বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাছ তিমি হাঙর। বিশাল আকৃতির এই সামুদ্রিক প্রাণী সমুদ্রের উন্মুক্ত জলরাশিতে হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরে বেড়ালেও তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি রহস্য এখনো অমীমাংসিত—তারা কোথায় জন্ম নেয়?
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সুম্বাওয়া দ্বীপের সালেহ উপসাগরে মাত্র চার মাস বয়সী একটি তিমি হাঙরের সন্ধান সেই রহস্যের সমাধানে বিজ্ঞানীদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র তুলে ধরেছে। মাত্র দেড় মিটার লম্বা এই নবজাতক তিমি হাঙরটি ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় এ ধরনের প্রথম নথিবদ্ধ আবিষ্কার এবং বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের নথিতে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি নবজাতক তিমি হাঙরের একটি।
জেলেদের জালে ধরা পড়ল বিরল প্রাণী
২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে চারটার কিছু পর সালেহ উপসাগরে মাছ ধরার সময় স্থানীয় জেলেরা জালের মধ্যে অস্বাভাবিক একটি প্রাণী দেখতে পান। রাতের বেলায় তারা ভাসমান মাছ ধরার কাঠামো থেকে আলো ফেলে মাছ আকর্ষণ করছিলেন। সেই সময় তাদের নজরে আসে প্রশস্ত মুখ, কালচে শরীর ও সাদা ছোপে ভরা একটি ছোট তিমি হাঙর।
প্রাণীটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় দেড় মিটার। পূর্ণবয়স্ক তিমি হাঙরের তুলনায় এটি প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক চার মাস। এত অল্প বয়সের তিমি হাঙর খুবই বিরলভাবে মানুষের নজরে আসে।
জন্মস্থান কি সালেহ উপসাগরেই?

সালেহ উপসাগরটি প্রায় আবদ্ধ একটি জলভূমি। সরু একটি জলপথ দিয়ে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি এখানে প্রবেশ করে। চারপাশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের কারণে উপসাগরে প্রচুর ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও খাদ্য পাওয়া যায়।
এই বিপুল খাদ্যভাণ্ডার মাছ ধরার স্থানীয় মানুষদের যেমন আকর্ষণ করে, তেমনি তিমি হাঙরকেও টানে। বিশেষ করে অল্পবয়সী তিমি হাঙরের জন্য উপসাগরটি বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এখানে প্রচুর খাদ্য থাকায় তাদের কম পরিশ্রমে শক্তি ও ওজন বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে খোলা সমুদ্রের তুলনায় এ ধরনের আশ্রয়স্থলে শিকারির আক্রমণের ঝুঁকিও কম হতে পারে।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী মোচামাদ ইকবাল হারওয়াতা পুত্রার ধারণা, সালেহ উপসাগর হয়তো তিমি হাঙরের জন্মস্থান অথবা জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তবে নবজাতকটি সত্যিই এখানেই জন্মেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বরং অন্য কোথাও জন্ম নিয়ে পরে এটি সালেহ উপসাগরে এসে থাকতে পারে বলেও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
তিমি হাঙরের জন্মরহস্য এখনো অমীমাংসিত
তিমি হাঙর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাছ। পূর্ণবয়স্ক একটি তিমি হাঙরের ওজন ছয়টি হাতির সমান পর্যন্ত হতে পারে। তারা কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর সমুদ্রে বিচরণ করছে। অথচ এত বিশাল ও পরিচিত প্রাণীটির প্রজনন ও জন্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো সীমিত।
আজ পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী তিমি হাঙরের মিলন বা সরাসরি সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পারেননি। নতুন আবিষ্কৃত নবজাতকটি তাই তাদের জন্মস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
‘মেগামামা’ খুলেছিল প্রজননের দরজা
তিমি হাঙরের প্রজনন সম্পর্কে বড় ধরনের তথ্য পাওয়া যায় ১৯৯৫ সালে তাইওয়ানে। তখন প্রায় ১০ মিটার দীর্ঘ একটি স্ত্রী তিমি হাঙর স্থানীয় জেলেদের শিকারে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানীরা তার দেহ পরীক্ষা করে দেখতে পান, দুটি জরায়ুর মধ্যে মোট ৩০৪টি নিষিক্ত ডিম ও ভ্রূণ রয়েছে।

