১২:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী ইরান যুদ্ধেই কি মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপদে পড়ছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল? স্কুলে হামলা চালিয়ে সহপাঠীকে হত্যা, আত্মহত্যার আগে সরাসরি সম্প্রচার করল শিক্ষার্থী ডলার বন্ড তুলতে দৌড়াচ্ছে ভারতের চার বেসরকারি ব্যাংক বন্ডের সুদহার কয়েক দশকের সর্বোচ্চ, কমল স্বর্ণের দাম চেয়ারম্যানের বিদায়ের পরই টাটা সন্সের বার্ষিক সভা স্থগিত মার্কিন সামরিক গবেষণার হাত ধরে চীনের রোবট কুকুরের উত্থান পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ বাড়িতে মার্কিন পতাকা তুলেও রক্ষা পেলেন না ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি, আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ ট্রাম্পের হারানো ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

বিরতিহীন উপবাসের উপকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন, কতটা সত্যি আর কতটা বাড়াবাড়ি

ওজন কমানো থেকে শুরু করে দীর্ঘায়ু, ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো কিংবা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ভালো রাখা—বিরতিহীন উপবাস নিয়ে গত কয়েক বছরে এমন নানা দাবি ছড়িয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দিন উপবাস থাকা কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার এই পদ্ধতি জনপ্রিয়ও হয়েছে ব্যাপকভাবে। কিন্তু নতুন গবেষণাগুলো বলছে, এর উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত অনেক দাবির পেছনে এখনো শক্ত প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।

ওজন কমাতে কতটা কার্যকর

গবেষকদের মতে, বিরতিহীন উপবাস মানুষের ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর ফল অন্য খাদ্যনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির তুলনায় খুব বেশি আলাদা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের ধরন অনুযায়ী মানুষের শরীরের ওজন গড়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পুষ্টিবিদ ক্রিস্টা ভারাডির মতে, এই ফলাফল অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে পাওয়া ওজন কমানোর ফলের কাছাকাছি।

ওজন কিছুটা কমার সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মতো বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকেও উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিছু গবেষণায় বিশেষ একটি হরমোনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের উপসর্গ কমার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে অতিরিক্ত কঠোর উপবাস, যেমন এক দিন পরপর খাবার খাওয়ার পদ্ধতি, শরীরের পেশি বা চর্বিবিহীন ভর কমিয়ে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রাণীর গবেষণা আর মানুষের ফল এক নয়

বিরতিহীন উপবাসের প্রতি আগ্রহের বড় একটি কারণ এসেছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে। এসব প্রাণীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ানো এবং উপবাস করানোর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য সুফল দেখা গেছে।

Getty Images Intermittent fasting may help us to lose weight, but it is unclear whether it brings more benefits than other diets (Credit: Getty Images)

উপবাসের সময় শরীর প্রথমে শর্করা পোড়ানোর বদলে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে। একই সঙ্গে কোষের ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত ও পুরোনো উপাদান পুনর্ব্যবহারের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা কোষীয় পরিচ্ছন্নতা ও পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে দীর্ঘায়ু এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সুফল এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রাণীর গবেষণায় যে ফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে, মানুষের গবেষণায় তা অনেকটাই দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ক্যানসার ও মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা

বিরতিহীন উপবাস মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে কিংবা ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে—এমন দাবিও রয়েছে। কিন্তু এসব দাবির বড় অংশের ভিত্তি প্রাণীর গবেষণা।

মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় জ্ঞানীয় ক্ষমতার উন্নতির বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রাণীর ওপর পাওয়া কিছু ইতিবাচক ফল মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে পুনরাবৃত্তি হয়নি। তবে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়া পর্যায়ে থাকা কিছু নারী চিকিৎসার সময় নির্দিষ্ট ধরনের পাঁচ-দিন-উপবাস ও দুই-দিন-স্বাভাবিক খাবারের খাদ্যপদ্ধতি অনুসরণ করলে জীবনযাত্রার মান এবং রোগের অগ্রগতিতে কিছুটা ইতিবাচক ফল পেতে পারেন।

আসল সমস্যা—মানুষ আসলে কী খাচ্ছে?

