নাইজেরিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩৮ কোটি টাকা মূল্যের কোকেন জব্দের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির মাদকবিরোধী কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের দাবি, বিপুল পরিমাণ এই মাদক যুক্তরাজ্যে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার ব্যক্তি ৪৯ বছর বয়সী আফোলাবি কাজিম মাইকেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ‘কেসি লাক্সারি’ নামে পরিচিত এবং প্রায় সাত লাখ অনুসারী রয়েছে তাঁর। অনলাইনে তিনি নিজেকে স্বর্ণ ও বিলাসবহুল পণ্যের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
তবে নাইজেরিয়ার মাদক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অভিযোগ করেছে, মাদক পাচারের একটি আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ রয়েছে এবং নাইজেরিয়ায় ওই চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে তিনি কাজ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে এখনো আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়নি এবং তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
কোকেনের চালান জব্দ
নাইজেরিয়ার মাদক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট লাগোসের একটি পণ্য পরিবহন কেন্দ্রে তল্লাশি চালিয়ে বাদামি রঙের বাক্সের ভেতর লুকিয়ে রাখা ১৮৪ দশমিক ৫ কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়।

কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক একটি মাদক পাচারকারী চক্র এই কোকেন পাঠাচ্ছিল। বহু বছর ধরে চক্রটি নাইজেরিয়াকে মাদক পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মাদক নাইজেরিয়ায় এনে পরে সেখান থেকে যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তদন্তে মাইকেলের নাম উঠে আসার পর তাঁর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়।
ফ্রান্স যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে আটক
কোকেনের চালান জব্দের ১০ দিন পর লাগোসের মুরতালা মোহাম্মদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাইকেলকে আটক করা হয়।
মাদকবিরোধী সংস্থার দাবি, তিনি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে যাওয়ার জন্য ব্যবসায়িক শ্রেণির একটি বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য ছিল, তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করতে পারেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটির কর্মকর্তারা বিমানবন্দরের যাত্রা-প্রবেশপথে তাঁকে আটক করেন।
নাইজেরিয়ার মাদকবিরোধী সংস্থার প্রধান বুবা মারওয়া বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং দেশটির আইন থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়।
গ্রেপ্তারের সময় মাইকেলের কাছে তিন ধরনের মুদ্রায় ১২ হাজার ৮৪০ মার্কিন ডলারের বেশি নগদ অর্থ ছিল। তাঁর কাছে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড ও নাইজেরীয় মুদ্রা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে বেশ কিছু দামি গয়নাও ছিল বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মাদকবিরোধী সংস্থার দাবি, এসব সম্পদ তাঁর কথিত অবৈধ মাদক ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মীও আটক
এই ঘটনায় লাওয়াল মুজাব কেহিন্দে নামে ৩৩ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তিকেও আটক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, তিনি এমন একটি পণ্য পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন, যার মাধ্যমে কোকেনের চালানটি পরিবহন করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, কেহিন্দে কোকেন বিদেশে পাঠানোর জন্য প্যাকেটজাত করার কাজে যুক্ত ছিলেন এবং এ কাজের বিনিময়ে নগদ অর্থ পেয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও এখনো আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়নি। তিনিও অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
যুক্তরাজ্যেও গ্রেপ্তার হয়েছে সন্দেহভাজনরা
নাইজেরিয়ার মাদকবিরোধী সংস্থা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই চক্রের আরও কয়েকজন সন্দেহভাজন সদস্যকে যুক্তরাজ্যেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটির প্রধান বুবা মারওয়া বলেন, বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করলে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
তিনি মাদক পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যদেরও সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজন হলে তাদের দেশ ছাড়ার পথ পর্যন্ত অনুসরণ করে গ্রেপ্তার করা হবে।
নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষের এই অভিযান এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে পশ্চিম আফ্রিকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাইকেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এখন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















