-ও দেখে থাকেন, পরদিন যে ঘটনাটি তার কানে পৌঁছেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
জুনের শেষ দিকে ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়ন হোয়াইট সক্স দলের অন্যতম তারকা এ জে পিয়েরজিনস্কি পোপ লিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তিনি পোপকে জানান, হোয়াইট সক্স এখন তাদের বিভাগে প্রথম স্থানে।
পোপ জবাব দেন, তিনি ইতিমধ্যেই তা জানেন।
পিয়েরজিনস্কি তাকে ২০০৫ সালের বিশ্ব সিরিজের সেই ম্যাচের শেষ আউটের বলটিও উপহার দেন, যে ম্যাচটি পোপ নিজে স্টেডিয়ামে বসে দেখেছিলেন।
পিয়েরজিনস্কি বলেন, পোপের কাছে অসংখ্য জার্সি পৌঁছায়। কিন্তু তার হাতে ছিল এমন একটি জিনিস, যা পোপ নিজে কখনো পেতে পারতেন না।
তার ধারণা, নিজের দেয়ালে বলটি ঝুলিয়ে রাখার চেয়ে পোপের কাছে এর মূল্য আরও বেশি।
প্রতিপক্ষও পোপের দেয়াল খুঁজে আশীর্বাদ চায়
কয়েক সপ্তাহ পর টানা ছয় ম্যাচ হেরে থাকা অ্যাথলেটিক্স দল হোয়াইট সক্সের মাঠে আসে।
অ্যাথলেটিক্সের ব্যবস্থাপক মার্ক কটসিও একজন ক্যাথলিক। তিনি স্টেডিয়ামে এসে পোপ লিওর দেয়ালচিত্রটি খুঁজে বের করেন।
তিনি বলেন, তিনি সেখানে শান্তির জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।
আর হ্যাঁ, ভাগ্য বদলের জন্যও।
কিন্তু তার ক্ষেত্রে প্রার্থনা কাজে লাগেনি।
অ্যাথলেটিক্স পরের চারটি ম্যাচ হারে। এর মধ্যে হোয়াইট সক্সের বিপক্ষে তিনটিই ছিল।
এদিকে হোয়াইট সক্সের সাফল্য দেখে দর্শকরাও আবার মাঠে ফিরতে শুরু করেছেন। চলতি মৌসুমে প্রতি ম্যাচে দলটি ২০২৫ সালের তুলনায় গড়ে প্রায় ৬ হাজার বেশি দর্শক টানছে।
‘এটাই এই পোপের প্রথম ধর্মদ্রোহিতা’
সম্প্রতি পোপ লিও যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাটিকান-সংক্রান্ত রাষ্ট্রদূত ব্রায়ান বার্চের সঙ্গে নৈশভোজ করেন।
বার্চও শিকাগোর মানুষ। তবে তিনি কাবসের ভক্ত।
এক সাক্ষাৎকারে রসিকতা করে তিনি বলেন, হোয়াইট সক্সের প্রতি পোপের সমর্থনই এই পোপের কার্যকালের ‘প্রথম ধর্মদ্রোহিতা’।
তবে তার মতে, পোপের এই খেলাধুলার ভক্তি আসলে তার আমেরিকান শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বার্চ বলেন, মানুষ সাধারণত পোপকে এমন একজন আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে কল্পনা করে, যিনি যেন অন্য এক জগতের মানুষ।
কিন্তু তিনি প্রথম আমেরিকান পোপ। আর তিনি আমেরিকানদের মতোই নিজের শহরের বেসবল দলকে সমর্থন করেন—শুধু সমর্থনই করেন না, তিনি অত্যন্ত নিবেদিত একজন ভক্ত।
ফলে তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের এমন এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা এর আগে পোপের পদটির সঙ্গে সম্ভব হয়নি।
ডেস্কের ওপর এখনো পড়ে আছে সেই মূর্তিগুলো
ডাউনি এখনো রেট ফিল্ডে নিজের ডেস্কের ওপর পোপের তৈরি করা ছোট মূর্তিগুলোর নমুনা রেখে দিয়েছেন।
হোয়াইট সক্স কর্তৃপক্ষ অবশ্য সেগুলোর ছবি তুলতে দেয় না। কারণ তারা আশঙ্কা করে, ছবিগুলো প্রকাশিত হলে গির্জার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবু ডাউনি অপেক্ষায় আছেন।
কখনো যদি ভ্যাটিকান মত বদলায়, তিনি প্রস্তুত।
আর তখন হয়তো শিকাগোর হোয়াইট সক্সের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত, সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে প্রতীকী প্রচারণার জন্ম হবে—একজন পোপ, যিনি শুধু শিকাগোর সন্তান নন, দলের একজন একনিষ্ঠ ভক্তও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