Getty Images Many people's memories of what they have eaten are deeply flawed (Credit: Getty Images)

বিরতিহীন উপবাস নিয়ে গবেষণার ফল এতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার পেছনে একটি বড় সমস্যা হলো মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস নির্ভুলভাবে জানা কঠিন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষকে সাধারণত কী খেয়েছেন তার হিসাব লিখে রাখতে বলা হয়। কিন্তু মানুষ অনেক সময় খাবারের কথা ভুলে যান, পরিমাণ ঠিকমতো মনে রাখতে পারেন না, আবার কেউ কেউ খাদ্যনিয়ম ঠিকমতো মানতে না পারার কারণে কিছু তথ্য বাদও দিতে পারেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের মাত্র প্রায় অর্ধেক নিয়মিত খাদ্যতালিকার হিসাব জমা দেন।

২০২৫ সালের একটি গবেষণাভিত্তিক হিসাব বলছে, মানুষ গড়ে নিজেদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি পর্যন্ত কম করে জানাতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ দিনে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ক্যালরি খাওয়ার কথা জানালেও শরীরে ব্যবহৃত শক্তির হিসাব থেকে প্রকৃত গ্রহণ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ফলে কোনো খাদ্যপদ্ধতি সত্যিই কতটা কার্যকর, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে গবেষণার পদ্ধতি

এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা এখন প্রযুক্তির দিকে তাকাচ্ছেন। কেউ কী খাচ্ছেন তা শুধু তাঁর নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চলছে।

কিছু গবেষণায় খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। আবার এমন যন্ত্রও তৈরি হচ্ছে, যা গলায় পরা যায় এবং চিবানোর নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। বিশেষ ধরনের কাঁটাচামচ খাবার মুখে তোলার পরিমাণ ও সময় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। দাঁতের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র সেন্সরের মাধ্যমেও খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

Getty Images Building better records of what people have consumed will help resolve the questions hanging over intermittent fasting, and many other interventions (Credit: Getty Images)

তবে এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। গবেষকদের মতে, রক্ত ও মূত্র পরীক্ষা এবং পরিধানযোগ্য যন্ত্রসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করলে একজন মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছেন, সে বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

উপবাস কি তাহলে অর্থহীন?

একেবারেই নয়। গবেষণার বর্তমান চিত্র থেকে বরং বলা যায়, বিরতিহীন উপবাস কিছু মানুষের জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট বিপাকীয় সূচক উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এটিকে অলৌকিক কোনো খাদ্যপদ্ধতি হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

বিশেষ করে প্রাণীর গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক গঠন, বিপাকক্রিয়া, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং জিনগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি জটিল। ইঁদুরের ওপর ১৬ ঘণ্টার উপবাস মানুষের ক্ষেত্রে একই সময়ের উপবাসের সমতুল্য নাও হতে পারে, কারণ ইঁদুরের বিপাকের গতি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।

গবেষকদের মূল বক্তব্য তাই সরল—বিরতিহীন উপবাসের কিছু উপকার থাকতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ও অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, তার অনেকটাই এখনো গবেষণায় নিশ্চিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণীর গবেষণার ফল মানুষের জন্য প্রায় একইভাবে উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, পুষ্টিবিজ্ঞানকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে এবং কখন খাচ্ছে—এই তথ্য যত নির্ভুলভাবে জানা যাবে, বিরতিহীন উপবাসসহ বিভিন্ন খাদ্যপদ্ধতির প্রকৃত উপকার ও ক্ষতি তত পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

