ছুটি শেষ পর্যন্ত এসে গেছে। দীর্ঘদিনের ব্যস্ততার পর এবার হয়তো একটু বিশ্রামের পালা। কিন্তু কর্মস্থল ছাড়ার আগে একটি ছোট কাজ প্রায় সবাইকেই করতে হয়—ই-মেইলে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা চালু করা, যাতে কেউ আপনার অনুপস্থিতিতে যোগাযোগ করলে জানতে পারে আপনি কখন ফিরবেন এবং জরুরি প্রয়োজনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
অনেকের কাছেই এই বার্তাটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে সামান্য ভুলও পেশাগত ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া, নিজের ছুটি নিয়ে বড়াই করা, রসিকতা করতে গিয়ে কাউকে বিরক্ত করা কিংবা নিজের অনুপস্থিতি সম্পর্কে অস্পষ্ট থাকা—সবই সমস্যার কারণ হতে পারে।
কী লিখবেন, আর কী এড়িয়ে চলবেন
শিষ্টাচারবিষয়ক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ডেব্রেটসের মতে, একটি ভালো স্বয়ংক্রিয় অনুপস্থিতি বার্তা হওয়া উচিত ভদ্র, সংক্ষিপ্ত এবং পরিষ্কার। সেখানে নির্দিষ্ট করে জানানো উচিত আপনি কবে ফিরবেন এবং প্রয়োজন হলে আপনার অনুপস্থিতিতে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে।
তবে ছুটিতে কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে সময় কাটাবেন কিংবা আপনার ব্যক্তিগত জীবনের বিস্তারিত তথ্য জানানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে নিজের দ্বিতীয় বাড়ি, দামি শখ বা বিলাসবহুল ছুটির কথা উল্লেখ করে আত্মপ্রচারের মতো কিছু করা এড়িয়ে চলাই ভালো।

ছুটি নেওয়ার কারণ নিয়েও অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ বা আত্মপ্রশংসামূলক বক্তব্য না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন, আপনি পরিবারের সঙ্গে মূল্যবান সময় কাটাতে যাচ্ছেন—এ কথা কারও কাছে ভালো লাগলেও, যিনি আপনার বার্তাটি পড়ছেন এবং তখন নিজে কর্মস্থলে ব্যস্ত, তার কাছে বিষয়টি বিরক্তিকরও মনে হতে পারে।
অন্যদিকে শুধু ‘আমি অফিসে নেই’ লিখে দিলে সেটিও যথেষ্ট নয়। আপনি কবে ফিরবেন বা জরুরি প্রয়োজনে কাকে পাওয়া যাবে—এসব তথ্য না থাকলে প্রাপক আরও বেশি অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন।
অতিরিক্ত কম তথ্যও সমস্যা
কর্মজীবনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শার্লট ডেভিসের মতে, অনুপস্থিতির ভালো বার্তার মূল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, আপনার অনুপস্থিতির সময়সীমা জানানো এবং দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনে বিকল্প যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
কখন আপনার কাছ থেকে উত্তর পাওয়া যাবে, অথবা আপনার অনুপস্থিতিতে কে সাহায্য করতে পারবেন—এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে অনেকেই বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
ছুটিতে যাওয়ার আগে যিনি আপনার কাজ সামলাবেন, তাকেও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে আপনার সহকর্মী যেমন প্রস্তুত থাকতে পারবেন, তেমনি আপনিও ছুটির সময় অপ্রয়োজনীয় কাজের চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকতে পারবেন।
রসিকতা করবেন কি না
অনেক কর্মস্থলে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ থাকায় অনুপস্থিতির বার্তায় সামান্য রসিকতা করা স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ই-মেইলে হাস্যরস সবসময় একইভাবে গ্রহণ করা হয় না।
‘আমি এখন অফিসের অস্তিত্ব ভুলে থাকার ভান করছি’, ‘জরুরি হলে এমন কাউকে ফোন করুন যিনি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন’ কিংবা ‘আমার অনুপস্থিতিতে আসা সব বার্তা না পড়েই মুছে দেওয়া হবে’—এ ধরনের রসিকতা কারও কাছে মজার হলেও অন্য কারও কাছে অশ্রদ্ধাপূর্ণ বা অপেশাদার মনে হতে পারে।