এই আবিষ্কার থেকে জানা যায়, তিমি হাঙর ডিম পাড়ে না; বরং ডিম শরীরের ভেতরেই ফুটে যায় এবং পরে জীবন্ত, স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটতে সক্ষম বাচ্চা জন্ম নেয়। ওই স্ত্রী হাঙরটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মেগামামা’। কোনো হাঙর প্রজাতির ক্ষেত্রে একসঙ্গে এত বেশি বাচ্চার প্রমাণ এর আগে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তী বংশগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভ্রূণ ও বাচ্চাগুলোর পিতা একই। এতে ধারণা আরও শক্ত হয় যে মা তিমি হাঙর দীর্ঘ সময় ধরে শুক্রাণু সংরক্ষণ করে বিভিন্ন সময়ে ডিম নিষিক্ত করতে পারে। ৩০৪টির মধ্যে ১৫টি বাচ্চা তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন তারা বেঁচে থাকতে সক্ষম ছিল। এর মধ্যে দুটি বাচ্চাকে জাপান ও তাইওয়ানের জলজ প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রে জীবিত রাখা হয়েছিল।
মাত্র ৩৩টি নবজাতকের সন্ধান
বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩৩টি নবজাতক তিমি হাঙর নথিবদ্ধ করতে পেরেছেন। আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আরব সাগর এবং পাকিস্তান থেকে গ্যালাপাগোস পর্যন্ত বিভিন্ন উষ্ণ সমুদ্র অঞ্চলে তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
গবেষক ফ্রেয়া ওমার্সলি এসব অবস্থানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য মিল খুঁজে পেয়েছেন। অনেক নবজাতক তিমি হাঙর এমন সমুদ্রাঞ্চলে দেখা গেছে, যেখানে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম।
অক্সিজেনস্বল্প অঞ্চলই কি নবজাতকদের নিরাপদ আশ্রয়?
বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, সমুদ্রের অক্সিজেনস্বল্প স্তর নবজাতক তিমি হাঙরের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক আড়াল হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব অঞ্চলে নীল হাঙর ও মার্লিনের মতো অনেক শিকারি প্রাণী সাধারণত যায় না।
একই সঙ্গে অক্সিজেনস্বল্প স্তরের সীমানায় প্রচুর ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী ও প্ল্যাঙ্কটন জমা হতে পারে। ফলে নবজাতক তিমি হাঙর সেখানে নিরাপদ থাকার পাশাপাশি সহজেই খাবারও পেতে পারে।

অর্থাৎ, মা তিমি হাঙর হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন জায়গা বেছে নেয়, যেখানে বাচ্চারা শিকারির হাত থেকে তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে এবং পর্যাপ্ত খাবার পাবে। তবে এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা, নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা দৈত্য
তিমি হাঙরের অস্তিত্ব এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে প্রতি বছর শত শত তিমি হাঙর মাংস ও পাখনার জন্য হত্যা করা হতো। পরবর্তী সময়েও শিকার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং অবৈধ মাছ ধরার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে তিমি হাঙরের সংখ্যা ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। বর্তমানে প্রাণীটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। জলবায়ু পরিবর্তন, মাছ ধরা ও সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলও তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বদলে যাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি
সালেহ উপসাগরেও একসময় স্থানীয় জেলেদের মধ্যে তিমি হাঙর নিয়ে ভয় ও বিরূপ মনোভাব ছিল। বিশাল আকৃতির এই প্রাণীকে তারা মাছের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন। কিন্তু এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
তিমি হাঙরকে ঘিরে পর্যটন বাড়ছে। স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও পানির নিচে সাঁতার কাটা ও তিমি হাঙর দেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে একসময় যে প্রাণীকে হুমকি হিসেবে দেখা হতো, সেটিই এখন স্থানীয় অর্থনীতি ও প্রকৃতি সংরক্ষণের সম্ভাব্য সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

তৈরি হতে পারে বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা
সালেহ উপসাগরের উত্তরে তিমি হাঙর রক্ষার জন্য একটি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ইন্দোনেশিয়ায় তিমি হাঙর সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সংরক্ষিত এলাকা হবে।
এখন পর্যন্ত সালেহ উপসাগরে ২৫টি তিমি হাঙরের শরীরে অনুসরণকারী যন্ত্র বসানো হয়েছে। দেখা গেছে, তাদের বেশির ভাগই অধিকাংশ সময় উপসাগর ও আশপাশের এলাকায় থাকে। মাঝে মাঝে বাইরে গেলেও সারা বছর পাওয়া খাদ্যের টানে আবার ফিরে আসে।
তাই নবজাতক তিমি হাঙরের এই বিরল সন্ধান শুধু একটি নতুন প্রাণী দেখার ঘটনা নয়। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্ম ও শৈশবের পরিবেশ সম্পর্কে জানার দরজা খুলে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সঠিক অনুসরণকারী যন্ত্র ও ক্যামেরা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে হয়তো প্রথমবারের মতো তিমি হাঙরের প্রজনন বা জন্মের দৃশ্যও ধারণ করা সম্ভব হবে।
সালেহ উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থলগুলো রক্ষা করা গেলে আঞ্চলিক তিমি হাঙরের সংখ্যা পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব। কারণ এই দৈত্যাকার প্রাণীদের জন্য এমন জায়গাই হয়তো তাদের জীবনের প্রথম নিরাপদ ঘর—যেখান থেকে শুরু হয় সমুদ্রজুড়ে দীর্ঘ এক যাত্রা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