বিরতিহীন উপবাস তাই হয়তো পুরোপুরি মিথ নয়, আবার স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য কোনো জাদুকরী সমাধানও নয়। এর প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য আরও বড়, দীর্ঘমেয়াদি এবং মানুষের বাস্তব খাদ্যাভ্যাস নির্ভুলভাবে মাপতে সক্ষম গবেষণার প্রয়োজন।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

অতীত ভুলে নয়, মতপার্থক্য মিটিয়ে সামনে এগোতে হবে: দীনেশ ত্রিবেদী

বিরতিহীন উপবাসের উপকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন, কতটা সত্যি আর কতটা বাড়াবাড়ি

১১:০২:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

ওজন কমানো থেকে শুরু করে দীর্ঘায়ু, ক্যানসারের ঝুঁকি কমানো কিংবা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ভালো রাখা—বিরতিহীন উপবাস নিয়ে গত কয়েক বছরে এমন নানা দাবি ছড়িয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দিন উপবাস থাকা কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার এই পদ্ধতি জনপ্রিয়ও হয়েছে ব্যাপকভাবে। কিন্তু নতুন গবেষণাগুলো বলছে, এর উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত অনেক দাবির পেছনে এখনো শক্ত প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে।

ওজন কমাতে কতটা কার্যকর

গবেষকদের মতে, বিরতিহীন উপবাস মানুষের ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এর ফল অন্য খাদ্যনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির তুলনায় খুব বেশি আলাদা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসের ধরন অনুযায়ী মানুষের শরীরের ওজন গড়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পুষ্টিবিদ ক্রিস্টা ভারাডির মতে, এই ফলাফল অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে পাওয়া ওজন কমানোর ফলের কাছাকাছি।

ওজন কিছুটা কমার সঙ্গে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মতো বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকেও উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিছু গবেষণায় বিশেষ একটি হরমোনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের উপসর্গ কমার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। তবে অতিরিক্ত কঠোর উপবাস, যেমন এক দিন পরপর খাবার খাওয়ার পদ্ধতি, শরীরের পেশি বা চর্বিবিহীন ভর কমিয়ে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রাণীর গবেষণা আর মানুষের ফল এক নয়

বিরতিহীন উপবাসের প্রতি আগ্রহের বড় একটি কারণ এসেছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে। এসব প্রাণীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ানো এবং উপবাস করানোর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য সুফল দেখা গেছে।

Getty Images Intermittent fasting may help us to lose weight, but it is unclear whether it brings more benefits than other diets (Credit: Getty Images)

উপবাসের সময় শরীর প্রথমে শর্করা পোড়ানোর বদলে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে। একই সঙ্গে কোষের ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত ও পুরোনো উপাদান পুনর্ব্যবহারের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা কোষীয় পরিচ্ছন্নতা ও পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে দীর্ঘায়ু এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমার সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রার সুফল এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রাণীর গবেষণায় যে ফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে, মানুষের গবেষণায় তা অনেকটাই দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

ক্যানসার ও মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা

বিরতিহীন উপবাস মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে কিংবা ক্যানসার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে—এমন দাবিও রয়েছে। কিন্তু এসব দাবির বড় অংশের ভিত্তি প্রাণীর গবেষণা।

মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় জ্ঞানীয় ক্ষমতার উন্নতির বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রাণীর ওপর পাওয়া কিছু ইতিবাচক ফল মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে পুনরাবৃত্তি হয়নি। তবে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়া পর্যায়ে থাকা কিছু নারী চিকিৎসার সময় নির্দিষ্ট ধরনের পাঁচ-দিন-উপবাস ও দুই-দিন-স্বাভাবিক খাবারের খাদ্যপদ্ধতি অনুসরণ করলে জীবনযাত্রার মান এবং রোগের অগ্রগতিতে কিছুটা ইতিবাচক ফল পেতে পারেন।

আসল সমস্যা—মানুষ আসলে কী খাচ্ছে?

