বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া জেসন আরডের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগের সময় তাঁর যোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ ওঠার পরও কেন কার্যকর তদন্ত করা হয়নি—এখন এসব প্রশ্নের মুখোমুখি কেমব্রিজ।
৩৭ বছর বয়সে ২০২৩ সালে কেমব্রিজে যোগ দিয়ে আরডে বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়েছিলেন। বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ থাকার সময় তাঁর নিয়োগ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু পরে তাঁর গবেষণাপত্রে নকলের অভিযোগ, আত্মজীবনীতে নিজের জীবন নিয়ে অতিরঞ্জিত বা অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এবং শৈশব সম্পর্কে তাঁর কিছু বক্তব্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। চাকরি থেকে পদত্যাগের কয়েক দিন পর লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়।
যোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই ছিল প্রশ্ন
কেমব্রিজের ওই অধ্যাপকের পদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সাফল্য এবং গবেষণার্থী তত্ত্বাবধানের প্রমাণিত অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আরডের প্রকাশিত গবেষণার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং তিনি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প সময় করে কাজ করেছিলেন। ফলে তিন বছর বা তার বেশি সময় ধরে গবেষণার্থী তত্ত্বাবধানের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল না। তারপরও ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে নিয়োগ দেয়।

নিয়োগের সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অসাধারণ কাহিনিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। আরডে দাবি করেছিলেন, ছোটবেলায় তাঁর বিকাশজনিত নানা সমস্যা ছিল, তিনি দীর্ঘ সময় বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছেন এবং অনেক দেরিতে কথা বলা ও পড়া শেখার পরও শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষায় সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁর জীবনের আরেকটি আলোচিত দাবি ছিল মাত্র ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন দৌড়ানোর ঘটনা।
শৈশবের কাহিনি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন
পরবর্তী অনুসন্ধানে তাঁর শৈশব সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বর্ণনায় বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। আরডে একসময় দাবি করেছিলেন, ১১ বছর বয়সের আগে তিনি কথা বলতে পারতেন না এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। পরে তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি আবার ভিন্ন ধরনের বর্ণনা দেন।
তাঁকে ছোটবেলায় চিনতেন এমন কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি শিশু ও বড়দের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর ভাষাগত বিকাশে কিছুটা দেরি ছিল বলে জানা গেলেও, তিনি দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণভাবে কথা বলতে পারেননি—এমন দাবির সঙ্গে তাঁদের বর্ণনা মেলে না।
গবেষণায় নকলের অভিযোগ
আরডেকে কেমব্রিজে নিয়োগের তিন মাস পরই দুই ব্রিটিশ গবেষক তাঁর একটি গবেষণাপত্রে নকলের সম্ভাব্য অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন। বিভাগীয় প্রধান তাঁর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন এবং তিনি সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রের সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সম্মত হয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন।

কিন্তু অভিযোগ শুধু ওই একটি গবেষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরে তাঁর আরও কয়েকটি গবেষণাপত্রে সংশোধনী প্রকাশিত হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি উচ্চশিক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা কেমব্রিজের কাছে ৬০ পৃষ্ঠার বেশি নথি দিয়ে তাঁর গবেষণাকাজে ব্যাপক নকলের অভিযোগ জানায়। তাঁর গবেষণাপত্র পরীক্ষা করা এক বিশেষজ্ঞ সেটিকে ব্যাপকভাবে নকল করা হয়েছে বলে মনে করেন।
তবু কেমব্রিজ তখনও আরডের পাশে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, তাঁর গবেষণাপত্র বা পিএইচডি-সংক্রান্ত প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। একই সময়ে তাঁর সমর্থকেরা অভিযোগ করেন, কৃষ্ণাঙ্গ গবেষণাকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতেও আইনি চাপ
আরডের গবেষণা নিয়ে অনুসন্ধান করা এক সাংবাদিকের প্রতিবেদনে তাঁর গবেষণায় নকলের অভিযোগ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আরডের আইনজীবীরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর সেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। পরে আরডে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগও করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে হয়রানি সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর গত মাসে অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আরও বড় আকারে সামনে আসে। নতুন করে তাঁর শৈশব ও পেশাগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত আরডে কেমব্রিজ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, তিনি আর এমন এক পরিস্থিতিতে থাকতে চান না, যেখানে জীবনের প্রতিটি বিষয়কে ক্রমাগত জনসমক্ষে পরীক্ষা ও বিচারের মুখে পড়তে হয়।
বৈচিত্র্যের নীতি নিয়ে বিতর্ক
আরডের নিয়োগকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হলো বৈচিত্র্য বাড়ানোর নীতির সঙ্গে তাঁর নিয়োগের সম্পর্ক। সমালোচকদের একাংশের দাবি, কেমব্রিজ বৈচিত্র্য বাড়াতে এতটাই আগ্রহী ছিল যে নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই যথাযথভাবে করা হয়নি।

অন্যদিকে, বর্ণবাদবিরোধী ও প্রগতিশীল মহলের অনেকেই মনে করেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণাঙ্গ ও সংখ্যালঘু শিক্ষাবিদদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা বিপজ্জনক। তাঁদের মতে, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে পুরো একটি জনগোষ্ঠীর মেধা বা যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।
কেমব্রিজও জানিয়েছে, আরডের মৃত্যুতে তারা গভীরভাবে মর্মাহত। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অসদাচরণের অভিযোগকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে এবং নিয়োগ ও পরবর্তী ঘটনাবলি নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
কেমব্রিজের সিদ্ধান্ত এখন বড় পরীক্ষার মুখে
আরডের মৃত্যুর পরও তাঁর পেশাগত যোগ্যতা, গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কেমব্রিজের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থামছে না। বরং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নিয়োগের সময় যেসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব ছিল, সেগুলো কেন যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়নি? তাঁর গবেষণাকাজ নিয়ে প্রাথমিক অভিযোগ ওঠার পরও কেন তা আরও বিস্তৃতভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি? আর অভিযোগকারীদের সতর্কবার্তা কেন গুরুত্ব পায়নি?
আরডের ঘটনাটি এখন শুধু একজন অধ্যাপকের বিতর্কিত ক্যারিয়ারের গল্প নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগব্যবস্থা, গবেষণার সততা এবং বৈচিত্র্যের নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে।
জেসন আরডের মৃত্যু তাই বিতর্কের সমাপ্তি ঘটায়নি। বরং তাঁর নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো করেছে।
কেমব্রিজের নিয়োগ বিতর্ক, জেসন আরডে, গবেষণায় নকলের অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন স্বাধীন তদন্তের দিকেই তাকিয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