একজন জ্যেষ্ঠ বিক্রয়কর্মী জানিয়েছেন, তার সাবেক এক সহকর্মী অনুপস্থিতির বার্তায় করা একটি রসিকতার কারণে একজন গ্রাহক ক্ষুব্ধ হওয়ায় একটি ব্যবসায়িক চুক্তি হারিয়েছিলেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের রসিকতা নিষিদ্ধ। কর্মস্থলের সংস্কৃতি যদি যথেষ্ট অনানুষ্ঠানিক হয়, তাহলে ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া আপনার বার্তাকে আলাদা করে তুলতে পারে। তবে কিছু লেখার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—একই কথাটি কি আমি সাধারণ ই-মেইলেও লিখতাম?
কারণ আপনি যা লিখবেন, সেটি পড়া হবে এবং তার ভিত্তিতেই আপনার সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে পারে।
‘ই-মেইল দেখব না’—পরিষ্কারভাবে বলুন
অনুপস্থিতির বার্তায় প্রায়ই লেখা থাকে যে ছুটির সময় ই-মেইলে ‘সীমিত প্রবেশাধিকার’ থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বক্তব্য অনেক সময় উল্টো ফল দিতে পারে।
কারণ এতে প্রাপক মনে করতে পারেন, আপনি হয়তো মাঝেমধ্যে ই-মেইল দেখবেন। ফলে তিনি আবারও আপনাকে বার্তা পাঠাতে পারেন।
আপনি যদি সত্যিই ছুটির মধ্যেও ই-মেইল দেখতে চান, তাহলে স্পষ্টভাবে জানানো ভালো যে আপনি মাঝে মাঝে বার্তা পরীক্ষা করবেন।
আর যদি সত্যিকারের বিরতি চান, তাহলে সরাসরি জানিয়ে দিন যে ছুটির সময়ে আপনি ই-মেইল দেখবেন না। এতে অন্যরাও আপনার কাছে তাৎক্ষণিক উত্তর প্রত্যাশা করবেন না।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাজ্যে চুক্তিতে ভিন্ন কোনো শর্ত না থাকলে কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন বার্ষিক ছুটি পাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে।

ভালো অনুপস্থিতির বার্তা কেমন হবে
বার্তার শুরুতেই ভদ্রতা বজায় রাখা জরুরি। সরাসরি ‘আমি ছুটিতে আছি’ না লিখে ‘আপনার বার্তার জন্য ধন্যবাদ’ ধরনের সৌজন্যমূলক বাক্য দিয়ে শুরু করা ভালো।
এরপর নির্দিষ্ট করে জানাতে হবে আপনি কবে ফিরবেন। প্রয়োজন হলে আপনার বিকল্প যোগাযোগকারীর নাম ও যোগাযোগের সঠিক তথ্য দিতে হবে।
আপনি ছুটির সময়ে যোগাযোগ করতে চান কি না, সেটিও স্পষ্ট করা উচিত। যোগাযোগ না চাইলে তা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে যায়।
অফিসে ফিরে আসার পর জমে থাকা বার্তার উত্তর দিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তাই ‘কয়েক দিনের মধ্যে উত্তর দেব’ বলা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে বাস্তবসম্মত।
একই সঙ্গে কর্মস্থলের অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের যোগাযোগকারীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় বার্তা সক্রিয় হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার। এই বিষয়টি অনেকেই ভুলে যান।
সবশেষে, অফিসে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় অনুপস্থিতির বার্তাটি বন্ধ করে দিতে হবে। ফিরে আসার পরও যদি পুরোনো বার্তা চালু থাকে, তাহলে সেটি অসংগঠিত ও অমনোযোগী পেশাগত আচরণের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সুতরাং একটি ভালো অনুপস্থিতির বার্তার মূল কথা খুব সহজ—ভদ্র থাকুন, প্রয়োজনীয় তথ্য দিন, নিজের ব্যক্তিগত জীবন অতিরিক্ত প্রকাশ করবেন না এবং আপনি কখন ও কীভাবে যোগাযোগযোগ্য থাকবেন, তা পরিষ্কার করে জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