Getty Images Many people's memories of what they have eaten are deeply flawed (Credit: Getty Images)

বিরতিহীন উপবাস নিয়ে গবেষণার ফল এতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার পেছনে একটি বড় সমস্যা হলো মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস নির্ভুলভাবে জানা কঠিন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষকে সাধারণত কী খেয়েছেন তার হিসাব লিখে রাখতে বলা হয়। কিন্তু মানুষ অনেক সময় খাবারের কথা ভুলে যান, পরিমাণ ঠিকমতো মনে রাখতে পারেন না, আবার কেউ কেউ খাদ্যনিয়ম ঠিকমতো মানতে না পারার কারণে কিছু তথ্য বাদও দিতে পারেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের মাত্র প্রায় অর্ধেক নিয়মিত খাদ্যতালিকার হিসাব জমা দেন।

২০২৫ সালের একটি গবেষণাভিত্তিক হিসাব বলছে, মানুষ গড়ে নিজেদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি পর্যন্ত কম করে জানাতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ দিনে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ক্যালরি খাওয়ার কথা জানালেও শরীরে ব্যবহৃত শক্তির হিসাব থেকে প্রকৃত গ্রহণ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ফলে কোনো খাদ্যপদ্ধতি সত্যিই কতটা কার্যকর, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে গবেষণার পদ্ধতি

এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা এখন প্রযুক্তির দিকে তাকাচ্ছেন। কেউ কী খাচ্ছেন তা শুধু তাঁর নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চলছে।

কিছু গবেষণায় খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। আবার এমন যন্ত্রও তৈরি হচ্ছে, যা গলায় পরা যায় এবং চিবানোর নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। বিশেষ ধরনের কাঁটাচামচ খাবার মুখে তোলার পরিমাণ ও সময় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। দাঁতের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র সেন্সরের মাধ্যমেও খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে।

Getty Images Building better records of what people have consumed will help resolve the questions hanging over intermittent fasting, and many other interventions (Credit: Getty Images)

তবে এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। গবেষকদের মতে, রক্ত ও মূত্র পরীক্ষা এবং পরিধানযোগ্য যন্ত্রসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করলে একজন মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছেন, সে বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

উপবাস কি তাহলে অর্থহীন?

একেবারেই নয়। গবেষণার বর্তমান চিত্র থেকে বরং বলা যায়, বিরতিহীন উপবাস কিছু মানুষের জন্য ওজন নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট বিপাকীয় সূচক উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এটিকে অলৌকিক কোনো খাদ্যপদ্ধতি হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

বিশেষ করে প্রাণীর গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক গঠন, বিপাকক্রিয়া, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং জিনগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি জটিল। ইঁদুরের ওপর ১৬ ঘণ্টার উপবাস মানুষের ক্ষেত্রে একই সময়ের উপবাসের সমতুল্য নাও হতে পারে, কারণ ইঁদুরের বিপাকের গতি মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।

গবেষকদের মূল বক্তব্য তাই সরল—বিরতিহীন উপবাসের কিছু উপকার থাকতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ও অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, তার অনেকটাই এখনো গবেষণায় নিশ্চিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণীর গবেষণার ফল মানুষের জন্য প্রায় একইভাবে উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, পুষ্টিবিজ্ঞানকে আরও নির্ভরযোগ্য করতে মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রয়োজন। মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে এবং কখন খাচ্ছে—এই তথ্য যত নির্ভুলভাবে জানা যাবে, বিরতিহীন উপবাসসহ বিভিন্ন খাদ্যপদ্ধতির প্রকৃত উপকার ও ক্ষতি তত পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

বিরতিহীন উপবাস তাই হয়তো পুরোপুরি মিথ নয়, আবার স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য কোনো জাদুকরী সমাধানও নয়। এর প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য আরও বড়, দীর্ঘমেয়াদি এবং মানুষের বাস্তব খাদ্যাভ্যাস নির্ভুলভাবে মাপতে সক্ষম গবেষণার প্রয়োজন।